নারীকে মা-বোন-কন্যা ভাবা এবার বন্ধ করুক মানুষ

0

রোকসানা ইয়াসমিন:.

#MeToo
ফারহানা আনন্দময়ীর লেখাটা পড়ে মনে হয়েছিল, আহা, স্বপ্নের পৃথিবী যেনো! আমিও যদি শৈশব কৈশোরে ওর মতোন অমন সুস্থ সঙ্গ পেয়ে বেড়ে উঠতে পারতাম! স্মুদ যাকে বলে! নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের মোড়ে মোড়ে সভ্য মানুষের দেখা পেতাম! তাহলে হয়তো এই আমিটার অন্যরকম প্রকাশ হতো! নিজের শরীর, অস্তিত্ব এবং ঘটে যাওয়া ঘটনার সকল অপমান, লজ্জা, ক্ষোভ, দায়দায়িত্ব নিজে নিয়ে, যেনো আমিই অপরাধী, এমন হীনমন্যতায় ভুগে ভুগে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে কাটাতে হতো না জীবনের দীর্ঘ সময়!

মফস্বল শহরে আলো আঁধারী সন্ধ্যায় অষ্টমীর মেলাতে বাবার হাত ধরে হাঁটছিল হাসিখুশি উচ্ছল একটি মেয়ে। মাটির পুতুল, ঘাড় নাড়ানো সাদা তুলো দাড়ির লাল জামা বুড়ো কেনার আবদার করছে সে তখন বাবার কাছে। বেছে বেছে কাগজের ঠোঙায় তুলছে হাতি ঘোড়া, চিনির খেলনা। গাছে চড়ে, ছাদে মাঠে খেলে বেড়ানো বাবার আঙুল ধরে থাকা মায়ের আট বছরের মেয়েটির ছোট্ট বুকে আচমকা হিংস্র পুরুষের শক্ত থাবা পড়ে। সজোরে খাঁমচে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে যায় নোংরা ওরা, নামমাত্র মানুষ। ব্যথায় বিস্ময়ে হতবাক মেয়েটি। শহরটিকে তখন মনে হচ্ছিল যেনো একটি ঘন অন্ধকার অরণ্য। হাজারো হিংস্র পশুর মধ্যে মেয়েটির নিজেকে একটি হরিণ শাবক বলে বোধ হচ্ছিলো!

সেই মেলার ভীড়েই ঘটে আরও কয়েকবার ওই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সেদিনই শুরু।#MeToo.

কতো বলবো?
ক’ দিনের কথা বলবো!
ক’ বারের কথা বলবো!
ক’ জনের কথা বলবো!
কোন বয়সের কথা বলবো?
নয়, দশ, এগারো? তেরো? বিশ, একুশ?

২.
সারা বিশ্বে জুড়ে কোথাও না কোথাও প্রতিদিন যৌন নিপিড়নের শিকার হচ্ছে শিশু, কিশোরী, নারী।প্রতিদিন ধর্ষণের মতো নৃশংস, অমানবিক ঘটনা ঘটে চলেছে সেই আদিকাল থেকেই।এখন মিডিয়ার কারণে আমরা এসব খবর বেশি করে জানতে পারছি কেবল। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা, আমরা যারা নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পে, প্রযুক্তিতে সার্থক ও সভ্য মানুষ হিসেবে দাবী করি, ভাবতে আমার লজ্জা হয় যে, হাজারো চেষ্টা করেও এর কোনও প্রতিকার করতে পারছি না।

ধর্ষণের খবর শুনলে, অনেক শিক্ষিত মানুষও ধর্ষককে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“কী করে পারে ওরা এমন নৃশংসতা করতে, ওদের কি মা বোন নেই! ওদের ভাবা দরকার যে, পথে যে মেয়েরা চলছে, ওরাও কারও বোন, কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও মেয়ে!”
“ভুলে যাবেন না, যে নারীকে নির্যাতন করতে আপনি উদ্যত, তিনি কারও মা, কারও বোন, কারও মেয়ে!”
অনেকেই আবার বলেন ,
“বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, নিজের ঔরসজাত কন্যাকে ধর্ষণ করছে তারই বাবা।”

যারা ধর্ষণ করে বা করার মনোবৃত্তি পোষণ করে রাখে, মনোবিজ্ঞানীরা বলেন যে, এসব পুরুষ মানসিক ভাবে অসুস্থ। যারা বাবা, নিজের মেয়েদের অভিভাবক হয়ে ভালোমন্দ শিক্ষা দেবার কথা, বিপদ থেকে আগলে রাখবার কথা, তা না করে এরাই যখন নিজের মেয়েদের খুবলে খায়, স্বাভাবিক ভাবেই এরা জীবনের, সম্পর্কের, বিশ্বাসের মূল্যায়ন করতে জানেনা। হারিয়ে ফেলে সামাজিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। মানবিক শৃঙ্খলা থেকে বিচ্যুত হয় এরা, শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এদের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা।

যে পুরুষ ধর্ষণ করতে পারে, তার কাছে নিজের মায়ের, বোনের , স্ত্রীর, কন্যার শরীর এবং অন্য যে কোনও নারীর শরীর ও যোনীতে কোনও পার্থক্য থাকে কি? আমার তো মনে হয়না।শরীর যখন তার কাছে কেবলই একটি মাংসপিণ্ড, খাদ্য, সে তখন অন্যের মেয়ে আর নিজের মেয়ের মধ্যে পার্থক্য কী করে করবে! যে পুরুষ ধর্ষণ করতে পারে, তার কাছে নিজের মা, বোন, স্ত্রীর প্রতি সম্মান থাকে বলেও আমার মনে হয়না! সে অন্যের মূল্যবোধ কী করে মূল্যায়ন করবে! সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, যে পুরুষেরা মাথায় ধর্ষণ পুষে রাখে, সেইসব পুরুষদের ধর্ষণ না করবার জন্যে নিজের মা বোনের কথা ভাবতে বলবার কোনও মানে হয় কি?

এভাবে হয় না। এসমস্ত সস্তা সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তায় ধর্ষকের হিংস্রতা থেমে থাকে না। তাই বলছি, নারীকে মা বোন কন্যা ভাবা এবার বন্ধ করুক মানুষ। নারীর জন্যে সিম্প্যাথি জাগানোর জন্যে, নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফাঁদে কোণঠাসা করে রাখবার জন্যে খুব পুরনো একটি ফালতু আবেগ এটি। এসব উপাধি নারীকে মানসিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করে। দুর্বল করে দেয়। দিনে দিনে আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়ে নারীর নিজস্ব পরিচয়কে বিভ্রান্ত করে।

একজন নারী একজন সম্পূর্ণ মানুষ। তার শরীর, তার চিন্তা চেতনায় বুদ্ধিগুণে একজন পরিপূর্ণ মানুষ। নারীকে মানুষ ভাবতে শিখুক মানুষ। নারীকে নারী ভাবতে শিখুক মানুষ। নারীকে মানুষ এবং নারী, এই দুই হিসেবেই সম্মান করতে শিখুক মানুষ।

প্রতিটি শিশু, কিশোর, কিশোরী হাসিখুশি নির্ভয় জীবন কাটাবে, নারীরা তাঁদের নিজস্ব পরিচয় নিয়ে, দিনে কিংবা রাতে, আলো কিংবা অন্ধকারে, ঘরে কিংবা বাইরে যৌন নিপীড়নের ভয় মুক্ত পরিবেশে ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে পারবে, এমন সভ্য পৃথিবীর স্বপ্ন আমরা, আমরা যারা #MeToo, এখনও লালন করি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 14.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    14.8K
    Shares

লেখাটি ৩২,৬২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.