এখন কি ট্রিপল এক্স এর দিন এলো?

0

নাসরীন মুস্তাফা:

এতো কিছু ঘটে যাচ্ছে পৃথিবীতে! চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিত্য নতুন ওষুধ আবিষ্কারের তাড়না মানুষের অমরত্ব লাভের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলছে, এও যেমন বললো, তেমনি বলল নারী সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠার বিষয়টি। হা হয়ে যায় আরিফ। প্রশ্ন করে আশফাককে, ব্যাপারটা সত্যি?
দ্য পসিবিলিটি সিমস রিয়েল। ব্যাপারটা সত্যিই সত্যি। নারী ফেভার না করলে পুরুষের কম্ম কাবার। নারী যদি না চায়, তাহলে আগামী পৃথিবীতে পুরুষের আর কোন ভূমিকা হয়তো থাকছে না। তাই…

তাই?
পুরুষ হয়ে পড়বে অপ্রয়োজনীয়। ভয়ের বিষয় হচ্ছে, প্রকৃতি অপ্রয়োজনীয় কোন সত্তার অস্তিত্ব সহ্য করে না।
তার মানে?
পুরুষ হয়ে পড়বে বিলুপ্ত এক প্রজাতি। ক্লান্ত কণ্ঠে বলেন ডাক্তার আশফাক, ডায়নোসরের মতো বিলুপ্ত। পাথর খুঁড়ে কংকাল বের করে অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
শিউরে ওঠে আরিফ। ওর গা কাঁপছে, একশ’ ছয়-সাত ডিগ্রি জ্বর চলে এলে যেভাবে শরীর কাঁপে, সেভাবে কাঁপছে। হাই ছাড়তে ছাড়তে বলেন ডাক্তার, বুঝলেন? এ হচ্ছে প্রকৃতির প্রতিশোধ।
পুরুষের উপর কেন প্রতিশোধ নিতে যাবে প্রকৃতি? কী দোষ করেছে পুরুষ?

দোষ করেনি?
কী দোষ করেছে? পাল্টা প্রশ্ন করে আরিফ।
যুগ যুগ ধরে নারীর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকিয়েছে। আমরা পুরুষরা অকারণে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে নারীর প্রভু সেজে বসেছি। নারীকে বাধ্য করেছি অন্ধকারে থাকতে, নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি টের না পেতে এবং পুরুষকে অকারণেই প্রভু ভাবতে। শুধুমাত্র নারীর গর্ভে বীজ বুনে দিতে পারার ক্রেডিট আমরা যে কতভাবে নিয়েছি। অথচ দেখুন, নারী মা হিসেবে, নারী হিসেবে, বোন হিসেবে, কর্মী হিসেবে, ডিসিশান মেকার হিসেবে সফল হয়েছে। অবশেষে গর্ভে বীজ বোনার ক্রেডিটটাও তারা বগলদাবা করে ফেলল। নারী সব পেয়ে গেছে, সব।
বললেই হলো। ওসব পারাপারি-ই কি সব? পুরুষ না থাকলে নারীর স্তব করবে কে?
কর্মক্ষম রোবট বানিয়ে নেবে ওরা।

কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে আরিফ, নারীকে ভালবাসবে কে?
ডাক্তার আশফাক অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। পুরুষ ভালবাসে নারীকে?
বাসেই তো।
আপনি বেসেছেন?
অবশ্যই। আমি সোহাকে ভালবাসি।
আপনি তো দোলাকেও ভালবাসতেন। বাসতেন না?
চুপ করে যায় আরিফ। ডাক্তার তাচ্ছিল্যের স্বরে বলেন, আমরা গর্ব করে বলি, পুরুষ হচ্ছে ভ্রমরের মত। উড়ে উড়ে মধু খাওয়াটাই পুরুষের কাজ। পুরুষ বহুগামী হবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা ভালবাসা ফেরি করে বেড়াই। এখন কী হবে আমাদের? বহুগামী-একগামী…হায় হায় আমাদের গমনের যে কোনো উপায়ই থাকছে না। আরিফ, বলুন তো আমাদের, আই মিন পুরুষদের কী হবে?

ডাক্তার আশফাক ভদ্র ভাষায় না বলে বলতে পারতেন, বউরা কি স্বামীদের ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দেবে? পুরুষদের তখন উপায় কি হবে? গায়ের জোরে নারীকে দখল করতে চাইবে? চরম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে যাওয়া নারীকে কেন যেন রক্তের স্বাদ পেয়ে যাওয়া বাঘিনীর মতো মনে হচ্ছে। আরিফের ভয় করতে থাকে নারীর হিংস্র রূপ মনে করে। নখগুলো নখরে পরিণত হয়ে গেলে উপায় থাকবে কি?

বউ কথা না শুনলে চুলের মুঠি ধরে বের করে দাও, এরকম উপদেশ আব্বাজানের মুখে শুনেছিল আরিফ। মেজ ভাইটার বউ খুব মুখরা ছিল, স্বামীকে মানতো-টানতো না। আব্বাজান ছেলেকে সত্যিকারের পুরুষের কী কাজ, তার বিস্তারিত শেখাতেন। আরিফ একবার ওদের ঝগড়ার সময় বন্ধ দরজার এপাশে আব্বাজানকে কান পেতে ঝগড়া শুনতেও দেখেছে। দরজা খুলে গেলে রেগে আগুন হয়ে যাওয়া মেজ ভাইয়ের হাতে নিজের বেতের লাঠিটা তুলে দিয়েছিলেন তিনি। জরু আর গরু, দুটোর জন্যই মাইর উপকারী, আব্বাজানের কাছ থেকেই শিখেছে ও।

সোহার গায়ে হাত তুলতে হয়নি। শান্তশিষ্ট সোহা ওকে ভালবেসেছিল। ওর সন্তানের মা হতে চেয়েছিল।
বিকেলের রোদ সোহার মুখে-ঘাড়ে সোনালী রং মাখাচ্ছিল। অন্য সময় মোমের মত গলে পড়ে ওর মুখ, ওর শরীর। অথচ তখন লোহার মত শক্ত হয়ে সোহা দাঁড়িয়েছিল। বরফের মতো ঠাণ্ডা স্বরে শোনালো, আমি কেবলমাত্র আমার সন্তানের মা হবো।
আরিফ তখনো পুরো ব্যাপারটা বোঝেনি। কণ্ঠস্বরে আবেগ এনে ও বলেছিল, তুমি হবে মা, আর আমি ওর বাবা।
সোহা মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝায়। উহু, আমার সন্তানের বাবা আমিই।

যাহ!

ওর বাবা হিসেবে তোমাকে কেন লাগবে?
কী যে বলছো না? সন্তানের মা থাকে, বাবা থাকে। মা আর বাবা ছাড়া কোন সন্তান পৃথিবীতে আসে? এসেছে কখনো?
কখনো আসেনি। কিন্তু এখন আসবে। বাবা ছাড়াই, মানে পুরুষের বীর্য ছাড়াই নারীর গর্ভে সন্তান আসবে। নিজের তলপেটে পরম মমতায় হাত বোলাতে থাকে সোহা।
বিস্ময়ে পাথর না বরফ কী যে হয়ে গেল আরিফ, নিজেই বুঝলো না। অফিসে যা শুনেছিল, যা স্রেফ এডাল্ট জোক হিসেবে ভেবেছিল, ভেবে হেসেছিল হা হা করে, তা যে সত্যি হতে পারে ও ভাবেনি। নিজের হাসিই এখন ওর চারপাশে প্রেতাত্মার দীর্ঘশ্বাস বলে মনে হচ্ছে।
আরিফের কুঁকড়ে যাওয়া শরীর দেখে মুচকি হাসেন ডাক্তার আশফাক। ওর কাঁধে হাত রেখে বলেন, এখনো অত ভয়ের কিছু নেই।

নেই?

এখনো সেক্সের চাহিদা কমেনি। পুরুষের সাথে সেক্স নারীর কাছে এখনো রোমাঞ্চকর। এবং সেক্স এখনো খুব বেশি এক্সপেনসিভ হয়ে ওঠেনি।
আরিফের গলা শুকিয়ে কাঠ। ফ্যাসফেসে হয়ে গেছে। কোন মতে ঢোঁক গিলে বললো, কর্মক্ষম রোবট যদি বানানো যায়, সেক্স করতে পারে এমন রোবট কি বানানো যাবে না?
রোবট কি পুরুষের মত স্পার্ম দিতে পারবে?
পারতেও তো পারে। যা সব পারাপারি হচ্ছে, ভরসা পাচ্ছি না।
ও এক্সপেনসিভ হবে, আমি শিওর। অথচ সস্তায়, খুব সস্তায়, বলতে গেলে বিনে পয়সায় পুরুষের স্পার্ম পাওয়া যায়। যে নারীর হাতটান আছে, সে মনে হয় পুরুষের কাছেই আসবে সন্তানের জন্য। এতেই আপাতত চলবে। কী বলেন আরিফ?

আরিফের কেন যে মনে পড়ে, স্টুডেন্ট লাইফে কার কাছ থেকে শোনা জোকস টাইপের গ্রামাটিক্যাল এই জ্ঞানটি- সেইন্টেন্সের কোথায় কমা-টমা বসবে, তা নিয়ে। একটু এদিক-সেদিক হলেই অর্থ কেমন পাল্টে যায়। উদাহরণ ছিল এরকম- আ ওইমান উইদাউট হার মান ইজ নাথিং। আ ওইমান, উইদাউট হার ম্যান, ইজ নাথিং। আ ওইমান উইদাউট হার, ম্যান ইজ নাথিং।
সোহাকে ছাড়া আরিফ কেমন নাথিং হয়ে গেল!
জোকসটা কে শুনিয়েছিল?
সারা দিন ধরে কেবল ভাবছে আর ভাবছে। কিছুতেই মনে পড়লো না, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ জোকসটি কোন্ জ্ঞানী ওকে শুনিয়েছিল। মনে যদি পড়ে, যেভাবেই হোক্, আরিফ তাকে খুঁজে বের করবে। তার পা ধুয়ে পানি না খাওয়া পর্যন্ত ওর শান্তি নেই।

কিন্তু ঝামেলাটা এরকম। যতবার কে শুনিয়েছিল, ভাবতে চায়, ততবারই ওর কানে ভেসে ওঠে দোলার কণ্ঠ। দোলা এক ভর দুপুরে হাসতে হাসতে বলেছিল, শোন, তোমাকে একটা জোক্স শোনাই।
আরিফ আগেই হাসতে শুরু করে দোলাকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য।
দোলা ওর মাথার চুল টেনে ধরে বলে, বদমাশ! আগে শুনবে, তারপর হাসবে। বুঝেছ?
আরিফ আরো জোরে হাসে।
দোলা খুব জোরে চুল টানতেই আরিফ অহেতুক (মোটেও অহেতুক নয়) টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় দোলাকে নিয়ে একেবারে রমনা পার্কের ঘাসের উপর। নির্জন সেই দুপুরে কেবল একটি কাক তারস্বরে কা কা বলে চিৎকার করতে করতে পালিয়েছিল।

আরিফের কানে কানে দোলা বলেছিল, পুুরষ ঈশ্বরকে প্রশ্ন করলো—
আরিফ দোলার কানে কানে বলেছিল, নারী, তুমি এত সুন্দর কেন?
ঈশ্বরের জবাবটা দোলা দিয়ে দেয়, পুরুষ, তুমি ভালবাসবে বলে।
দোলা এরপর বলে, পুুরুষ জানতে চায়, হে ঈশ্বর! নারী এত বোকা কেন?
আরিফ ঈশ্বরের জবাবটা জানিয়ে দেয়, আমাকে ভালবাসবে বলে।
দোলা, বোকা নারীদের প্রতিভূ হয়ে ভালবেসেছিল আরিফকে। সেই আরিফ এখন বুঝতে পারছে না, ঈশ্বর সোহাকে অন্যরকম করে তৈরি করলো কেন? সোহা বোকা নয় কেন? না কি দোলাদের দিন শেষ? সোহাদের দিন শুরু হ’ল তবে!
ওয়াই যদি অপকর্ম না করতো, তা হলে এক্স কতো ভালই না থাকতো! এক্স এক্স কখনোই এক্স এক্স এক্স হতে চাইতো না।
থ্রি এক্স!
হু! থ্রি এক্স।

ওদিকে সোহার কান্না যখন ভরিয়ে তোলে আশপাশ, তখন বিষন্ন বাতাসে ফিসফিস করে ওঠে কতগুলো স্বর।

নির্মলেন্দু গুণের কবিতার ঢেউ তুলে বলে, কে কবে বলেছে হবে না? হবে, বউ থেকে হবে।/ একদিন আমিও বলেছি: ‘ওসবে হবে না।’/ বাজে কথা। আজ বলি হবে, বউ থেকে হবে।/ বউ থেকে হয় মানুষের পুনর্জন্ম, মাটি, লোহা,/ সোনার কবিতা—কী সে নয়?
‘সবাই মিলবে এসে মৌন-মিহি শিল্পে অতঃপর,/তোমার প্রদত্ত দানে পূর্ণ হবে পৃথিবী আমার।’

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 305
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    305
    Shares

লেখাটি ৩,০৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.