কী ভয়াবহ বর্ণবাদী আমরা!

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

আপনি কি কখনো কোনো কালো সুন্দর পুতুল দেখেছেন? একটা বয়স পর্যন্ত আমি কিন্তু দেখিনি! আমাদের মতো দেশগুলিতে কালো সুন্দর পুতুল নেই, আছে কালো দৈত্য। কদাকার কুৎসিত যতো জিনিস আছে, তা বোঝাতে আমরা কালো রং ব্যবহার করি।

আপনি আপনার বাচ্চাটিকে ফর্সা আর সুন্দর পুতুল কিনে দিয়ে, রাজকন্যা আর রাজপুত্রের গল্প শোনান। যেই গল্পের রাজকন্যা আর রাজপুত্ররা সবই কিন্তু ফর্সা এবং সুন্দর হয়। দৈত্য দানব ও শয়তানগুলি দেখতে কালো এবং কুৎসিত হয়। মনের অজান্তেই আপনি বাচ্চাদের মনে বর্ণবাদের বীজ ঢুকিয়ে দেন। অথচ এই আপনি ইউরোপ আমেরিকাকে বর্ণবাদী দেশ বলে গালাগালি করেন!

অনেক মানুষ আছেন, যারা খুব ধার্মিক। সর্বদা আল্লাহর গুনগান করেন। অথচ আল্লাহর সৃষ্টি কালো মানুষকে তাদের পছন্দ না। তারা বলেন ও ভাবেন, ” যাদের গায়ের রং কলো, তাদের মনও কালো”। অনেকেই আছেন যারা ছেলের বৌ, ভাইয়ের বৌ সবই খুঁজেন ফর্সা! ফর্সা হলো তাদের কাছে আভিজাত্যের প্রতীক, আর কালোরা হলো নিম্নবর্গীয়।

অনেকে খুব আধুনিক, অথচ ফর্সা রং তাদের কাছে স্মার্ট বলে মনে হয়। অনেকেই গায়ের রং ফর্সা করার জন্য সর্বদা ব্যস্ত থাকেন। কিছু প্রগতিশীল মানুষ আছেন যারা কেবলি ফর্সা রং দেখেই প্রেমে পড়েন। আবার অনেকেই অফিসের পিএ থেকে শুরু করে অফিসের স্টাফ পর্যন্ত সবই ফর্সা রাখেন। কেনো জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিভাগের প্রথম হওয়া মেয়েগুলি সব ফর্সাই হয়।

টিভিতে জয়া বলেন, “সৌন্দর্য হলো আত্মবিশ্বাস”। ফেয়ার এন্ড লাভলি বলে, “চাকরি পেতে হলে ফর্সা হও”। আর সংবাদপত্রে লেখা হয়, “ফর্সা হবেন কীভাবে”?

আমাদের নাটক সিনেমার নায়িকাগুলি দেখতে সবই ফর্সা! দুই একজন কদাচিৎ কালো থাকে, কিন্তু তারাও কেমনে জানি ঐ ফর্সা হতে শুরু করে। কিংবা অন্যদের মতোন ফর্সা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামে!

যে মেয়েটি এক সময় কালো রং নিয়ে ফটো সুন্দরী হয়েছিল, দুইদিন পরে সেই মেয়েটিই তার আপন রংটি হারিয়ে, আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মান খুঁজতে ফর্সা হয়ে ওঠে। আবার টিভির জনপ্রিয় উপস্থাপিকা হিসাবে খুব নাম করা কালো বর্ণের মেয়েটি হঠাৎ ফর্সা হতে শুরু করে।

অনেকে বলেন, “ভালো মানুষদের নাকি দেখলেই বোঝা যায়! তাদের চেহারায় একটা জ্যোতি থাকে”! আবার এই কথাও প্রচলিত আছে,“ কালী কাল কাসুন্দি, যার গায়ের রং যত কালো, তার মনটাও ঠিক ততোটাই কালো হয়।”

শুধু কি তাই? পদ্মিনী, হস্তিনী, শঙ্খিনী, ছাত্রীনি বলে চার প্রকারের নারীর চরিত্রের বর্ণনা পাওয়া যাই। যেখানে জন্মগত শরীরের গঠন আর শরীরের রং দ্বারা একজনের চরিত্র নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কালো বা খারাপ শারীরিক গঠন নিয়ে জন্ম নেয়া, কালো আর অসুন্দর মানুষগুলি সবই খারাপ! তারা হলো জন্মগত পাপী! যা তাদের গায়ের রং-ই বলে দেয়!

আবার দেখুন, আমাদের ধর্ম গুলিতেও বর্ণবাদ বিদ্যমান। এগুলি এতোটাই স্বাভাবিক যে আমারা তা উপলব্ধি করি না। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব ধর্ম বিশ্বাসী। তবুও এই বিষয়গুলি আমাকে পীড়া দেয়। যেমন, আমাদের নবী-রাসুলগণ, যাদের সম্পর্কে আমি জানি, তারা সকলেই সুন্দরের প্রতীক। ইউসুফ নবীর কথা তো আমরা জানি। আবার দেখুন, হাবিল-কাবিলের মধ্যে যে খারাপ শয়তান, যে ভাইকে হত্যা করে ছিলো, সেই কাবিল কিন্তু কালো। আবার হিন্দুদের দেবী মা দুর্গা কতোই না সুন্দর, তাকে শান্ত সৌম্য রূপ হিসাবে দেখানো হয়। অথচ “মা কালী”, যার রং কালো, তাকে রক্ত পিপাসু আর রাগী এবং জিঘাংসা বাস্তবায়নকারী রুপে উপস্থাপন করা হয়।

আর আফ্রিকানরা তো কালো বলেই সবার কাছে অসভ্য জাতি। এখনও অনেকেই কালো আফ্রিকানদের কালিয়া কালিয়া বলে কুৎসিত আনন্দ পান। তাদের ভাবখানা এমন থাকে যে কালোরা কালো বলেই আমাদের চাইতে ছোট এবং নিম্নবর্গীয় জাতি!

অথচ একটা সময়ে আমরা সবাই কালো বা শ্যাম বর্ণের ছিলাম। ঐ যে আর্যরা আসলো, এরপর মুঘল শাসন, অতঃপর ব্রিটিশদের প্রভাব। এতো কিছুর সংমিশ্রণের ফলে আমাদের গায়ে রং এর পরিবর্তন আসলো। আসলো চিন্তার হীনমন্যতা। এদেশীয় হয়েও ফর্সারা ধরে নিলো তারা জাতে উঁচু আর কালোরা অজাত কুজাতের। আর সমাজও তার ফর্সা রং প্রীতির কারণে ফর্সাকে উত্তম আর কালোকে অধম বানালো। অথচ এই রং ভাবনটা আগাগোড়া বর্ণবাদ চিন্তা। যা আমরা প্রতিদিন দেখি। যা আমরা নিয়মিত চর্চা করি। যা আমাদের আচার ব্যবহার ও কাজকর্মের মধ্যে লুকিয়ে আছে। যা আমরা স্বীকারও করি না, উপলব্ধিও করি না!

আমরা নিজেরাই যেখানে নিজেদের ফর্সা রং, নিজেদের এলাকা নিজ ধর্ম এবং বংশ পরিচয় নিয়ে গর্ব করি, সেখানে আমরাই ইউরোপ আমেরিকানদের বর্ণবাদী আচরণ দেখলেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ি! তাদেরকে বর্ণবাদী বলে গালাগালি করি! কী অদ্ভুত আমরা, তাই না?

অন্যদিকে এক সময়ের বর্ণবাদী দেশে হিসাবে পরিচিত ফ্রান্সে, আমি বাচ্চাদের হাতে কালো সুন্দর পুতুল দেখি। এদের কার্টুনগুলোতে কালো পজেটিভ ক্যারেকটার দেখি। এইদেশে কালোরা তাদের কালো রং নিয়ে দিব্যি আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘুরে বেড়ায়। আমি কখনো তাদের সাদা ফেস পাউডার দিতে দেখি নাই। না দেখেছি ফর্সা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা করতে। তারা তাদের কালো রং এর মধ্যেই আত্মসম্মান খুঁজে পায়।

টিভিতে যখন কালো বর্ণের লোকেরা তাদের কালো রং নিয়ে সগর্বে হাজির হয়, ভালোলাগায় আর ভালোবাসায় আমার চোখে পানি আসে। আমি তখন ভাবি, আমার জন্ম যদি এমন একটি দেশে হতো! যেখানে বর্ণ লুকিয়ে চলতে হয় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares

লেখাটি ৪,৬৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.