বন্ধ ঘরের অন্ধকার ভেদ করে রিতিকার উঠে আসা

0

সৌম্যজিৎ দত্ত:

আঠার বছর বয়সে মেয়েটা প্রথমবার ধর্ষণের শিকার হতে হয় তার বিয়ের রাতে। সামাজিক বিয়ে। পরিবারে অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্রী রিতিকাকে সাত তাড়াতাড়ি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল। যৌনসংগমের জন্য মানসিকভাবে একেবারেই প্রস্তুত না থাকা রিতিকার কাছে প্রথম রাতেই তার স্বামী যৌন সম্পর্ক দাবি করে এবং জোরপূর্বক তা করেও।

ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে রিতিকার স্বামী রোজ রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে তাকে মারধর করত, জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত। যখন রিতিকা প্রথমবার সন্তান সম্ভব্য, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকায়, ডাক্তার কিছুসময় যৌনসংগম বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়। সেই সময়তেও তার স্বামী তাকে শারীরিক নির্যাতন করে ও সঙ্গমে বাধ্য করত। ফলে শারীরিক অবস্থার প্রচণ্ড অবনতি হতে থাকে ও মৃত সন্তানের জন্ম হয়। আবারও দুমাস পরে রিতিকা সন্তান সম্ভব্য হয়।

বিয়ের তিনবছরের মাথায় রিতিকা চাকরি পায়। চাকরির পুরো বেতনটাই তার স্বামী নিজে হাতে নিত। একবার রিতিকা তাদের বাচ্চার স্কুল-ফি চাওয়াই, তার স্বামী তাকে মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়ে আবারও ধর্ষণ করে। ডাক্তারের কাছথেকে চিকিৎসা নিয়ে সে পুলিশের কাছে গেলে, পুলিশ রিতিকার প্রতি ভদ্র ও বিনয়ী হয়ে, তাকে এক কাপ চা খাইয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয় ও সবকিছু মিটমাট করে নিতে বলে। রিতিকা বাড়ি ফিরে মিটমাট করে নিলে তার স্বামী সেটাকে বড় কোনো যুদ্ধজয় হিসেবে ভেবে নিয়ে আবারও যৌন সম্পর্ক করে। তার স্বামী এরপর আরও উদ্ধত হয়ে ওঠে। আবারও মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে রিতিকাকে মারধর করে। এরপর শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

রিতিকা তার বাবা, মাকে এইসব অত্যাচারের কথা খুলে বললে, তারা জবাব দেন, “কি লজ্জা! বাইরে জানাজানি হলে লোকে কি বলবে!” তারা রিতিকাকে চুপ থাকতে বলে।

রিতিকা জীবনে একটা ঝুঁকি নেয়। বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করে ও এই বিবাহিত সম্পর্ক থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। এখন রিতিকা নিজের জীবন নিজের মত করে বাঁচে, সে এখন একজন স্কুল শিক্ষিকা ও পিএইচ.ডি পড়াশোনা করছে। বাচ্চাটাকেও রিতিকা নিজের কাছেই রাখতে পেরেছে। মা ও সন্তান নিজেদের মত করে বেশ সুখে, শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছে।

রিতিকা পেরেছিল সেদিন পুরুষতান্ত্রিক অমানুষিক অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে। রিতিকা দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিল সমাজের সামনে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে কখনোই মানুষ ভাবেনা, বস্তুর মত ব্যবহার করতে চায়। হাতের পুতুল করে বা নিজের সম্পত্তি করে রাখতে চায়। বস্তু সম্পত্তির যেমন কোনো স্বাধীনতা থাকতে নেই, বস্তু সম্পত্তি যেমন শুধু চাহিদা মেটানোর একটা বস্তু, তেমনই নারীও এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের শুধু চাহিদা মেটানোর বস্তু।

নিজের মানুষ অস্তিত্বের জানান দিতে গেলে প্রতিটা নারীকেই আজ দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। রিতিকা নিজের লড়াইতে কখনো হার মানতে পারেনি, মাথা নত করতে পারেনি পুরুষতান্ত্রিক স্বামীর কাছে। স্বামীর পা ধরে ভিক্ষার বাঁচার জীবন সে চায়নি। সে চেয়েছিল নিজের অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিতে, সে প্রতিবাদ করে উঠেছিল। চরম অত্যাচারের বিরুদ্ধে গিয়ে সে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। রিতিকা জিতেছে। সমাজের সামনে উদাহরণ তুলে ধরেছে যে নারী কখনোই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ব্যবহারের কোনো অস্তিত্বহীন বস্তু নয়, নারীও মানুষ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 587
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    587
    Shares

লেখাটি ৩,১৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.