‘স্যালুট টু পুলিশ’

policeউইমেন চ্যাপ্টার: এ বছরেরই মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অ্যাকশন নিয়ে যখন দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়, পুলিশ সম্পর্কে সাধারণের ভাবনা যখন নেতিবাচকতার তুঙ্গে, ঠিক তখনই একটি ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি অনেকের চোখে পড়ে। তরুণদের একটি গ্রুপ প্রতি শুক্রবার রাজধানীর কোন একটি জায়গাকে বেছে নিয়ে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসছেন। তারা এই কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘স্যালুট টু পুলিশ’। রমযান মাসে তারা ফুলের পাশাপাশি ইফতারও করছেন একইভাবে, রাস্তায় দায়িত্বরত পুলিশের সাথে। স্বভাবতই কৌতূহল ছিল এই পদক্ষেপটি সম্পর্কে জানার। তাই এর মূল উদ্যোক্তা সাংবাদিক জিনাত জোয়ার্দার রিপার সাথে কথা বলি এ নিয়ে,

উইমেন চ্যাপ্টার: স্যালুট টু পুলিশ কি? এবং কেন?
রিপা: স্যালুট টু পুলিশ একটি সামাজকি র্কমকাণ্ড। যেখানে আমি আমার সংগঠনের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাংলাদশে পুলিশের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের একটি করে লাল গোলাপ দেই। লাল গোলাপের অর্থ ভালবাসা, সম্মান। আসলে পুলিশ আমাদের বন্ধু। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুলিশের কাজের সম্মাননা দেওয়া হয় না বললেই চলে। অথচ রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি বাংলাদেশে কাজ করে অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। আর কর্মঘন্টার হিসাব তো তাদের ক্ষেত্রে একেবারেই নেই। উপরন্তু আছে তাঁদের প্রতি বিরূপ মনোভাব। এই অবস্থার একটা পরিবর্তন হোক, এটাই চাইছিলাম। একটি সুন্দর বাংলাদেশের জন্য যা খুব জরুরি। সেই লক্ষ্যেই স্যালুট টু পুলিশের যাত্রা শুরু।

উইমেন চ্যাপ্টার: কোন প্রেক্ষিতে এমন একটি কাজের কথা মাথায় এলো?
রিপা: ২০০৩ সালের কথা। আমি আমার স্কুলের দুই বন্ধুকে নিয়ে ঈদের দিন রিকশা নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছি। শাহবাগে পিজি হাসপাতালের সামনে গিয়ে দেখলাম, ঈদের দিনেও পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে। আমার মনে হলো, ঈদের দিনে সবাই যখন পরিবার, বন্ধু, স্বজনদের নিয়ে ঈদ উদযাপন করছে, তখন তাঁরা আমাদের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তাদের বাড়িতেও আছেন মা, সন্তান, স্ত্রী। এদের কেউ কাউকেই এমন উৎসবের দিনে পাশে পাচ্ছে না। তো আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে ওখান থেকেই কিছু ফুল কিনে তাদের দিলাম। তারা খুব অবাক হয়ে গেলেন এমন ঘটনায়। সেইসঙ্গে আপ্লুতও হলেন। ফুল দেয়ার সময় আমরা বললাম, যে ত্যাগ পেশার জন্য তাঁরা দিনের পর দিন করে যাচ্ছেন, সেজন্যই এই ‘ধন্যবাদ’।

উইমেন চ্যাপ্টার: প্রথম যখন মাথায় এলো এমন একটি ভাবনা, তখন এটাকে কার্যকর করার জন্য কি ভাবলেন, কি পদক্ষেপ নিলেন, কার সাথে শেয়ার করলেন ভাবনাটা? বন্ধুরা জুটলো কি করে?
রিপা: কলেজে পড়ার সময় আমাদের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক গাজী আজমল বলেছিলেন, যেই রিকশা তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিল, তার চালককে একটি ধন্যবাদ দিও। এমনি দিতে লজ্জা করলে মনে মনে দিও। যে যেই কাজটি করে তাকে তার স্বীকৃতি দিতে ভুলবে না। এই কথাটি আমাকে নাড়া দিয়েছিল নি:সন্দেহে। আমরা যেমন চিকিৎসক, শিক্ষক, বন্ধু নানা মানুষকে নানা কারণে ধন্যবাদ দেই, ঠিক তেমনি। এর সূত্র ধরেই বলতে পারি, আমাদের বর্তমান যে সামাজিক প্রেক্ষাপট তাতে সবচেয়ে নেতিবাচক অবস্থানে আছে বাংলাদেশ পুলিশ। অথচ আমাদের পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে গর্ব করার বিষয়ও কিন্তু কম নেই। এই পুলিশই মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ করেছিল একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সেই রাতে পুলিশ যা করেছিল, সেই গৌরবগাঁথা ভুলতে বসেছি। উপরন্তু তাদের অমানবিক পরিশ্রমেরও কোনো মূল্য আমরা দেইনা। এই ব্যাপারটি আমাকে তাড়িত করতো নানা সময়েই। এ কারণইে নানা সময়ে আমি বিচ্ছিন্নভাবে পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে করায় আমার বলতে চাওয়া বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছাচ্ছিল না। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ কথাটাই কেতাবি ভাষায় আটকে আছে। সেই চিন্তা থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নেই কাজটি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার। ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তা জানাই। আর কাছের ২/১ জন বন্ধুকে ফোন দিয়ে আমার পাশে থাকার অনুরোধ করি। আমার এই কার্যক্রমের বয়স এখন প্রায় পাঁচ মাস। প্রথম দিন আমরা ছিলাম চারজন। এরপর অনেকে আমার কার্যক্রমের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে যোগ দিয়েছে। শুধুমাত্র মাইন্ড সেট থেকেই পুলিশকে ভয় পেয়েছে বা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে, এমন লোকেরাও তাদের ভুল বুঝতে পেরে এই কার্যক্রমে যোগ দিয়েছে। বেশিরভাগই মূলত যোগাযোগ করেছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

উইমেন চ্যাপ্টার: শুরুতে কি করলেন? এখন কি করছেন? কতদিন চলবে এই কর্মসূচি? এরপরের ভাবনাটা কি?
রিপা: আমরা আমাদরে কার্যক্রম মূলত শুক্রবারে করে থাকি। আমার সংগঠনের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে শিক্ষার্থী। তাই ছুটির দিনে তাদের সুবিধা। পুলিশের যেকোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই, এই সত্যটিও তারা এতোদিনে বুঝতে পেরেছে। শুরুতে আমরা একটি লাল গোলাপ দিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে পুলিশের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছি। ধন্যবাদ জানিয়েছি। আর এখন রমজানে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আমরা ইফতার করছি। আমার চিন্তা সুদূরপ্রসারী। এই কার্যক্রমে সামনে আরও নানা পদক্ষেপ যুক্ত হবে। যার প্রত্যেকটি বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক বিশ্বাসের সূচনা ঘটাবে বলে আমি আশাবাদী।

উইমেন চ্যাপ্টার: কেমন সাড়া পেলে? পুলিশ এবং তার আশপাশের মানুষ কিভাবে দেখছে বিষয়টা? এতে করে আদৌ সম্ভব পুলিশের হৃত ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা?
রিপা: এখন অব্দি পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। তাঁরা যা কোনোদিন পাননি এই কার্যক্রমে পেয়েছেন বলে আস্থার জায়গাটা হয়তো তৈরি হতে শুরু করেছে। জানি পথটা দীর্ঘ ও বন্ধুর। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হয়। আমার সংগঠনের ছেলেমেয়েদেরও আমি ধন্যবাদ দেই তারা এই ধরনের একটি কাজে আমাকে সাহায্য করছে বলে। শুভ, অনিন্দ্য, মামুন, মুয়ীদ, জীবন, রোমান, উপমা, তুষার এদের কথা না বললেই না। শুধুমাত্র ভালবেসে তারা কাজটি করে যাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকে বিশ্বাস করি, আজ হয়তো আমরা কিছুই পাচ্ছি না, কিন্তু একদিন আসবে, আসতেই হবে যখন বহুগুণে প্রতিদান পাবে দেশের প্রতিটি মানুষ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.