বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন মূলত কোন পথে!

0

দিলশানা পারুল:

ব্যক্তি নারী যে লৈঙ্গিক বৈষম্যের শিকার, সমাজ এবং পরিবারে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে যে সে বঞ্চিত, এই সামগ্রিক বিষয়টা বোঝার জন্য অন্তত একটা নির্দ্দিষ্ট স্তর র্পযন্ত শিক্ষার প্রয়োজন। নিজের উপর ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলো সমাজ এবং পরিবারে প্রথা হিসেবে প্রোথিত থাকায়, একটা সুনির্দিষ্ট স্তরের সচেতনতা ছাড়া যে কোনো স্তরের ব্যক্তি নারীর পক্ষে সেটা চিহ্নিত করতে পারাটা কঠিন।

আমাদের দেশের মধ্যব্ত্তি যে নারী সমাজ, সামাজিক অবস্থানগত কারণেই অন্যান্য নারীদের চেয়ে তারা শিক্ষা-দীক্ষায় তুলনামূলকভাবে আগানো। কাজেই লৈঙ্গিক বৈষম্যের যে সংস্কৃতি, সেটা মধ্যবিত্ত নারী সমাজই চিহ্নিত করতে পারবে, এবং তার বিরুদ্ধে কথা বলবে, অথবা বলতে চাইবে এইটা স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যশিত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লৈঙ্গিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং নারীবাদের পক্ষের্ বর্তমানে যে কন্ঠস্বরগুলো শোনা যায় সেইটা কিন্তু মধ্যবিত্ত নারীদেরই কণ্ঠস্বর। কাজেই মধ্যবিত্ত নারীরা যখন কথা বলবে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের কথায়, দাবিতে, বক্তব্যে তার শ্রেণি অবস্থান প্রকটভাবে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন এই স্বাভাবিকতা দোষে দুষ্ট । এইখানে নারীবাদী আন্দোলন এ যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা সকলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা, কিন্তু সেটাও সমস্যা হওয়ার কথা ছিলো না। সমস্যা হলো তাদের বক্তব্য, চিন্তা এবং দাবি- দাওয়া যখন মধ্যবিত্ত ঘেরাটোপ টপকাতে পারে না। সমস্যা হলো নারীবাদীদের বক্তব্যে যখন সর্বজনিনতা থাকে না ।

কোন আন্দোলনের বক্তব্যে যখন সবর্জনিনতা থাকে না, সেইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ্ সমস্যা এবং এই সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারাটা আরো বড় সমস্যা । বর্তমানে নারীবাদী আন্দোলনের নামে বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে সেইটা আসলে একধরনের হাউকাউ, চিৎকার, চেচামেচি । যে কোনো আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে এই হাউকাউ, চিৎকার চেচামেচির প্রয়োজন আছে । সমস্যা চিহ্নিত করে জানান দেয়ার জন্যই এই আওয়াজটার প্রয়োজন। সমাজ এবং রাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয়া যে, দেখো আমার উপর তোমরা যে অন্যায় করছো, আমি সেটা জেনেছি, বুঝেছি এবং তার প্রতিবাদ করছি।

কিন্তু প্রথম স্তরটা পার হওয়ার পর নারীবাদী আন্দোলনে যারা শরিক আছেন তাদের উপর আরও কিছু দায়িত্ব বর্তায়। সেটা কী রকম? আন্দোলনের বক্তব্যকে একটা সর্বজনীন রুপ দেয়া। বক্তব্যের মধ্যে রাজনীতিটা নিয়ে আসা। আন্দোলনের পক্ষে লোক বাড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের নারীবাদীদের বক্তব্যগুলো শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ের বক্তব্য হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। এইখানে নারীবাদী বক্তব্যে ব্যক্তিগত রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, ঘৃণা যে পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করে আছে, ঠিক ততখানিই অনুপস্থিত আছে সামগ্রিক নারী সমাজের কথা।

লৈঙ্গিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে যত কথা আছে, তত কথাই অনুপস্থিত আছে লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে। বাংলাদেশে তসলিমা নাসরিনের মতো প্রথিতযশা নারীবাদীদের বক্তব্যও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপরে উঠতে পারছে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো আমার সমস্যা চিহ্নিত করার চোখ খুলে দেবে কিন্তু রাজনৈতিক চেতনা আমাকে সহযোগিতা করবে এই সমস্যাগুলোকে সর্বজনীন দাবি-দাওয়ায় রুপ দিতে। যদি এই পরের ধাপে আমরা পৌছতেই না পারি তাহলে ব্যাক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো দশজনের সাথে শেযার করে লাভ কি হচ্ছে?

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের যেকোনো ধরনের সমস্যাকে মেয়েলি সমস্যা হিসেবেই দেখা হয়। এই সমস্যার যে একটা রাষ্ট্রীয় ভিত্তি আছে, সামাজিক গোড়াপত্তন আছে সেই চিন্তাটাই সামগ্রিকভাবে এইখানে অনুপস্থিত। সেইখানে নারীবাদীরা একটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতেন। আসলে মেয়েদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গেলে এইখানেই কাজ করতে হবে। একটা হচ্ছে সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করে নারী এবং পুরুষ উভয়েরই মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সমাজ পর্যায় কাজ করা এবং একই সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায় এই সমস্যাগুলোকে সমাধানের জন্য পলিসি লেভেলে যেন কাজ হয়, তার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করা।

বতর্মানে নারীবাদী আন্দোলনকর্মীরা এই দুইটার কোনটা করছি আসলে? সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে পারছি, না রাষ্ট্রীয় পর্যায় চাপ প্রয়োগ করতে পারছি? এইটা গেলো আন্দোলনের কৌশল প্রসঙ্গে। এইবার আমি আসতে চাচ্ছি নারীবাদ বিষয়ে আমাদের বোঝাপড়ার বিষয়ে। বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমার কাছে মনে হয় পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাব।

এই দেশের মেয়েদের সমস্যা নির্বাচনের ক্ষেত্রে, আন্দোলনের ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে, দাবি-দাওয়া নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করতে আমরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি । ব্যর্থ যে হয়েছি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নারীবাদী বক্তব্যের অ্গ্রহণ যোগ্যতা। বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন সামাজিক গ্রহণ যোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, তার পুরোটাই কি শুধুমাত্র সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফলে? যারা এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত আছেন, তাদের কি কোনই দায় নেই ?

পশ্চিমে “মাই বডি মাই রাইট ” এইটা এই দশকের নারীবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় শ্লোগান। আমাদের দেশেও নারীবাদীরা এই শ্লোগানের আংগিকেই তাদের বক্তব্যগুলো তুলে ধরেন। কেন ? আমার দেশের গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত শতকরা ৮০ ভাগ নারীর কথা তো বাদই দিলাম, এমনকি শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীই এই বক্তব্যের সাথে একাত্মতা অনুভব করতে পারেন কিনা? এই দেশের সমস্ত মেয়েরাই যখন দিনের ১৮ ঘন্টা সময় ব্যয় করতে বাধ্য হোন ঘরের রান্নাবান্না করতে, বাচ্চা পালতে এবং বাড়ির সকলের সার্ভিস প্রোভাইড করতে, আপনি তখন ব্ক্তব্য নিয়ে আসছেন শরীরের স্বাধীনতাকেন্দ্রিক। এইটার মানে আমাদের মেয়েরা আসলে কী বুঝবে? একটা উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে শুধুমাত্র ভালো ডে কেয়ারের অভাবে সন্তান জন্ম দেয়ার পর অসম্ভব উজ্জল ক্যারিয়ার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

এখন এই সমস্যাটা কার, মাতৃত্বের না রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার? নারীবাদ কাকে দোষারোপ করবে, মাতৃত্বকে না রাষ্ট্রকে? নারীবাদী আন্দোলন এই ইস্যুকে সামনে রেখে কি দাবি তুলবে “মা হওয়া বন্ধ করো”, না “ ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা করো” ? রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন মেয়েদের বিয়ের বৈধ বয়স ১৬ করে দেয়া হচ্ছে, তখন আদতে মাই বডি মাই রাইট এই শ্লোগান আমার দেশের জন্য বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে নারীবাদীদের বক্তব্যে পোষাকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম্ যতখানি গুরুত্ব পায় এবং পেয়েছে ততখানি গুরুত্ব আর কোন কিছুকেই দেয়া হয়নি । অথচ বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীবাদের জন্য এই দুটো হচ্ছে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা । পাঁচ দশক আগেও ধর্ম্ যেভাবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারতো, এখন সেটা করতে পারে কিনা ?

গণমাধ্যমের কল্যাণে একটি টিভিসি কিংবা বিউটি পিজেন্ট প্রতিযোগিতা নারীকে জনসাধারণের সামনে যতখানি পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা রাখে, একটি মসজিদের ইমাম অথবা একজন পুরোহিত বর্তমান সময়ে সেই ক্ষমতা রাখে কিনা? যদি না হয়, তাহলে আসলে নারীবাদের আক্রমণের টার্গেট পয়েন্ট কে হওয়া উচিত? নারীর পোষাকের স্বাধীনতা বলতে আসলে আমরা কী বোঝাচ্ছি ? যেখানে নারী কেমন ধরনের পোষাক পরবে, কী ধরনের চুল কাটলে তাকে গ্ল্যামারস দেখাবে সেইটা নির্ধারণ করে দিচ্ছে কনজিউমার ওয়ার্ল্ড, রঙিন চুলে আপনি ভালো বোধ করবেন এই বোধ তৈরি করে দিচ্ছে লরিয়ালের মতো কনজিউমার প্রডাক্ট, সেইখানে আপনার পোষাকের স্বাধীনতা শ্লোগান আসলে কার পারপাস সার্ভ্ করবে? এই জায়গা গুলোতে নারীবাদীদের চিন্তার স্বচ্ছতা জরুরি ।

দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের বেশির ভাগ নারীবাদে বিশ্বাসীরাই তাত্ত্বিকভাবেই মনে করেন পুরুষতন্ত্রের অবস্থান পুরুষের লিঙ্গে। যৌনতা জৈবিক বিষয়, লিঙ্গ জৈবিক বিষয়, কিন্তু পুরুষতন্ত্র মনস্তাত্বিক বিষয়। পুরুষতন্ত্রের অবস্থান পুরুষের লিঙ্গে না। পুরুষতন্ত্রের অবস্থান নারী এবং পুরুষ উভয়ের মস্তিষ্কে। পুরুষতান্ত্রিকতা কোনো একক ব্যক্তি পুরুষের দোষ বা অপরাধ না, এইটা একটা সামাজিক কাঠামো। যার ধারক এবং বাহক নারী এবং পুরুষ উভয়ই। এবং রাষ্ট্র নিজের স্বার্থেই এই কাঠামোকে জিইয়ে রাখে।

আমার কাছে মনে হয়, আমাদের সমাজে পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্র্যাকটিশনার হচ্ছেন মা এবং শাশুড়ি- এই দুইটি চরিত্র । সেক্সুয়াল এবিউজ এই অংশটা বাদ দিলে, প্রতিটা মেয়ে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয় তার মা এবং শাশুড়ির কাছ থেকে। একাট মেয়ে কী পোশাক পরবে, কীভাবে চলবে, কতটুকু পড়াশোনা করবে, কাদের সাথে মিশবে, খেলবে কী খেলবে না, প্রেম করবে কী করবে না, এই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেন একজন মা আর বিয়ের পর একজন শাশুড়ি । এইটা কোনো একক মা বা শাশুড়ি চরিত্রের দোষ না।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পরিবারের মধ্যে তার যে পাহারাদার বসিয়েছে, সেইটা এই দুই নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে রুপায়ন করেছে। পুরুষতন্ত্র পুরো বিষয়টা সামগ্রিক, এইটাকে দেখতে হবে সামগ্রিকতার দৃষ্টি ভঙ্গিতে। এইটাকে বিশ্লেষণ করতে হবে সামগ্রিকতায়। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক কাঠামো এবং বিদ্যমান লৈঙ্গিক রাজনীতিকে ঠিকঠাক মতো বুঝতে পারা ছাড়া, বিশ্লেষণ ছাড়া নারীমুক্তি আন্দোলন সঠিক পথে এগুতে পারবে না !

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 179
  •  
  •  
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    184
    Shares

লেখাটি ৩৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.