‘হিন্দু নারীর সম্পত্তি’র কপালে লাথি!

0

সুচিত্রা সরকার:

এদেশে হিন্দু নারী সম্পত্তি দিয়ে কী করিবে? সম্পত্তির কোনো কাজ নাই হিন্দু নারীর! তাই সেই ‘সম্পত্তি’র কপালে লাথি মারলাম।- লেখক উবাচ!

দোষ নেবেন না পাঠক! কারণটা খুলে বলি!

হিন্দু নারীদের এদেশে অনেক অবলম্বন। বিয়ের আগে বাবা। বিয়ের পর বর। বরের অবর্তমানে পুত্র!
হিন্দু নারীরা এদেশে অনেক ভালো আছে। আর যদি সেসব কিছুই না থাকে, গয়া- কাশী- বৃন্দাবনের রাস্তা তো খোলাই আছে! চলে যাক তারা সেখানে!

কুমিল্লায় আমার বাড়ি যে এলাকায়, মূলত হিন্দুপ্রধান অঞ্চল। মামাবাড়ির অবস্থাও একই।
এদেশের হিন্দু নারীদের ভাগ্য গড়েন যে মাতব্বরেরা তারা চোখে কুলুপ আঁটলেও, আমি দেখেছি বিস্তর।

সজ্ঞানে- অজ্ঞানে দেখা পেয়েছি অনেক হিন্দু নারীর। দেখেছি সম্পত্তি না থাকার ফলে তাদের দুর্দশা! দেখেছি তাদের বিলাপে, আকাশে কালবৈশাখীর মেঘ জমতে! দেখেছি সম্পত্তি থাকার পরও, তারা ভিক্ষার থলি নিয়ে দাঁড়ে দাঁড়ে ঘুরছে।

আজকের মহাভারত তাদের নিয়ে নয়। আজ আমার মহাভারত বলার সময়। বা এই মহাভারতের গল্পটা আমার মায়ের!মায়ের জন্মের আগে দিদিমা আরো এগারো সন্তানের মা হয়েছিলেন। কেউ জ্বরে, কেউ প্রসব জটিলতায়, কারো বা অন্য কোনো রোগে ভুগে শিশুকালেই জীবন সাঙ্গ হয়েছে! শুধু সুনীল মামা, মায়ের সবচে বড় ভাই মেট্রিক পরীক্ষার দিন কলেরায় মারা গেছে।

দাদু যতদিন বেঁচে ছিল, শুধু সুনীল, সুনীল আর সুনীল। দিদিমা বলতেন, কার্তিকের মতো চেহারা ছিল! মা বলে, আজ যদি ভাইটা আমার বেঁচে থাকতো!
আজ বুঝি, কেন ওদের এতো অাক্ষেপ! কেন কন্যাসন্তান কামনা করে না পরিবার! দাদু খুব প্রভাবশালী আর বিত্তশালী ছিলেন। দাদুর গোলায় পাঁচশ মণ ধান থাকতো! আমার মায়ের চুল ধোবার জন্য ছিল একজন বাঁধা দাসী! দিদিমার ছিল বিস্তর লোকলস্কর!

তারচে বড়, আমার দাদু ছিল পাঁচ গ্রামের মাতব্বর! এখনো কুমিল্লার নেতা প্রাণ গোপাল দত্ত বা আলী আশরাফের কাছে দাদুর নাম নিলে, ম্যাজিকের মতো কাজ হয়ে যায়!

তাই দাদুর আক্ষেপ ছিল, একটা ছেলে নেই তাঁর। বংশের মান রাখবে কে? সম্মানটা কার হাতে হস্তান্তর করবেন? দাদুর বাতিটা কার হাতে জ্বলজ্বল করবে? কে দাদুর নামটা বয়ে নিয়ে বেড়াবে? আমার মা? তিনি কী করে পারবেন? বিয়ের সময় হাজার আলোর রোশনাইয়ের একমাত্র লক্ষ্য তো মাকে গোত্রান্তর করা!

মাকে দাদু দান করে দিলেন অচেনা উঠোনে। মা দিদিমাকে অন্নের ঋণ শোধ করে চলে এলেন আমাদের বাড়িতে। সেই মাকে নিয়ে দাদুর কেন কোনো আশা থাকবে? এই ‘সিস্টেমে’ মেয়েদের উপর আশা রাখে ছাগলে! মায়ের প্রথম সন্তান আমি! বংশের বাতি হতে পারলাম না। আশা জাগাতে পারলাম না প্রচলিত সিস্টেমে আটকে থাকা দাদুর মনে।

তারপর কোল আলো করে ‘সবে ধন নীলমণি’ এলো আমাদের পরিবারে! আমার একমাত্র ভ্রাতা! দাদু আবার প্রত্যাশা করলেন! অবলম্বন খুঁজলেন। নিজের নামের বাতিটা ধরিয়ে দিলেন আমার ভাইয়ের হাতে। তবে পুরো বাতিটা নয়! তাহলে তো দাদুর ‘স্বর্গ’ লাভ ঘটিবে না!

শাস্ত্রে আছে যে পিতার পুত্র থাকে না, মৃত্যুর পর কন্যা তার শ্রাদ্ধ করতে পারবে না। ভ্রাতুষ্পুত্র (ভাইয়ের ছেলে) যদি দয়া করে তার শ্রাদ্ধ করে, তবে তিনি স্বর্গে যাবার ‘চান্স’ পাবেন! বিচক্ষণ দাদু তার সম্পত্তির তিনভাগের একভাগ একমাত্র কন্যার ছেলেকে দান করলেন (কন্যাকে দেয়া শাস্ত্রে হারাম)। আর বাকি দুই ভাগ ভাইয়ের ছেলেদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।

সম্পত্তি পেয়ে তারা ‘যার পর নাই’ খুশি। আমার মা-ও একরকম খুশিই। বাবার নামটা বাঁচিয়ে রাখতে একটা ট্রাস্টি করবেন ওই সম্পত্তিকে ঘিরে! এরকম নানা স্বপ্ন তাঁর।

সময়, তখনো হাসছে। কারণ, নাটকের তখনো পর্দা নামেনি।

পর্দা নামছে এখন।
মায়ের কাকাতো ভাইরা এখন মনে করছে, মা তো এই সম্পত্তির যোগ্য উত্তরসূরি নয়। তাঁর পুত্রসন্তানও নয় এই সম্পত্তির আসল মালিক। আসল মালিক তারাই। কারণ তাদের রক্তেই বইছে বংশের নাম।

সুতরাং মায়ের উচিত এই সম্পত্তি (যদিও সম্পত্তি আমার ভাইয়ের নামে) ওদেরকেই দান করে দেয়া। তাহলে মা আগের মতোই, বাপের বাড়ি যেতে পারবে! আদর আপ্যায়ন পাবে! আপন ভাইয়ের মতো তারাই মায়ের যত্ন করবে।

অতঃপর সম্পত্তি দখল! গ্রামের মাথা- মাতব্বর এক হয়ে গেছে মাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য! কাল সন্ধ্যায় মা বলছিল, ‘বাবার নাম নিশানা আর রাখতে পারলাম না। আর বাপের বাড়িতে যাইতে পারুম না!’ জানি, শুধু নিশানা নয়, মায়ের স্মৃতিও মা হারাতে বসেছে।

সেই পুকুর ঘাট। সেই ‘সিন্ধি আমগাছ’ থেকে আম পারা, দক্ষিণের সড়কের রাস্তাটা, বাবা- মায়ের শ্মশান, জামগাছে লতানো মধু মালতী, টক বড়ই গাছটার মিষ্টি ছায়া, শৈশবের সাথি- বকুলদি, হেমুপিসি, তরণী কাকার রামায়ণ গান, রান্নাঘরের কোনে দাঁড়িয়ে কষা মাংসের গন্ধ।

মায়ের স্মৃতিতে বারবার উঠে আসছে আঙিনার স্মৃতি। সেখানে হারিকেনের টিমটিমে আলোর একপাশে মায়ের একমাত্র কাকা হারাধন। তাঁকে ঘিরে বসেছে শিশুরা। গল্প শুনছে বিশ রকমের। গল্প শুনছে নীতির!
হারাধন সরকার প্রতিরাতে শিশুদের ঈশপের গল্প শোনাতো। আজ তিনিই আমার মাকে ‘ভূমিহীন’ করলেন!

মাঝরাতে মা ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠলো!
-কী হয়েছে, মা?
উত্তরে মা ঘুমঘোরে বললেন, ‘ভয় পাইছি, ভয়’!

আমিও শিওরে উঠলাম! চেনা ভয়ে আমিও মুহ্যমান!

(বাংলা ব্যকরণের নিয়ম এ লেখায় খুঁজতে না যাওয়াই ভালো)

২২.১০.২০১৭
দুপুর ১.০৩ মিনিট
দারুস সালাম, ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 985
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    985
    Shares

লেখাটি ৩,৬৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.