সম্পর্কটা রক্ষা করা জরুরি, ইগো নয়

0

নুসরাত বাবলী:

পাওয়া না পাওয়ার হিসাব নিকাশ বাদ দিয়ে আসুন সময় থাকতে সচেতন হই। সম্পর্কগুলোকে একটু সময় দেই, একটু পরিচর্যা করি, এতে করে কারো ইগোতে আঘাত লাগলেও অনেক নিষ্পাপ সম্পর্ক ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তাদেরকে আর “বয়েলিং ফ্রগ সিনড্রম থেরাপি” গল্পটার মতো গল্প হয়ে যেতে হবে না।

আমি কোনো বড়মাপের লেখিকা নই, ক্ষুদ্র লেখালেখির প্রয়াস আমার, তাই লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে আমার কোনো‌ বাছবিচার নেই। আজকেও একটা বিষয় হঠাৎ করে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তবে লেখাটার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের অসম্মান নয়, বরং চোখে আঙুল দিয়ে সমাজের কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা মাত্র। লেখাটা পড়ে যদি কারো ব্যক্তি জীবনে কিঞ্চিত পরিমাণ আঘাত লেগে থাকে, তবে তার জন্য লেখিকা কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না। লেখাটা লেখক/লেখিকার দায়, কিন্তু পড়ার পর বিচার বিশ্লেষণ পাঠকের দায়। উদ্দেশ্য আগেই বলেছি, তাই কথা না বাড়িয়ে মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করতে চাই।

বেশ কিছুদিন আগে একই টপিকের উপর দুইটা লেখা পোস্ট করেছিলাম। একটি “বিবেকের কাছে প্রশ্ন” অন‍্যটি “ঈদের সকাল”। এর মধ্যে ঈদের সকাল লেখাটা বেশ সাড়া পেয়েছিল। ওখানে ঠিক এরকমই একটা কথা ছিল-
“আমার জানা নেই ছেলে হয়ে জন্ম নেওয়াটা কী, কিন্তু মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটা হয়তো অপরাধের।”
অনেকেই কমেন্টে লিখেছিলেন
_ মেয়ে হয়ে জন্মানো শুধু অপরাধ নয়, ঘোর পাপ।
_ মেয়েদের জীবন এমনই হয়
_ এটাই নিয়ম

কেনো ভাই, মেয়েদের এতো কী দায় ঠেকেছে যে মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছে, তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও সব মেনে নিতে হবে??
লেখাটা বিভিন্ন পেজে আসার পর লক্ষ্য করলাম ছেলে vs মেয়ে এই টাইপ ব্যাপার-স্যাপার, মানে শুধু মেয়েদের জীবনেই বাধা আসে তা নয়, একটা ছেলে তার জীবনের সোনালী অধ্যায় পদার্পণের জন্য কতো বাধার সম্মুখীন হতে হয় তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়ে আবার নতুন কিছু লেখা পোস্ট হচ্ছে। আমি তাদের লেখাগুলোকে সাপোর্ট করি। কারণ এখন যে বিষয়বস্তু নিয়ে লিখছি তা পড়তে পড়তে আপনারা ও বুঝতে পারবেন আসলে ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটা কোনো সমস্যা নয়, বরং সমস্যা আমাদের সমাজের কিছু মানুষের দেখার দৃষ্টিতে এবং তাদের নিকৃষ্ট মানসিকতা পূর্ণ বিচার বিশ্লেষণে, এক কথায় মস্তিষ্কে সমস্যা তাদের। এধরনের মানুষের মানসিকতা বিশ্লেষণ করলে ব্যাপারটা ঠিক এরকমই দাঁড়াবে।

সকাল সকাল আম্মুর কাছে পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি আসবে, নিজের কাজ নেই বিধায় অন্যের কাজে বাম হাত ঢুকাবে।

_আরে ভাবী কেমন আছেন? বসেন, চা দেই?
_ দেন ভাবী দেন, একটু কড়া কইরা দিয়েন, মাথাটা খুব ধরছে।
_ কেন কী হয়েছে?
_ আর বোইলেন না ভাবী, ভাবছিলাম ছেলেটাকে বিয়ে দিবো নিজে পছন্দ করে। সুন্দরী বংশওয়ালা মেয়ে আনবো, বাবার নাম ডাক আছে এমন, কিন্তু সে কপাল আর কই, ছেলে নিজেই পছন্দ করেছে। বিয়ে না দিলে তো ছেলেকেই হারাতাম তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিয়েটা দিয়েছি।
_ কেন বউটা তো আপনার খুব সুন্দর হয়েছে, কী মিষ্টি চেহারা! আর বংশ পরিচয় ও ভালো শুনেছি।
_ ছাড়েন তো মিষ্টি না ছাই। জাদু করেছে আমার ছেলেকে। ছেলে এখন বউ ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। প্রতি বছরই তার হানিমুন লাগে, রিফ্রেশমেন্টের জন্য ইউরোপ ট্রিপ। একটু বোঝে না ছেলেটা কত কষ্ট করে ইনকাম করে। কই আমাদের সময় তো এসব ছিল না, তাতে কী আমাদের সংসার হয়নি? নবাবজাদী নিজে তো সংসারের কাজে হাতও দেয় না। সকালে নাস্তাটাও না, উল্টো ছেলেকে বলে টুকটাক কাজ শিখাতে যায়, আমি করতে দেই না। কত কষ্ট করে অফিস করে আসে ছেলেটা আমার।
আর সে যে কীসব কাপড় পরে, তা না হয় নাই বললাম, লাজ সরমের মাথা খাইছে।

আমি পাশের রুমে এসাইনমেন্ট এর কাজে ব্যস্ত, তবুও কথাগুলো স্পষ্টই কানে আসছে। তার কথাগুলো শুনে মনের মাঝে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হলো।
কিন্তু নিরুপায়, দুজন মুরব্বি কথা বললে নাকি তার মাঝে ছোটদের বলার অনুমতি নেই, এটাও সমাজের ঐসব মানুষের বানানো নিয়ম, যদিও যথেষ্ট বুঝি আন্ডার এইজ তো আর নই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সকল উসপিসানির অবসান ঘটলো। উফ, ইউ আর জিনিয়াস মা, আম্মু এবার প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। প্রশ্নগুলো যেন আম্মু না আমি নিজেই করছি।

_ আচ্ছা ভাবী, আপনার তো মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন, জামাই কেমন হয়েছে?
অনেক দিন দেখি না আপনার মেয়েকে, কেমন আছে সে?

আমি হাতের কাজটা রেখে একটু নড়েচড়ে বসলাম। অন্যের কথা কান পেতে শোনার অভ্যাস আমার নেই, কিন্তু তার এই উত্তরগুলো আমি অবশ্যই জানতে চাই।

_ জামাই আমার রাজপুত্র, আসলে কপাল ভাবী কপাল। আমার মেয়ে না রাজকপাল নিয়ে জন্মাইছে। জামাই তো আমার মেয়েকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। সকালে শুধু চা না, নাস্তাটাও নিজে তৈরি করে। সন্ধ্যায় চাটাও সে বানাবে। মেয়েকে আমার মাথায় করে রাখছে।
ও একটু ব্যস্ত আছে এই জন্য আসতে পারছে না। এমাসেই ওরা দুজনে দেশের বাইরে যাচ্ছে। জয়েন্ট ফ্যামিলি, বোঝেনই তো রিফ্রেশমেন্ট বলে তো কথা আছে, তাই না? আর এটাই তো বয়স, এখন করবে না তো কখন করবে বলেন!
ওর জন্যেই তো গতকাল সপিং এ গিয়েছিলাম জিন্স, টিশার্ট, টপস, যা যা লাগবে সব কিনেছি।

_আপনি বোধহয় স্কার্ফ কিনতে ভুলে গিয়েছিলেন? আপনার তো আবার এতো বেশি মডার্ন পছন্দ না।
_ না না ওখানে ওসব চলে নাকি? আর ফ্যামিলি থেকে দূরে যাচ্ছেই তো একটু আনন্দ করতে, বোঝেন তো!

_আপনার ছেলে তো জামাই এর মতো এতো রান্না বা কাজ জানে না, তাই না?

_ টুকটাক জানে, তবে সে তার বাবার মতো ভালো চা বানাতে পারে। পারবে না কেন, ছোটবেলা থেকেই তো দেখে আসছে।
কিন্তু আমি ওকে দেই না করতে, তাহলে বউ আনছি কী করতে, বোঝেন নাই!

হুম, আমি তো বুঝি, কিন্তু আপনারা কী বুঝলেন? জানি অনেক কিছুই বুঝছেন, কিন্তু বলবেন না। আচ্ছা চুপ থাকেন, চুপ থাকা বুদ্ধিমানের লক্ষণ। কিন্তু এতো বেশি চুপ থাইকেন না যেন বাজি পাল্টি দিলে তখন নিজেরই মেনে নিতে কষ্ট হয়, মানে বোঝাতে চাইছি ঠিক যেমন আপনার মেয়ে কোনো বাড়ির বউ, তেমনই আপনার বউও কোনো বাড়ির মেয়ে, বিষয়টা মাথায় রাখবেন।

মা জিনিসটা অনেক আদর ও ভালোবাসার, অনেক সম্মানেরও বটে, কিন্তু দোহাই লাগে এতো বেশি ভালবাসা ও মিলাতে যাবেন না, অন্য কারো ব্যক্তি জীবনে যে আপনার ভালবাসা তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়! কথায় আছে, যতো গুড় ততো মিষ্টি, কিন্তু তাই বলে এব্যাপারে তা মোটেও করতে যাবেন না এটা আপনার বানানো কোনো ডেজার্ট নয় যে ইচ্ছা মত মিষ্টি দিবেন। একটা ব্যাপার জানেন তো কড়া মিষ্টি আবার কিন্তু তেতো লাগে। তাই চেষ্টা করবেন সবসময় ব্যালেন্স রাখার। এতে করে আপনার সাথে যেমন তাদের সম্পর্ক ভালো থাকবে, তেমনি তাদের দাম্পত্য জীবনও সুখী হবে। আপনার মেয়ে/ছেলে সুখী আছে দেখে আপনিও সুখী থাকবেন, কনফার্ম।

আসলে ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটা কোনো সমস্যা নয়, বরং সমস্যা আমাদের সমাজের কিছু মানুষের দেখার দৃষ্টিতে। এই কথাটা কেন বলেছিলাম সে বিষয়ে বলবো যে,
ছেলে যখন জামাই তখন তার সব ঠিক এবং বউ যখন মেয়ে তখনও সব ঠিক, তাহলে মায়ের কাছে ছেলে এবং শাশুড়ির কাছে বউয়ের দোষ কি শুধু বিয়ের পরই করে?
তার মানে কি দাঁড়ালো বুঝছেন কিছু?

জানি লেখাটা পড়ে অনেকের মনেই বিরুপ ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে লেখিকার উপর, কিন্তু আমি আমার উদ্দেশ্যের কথা শুরুতেই বলেছি তাই আর রিপিট করতে চাই না।

সে যাই হোক, এই সমস্যার সমাধান আমি বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ দিতে পারবে না। ভাগ্য বলে অবশ্যই কিছু আছে, কিন্তু তাই বলে ভাগ্যের উপর সব ছেড়ে বসে থাকলে কপালে কিছুই জুটবে না। নিজের জন্য নিজেকেই ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হয়। নিজের ভাগ্যের উপর নিজেকে যেমন বিশ্বাস করতে হয়, তেমন চেষ্টাটাও নিজেকেই করতে হয়।

এ ব্যাপারে আমার খুব প্রিয় এবং শিক্ষণীয় একটা লেখা পড়েছিলাম কিছুটা হলেও সমাধান দিতে পারে ঈহিতা আপুর (ঈহিতা জলিল) ভাষায়,

***স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানে দুই পক্ষের পরিবার অতিরিক্ত ইন্টারফেয়ার করে তাদের জীবন কখনও সুখের হয় না। তাই মেয়ে বা ছেলে উভয়ের অভিবাবকদের উচিত বিবাহিত দম্পতির মাঝখানে কথা না বলা। বিশেষত বিয়ের প্রথম ৩/৪ বছর একটি দম্পতির সম্পর্কের ভিত তৈরি হয়। ওখানে অন্য কেউ, সে যেই হোন না কেনো, ডান হাত ঢুকালে সেই ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। বিয়ের প্রথমদিকে যে আবেগ থাকে তা পরে আর থাকে না। তখন অটোমেটিক তাঁরা দায়িত্ববান হয়ে যায়। এটা শেখাতে হয় না। বরং উপযাজক হয়ে শেখাতে গেলে ঐ দায়িত্ব বোঝা মনে হয়।

নবদম্পতিদের জন্য উপদেশ: মা অবশ্যই আদরণীয় কিন্তু তাদের নিজেদের সম্পর্কের ভিতর ঢুকতে দিবেন না। কথাটি ছেলে-মেয়ে উভয়ের মায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আজকাল ডিভোর্সের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এর অনেক কারণের মাঝে এটাও একটা অন্যতম কারণ। তাই সময় থাকতে সম্পর্কের সীমারেখা টানুন।

নব্য ও ভবিষ্যত শাশুড়িদের জন্য উপদেশ:

মেয়ের মায়েদের জন্য:
মেয়ের মায়েরা অহেতুক মেয়ের কাছে ফোন করে সংসারের খুঁটিনাটি জানতে চাইবেন না। তাঁর সংসার তাকে সামলাতে দেন। তাঁর স্বামী, তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ী, তাঁর দেবর-ননদ তাঁকে হ্যান্ডেল করতে দেন। আপনি আগ বাড়ায়ে কথা বলতে যাবেন না।

ছেলের মায়েদের জন্য:
ছেলে যখন বিয়ে করবে তখন আপনাকে বুঝতে হবে এখন তাঁকে মুখে তুলে খাওয়ানোর দিন শেষ। আর যদি সেটা না পারেন সরাসরি ছেলেকে বলে দিবেন, ” আমি চাই না তুমি কখনও বিয়ে করো”। আর যদি বিয়ের পর, ছেলে-বউ বেড়াতে গেলে সাথে আপনার যেতে ইচ্ছা করে, ছেলের বউ যেভাবে সাজে সেভাবে সাজতে ইচ্ছা করে, ছেলের বেড-রুম নিয়ে অতি আগ্রহ থাকে তাহলে প্লিজ কাউন্সিলরের কাছে যান। আপনার মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন।

এই সমস্যাগুলো সমাজে আছে। বউরা এগুলো কাউকে বলতে পারে না। আগের দিনে তো সহ্য করতো এখন ডিভোর্সে গড়ায়। তাই প্লিজ আপনারা সচেতন হোন।

মনে রাখবেন, “সময় গেলে সাধন হবে না।” – ঈহিতা জলিল।

আমার মনে হয় এইসব মানুষের আসলেই মস্তিষ্কে সমস্যা। এদের ভাবনাগুলোকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে গেলে হয়তো এভাবে বলা যাবে,

ভুূত – এই পৃথিবীতে আমিই একজন, যে ভালো একটা শাশুড়ি পেলাম না।
ভবিষ্যত – এই পৃথিবীতে আমিই একজন যে ভালো একটা বউ পেলাম না।

তাই বলছিলাম কী, “বয়েলিং ফ্রগ সিনড্রম থেরাপি” গল্পটা জানা থাকলে বুঝবেন যে ইগো নিয়ে পড়ে থাকলে আপনার হয়তো কিছু হবে না, কিন্তু আপনার মেয়ের বয়সী অন্য একটা মেয়ের জীবন মুহূর্তেই ধ্বংস হবে। অনেকটা ঐ বয়েলিং ফ্রগটার মতো। আমি বলছি না কোনো প্রকার বিদ্রোহ বা এমন কোনো পদক্ষেপ, কিন্তু একটা ব্যাপার তো মানতেই হবে যখন শরীরের কোনো অঙ্গে পঁচন ধরে তখন শরীরটাকে বাঁচতে সেই অঙ্গটাকে কেটে ফেলে দিতে হয়, পুরো শরীরটাকে নয়। তাই সম্পর্ক রক্ষা করুন, নিজের ইগো নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2K
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2K
    Shares

লেখাটি ৪,৬৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.