আদালত প্রাঙ্গণ হোক নারীবান্ধব ও জেন্ডার বৈষম্যহীন

0

প্রমা ইসরাত:

আমি বরাবর আমার বাবার মতো হতে চেয়েছিলাম। আমার বাবা একজন আইনজীবী, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি আইন নিয়ে পড়বো ও আইনজীবী হবো। ছোটবেলায় আমার বাবা সাদা শার্ট, প্যান্টের ওপর কালো কোট, কালো টাই পরে কোর্ট এ যেতেন। সকালে তার কোর্টে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া দেখতে আমার ভালো লাগতো। আবার বিকেলে তিনি যখন বাড়ি ফিরে আসতেন, সেই দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগতো। ঘরে ঢুকে তিনি তার কালো কোট টি গা থেকে খুলে আলনায় ঝুলিয়ে রাখতেন। সেই কালো কোট থেকে তখন ঘামের গন্ধ বের হতো। আমার সেই ঘামের গন্ধ ভালো লাগতো।

বাবার প্রতি আবেগ আর ভালবাসা থেকেই এবং সেই সাথে তার মানুষের জন্য, মানবতার জন্য কাজ করা দেখেই আমি প্রেরণা পেয়েছিলাম আইনজীবী হওয়ার। কিন্তু খুব অবাক হয়েছিলাম যখন আমার বাবাই একসময় চাইছিলেন না আমি আইন পেশায় আসি। বিশেষ করে আদালতে গিয়ে প্র্যাকটিস করি। এর পেছনের একটাই কারণ , আর তা হচ্ছে কাজ করার জন্য আদালত প্রাঙ্গণ নারী বান্ধব নয়।

এমনিতেই একজন তরুণ আইনজীবীকে অসম্ভব পরিশ্রম করে আদালতে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হয়। যেহেতু আমাদের দেশের আইন ব্যাবস্থা ব্রিটিশ সময়কার, এবং ব্রিটিশদের আদব কেতায় আইন ও আদালত চলছে। সেই জন্য গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কালো কোট এবং এর উপর কালো সিল্কের গাউন চাপাতে হয়।

আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে পারা বেশ সময় সাপেক্ষ। আইনে পড়াশোনা করে স্নাতক হলেই একজন আইনজীবী হতে পারে না। তাকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে। আর সেই সার্টিফিকেট নিতে হলে বারকাউন্সিল আয়োজিত সনদের পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। এরপর ফিস দিয়ে একটি বারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তবেই আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করা যাবে। কিন্তু একজন সদ্য পাশ করা আইনজীবীর জন্য শুরুতেই মক্কেল পেয়ে মামলা পরিচালনা শুরু করে দেয়া এই দেশের প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সহজ না।

আর আদালতে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শিক্ষানবিশ হিসেবে সময় পার না করলে কোন কাজ শেখা হয়ে ওঠে না, কেননা আইন পেশায় মামলা পরিচালনা এবং কোর্ট মুভমেন্ট সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই বাস্তবতা সম্পর্কিত। শুধু বই থেকে পড়ে আইন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কিন্তু আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে হলে আদালতে থেকেই তা শিখে নিতে হবে। আর এই শেখার ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় একজন সিনিয়র আইনজীবীর উপর। আইন পেশায় সিনিয়র আইনজীবী একজন মেনটর এর ভূমিকা পালন করেন।

আইন পেশা নারী পুরুষ সবার জন্যই একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, কারণ এই পেশার মূল ক্ষেত্র আদালত এবং মূল পুঁজি মক্কেলের মামলা। এখন এই চ্যালেঞ্জিং একটি পেশায় বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় নারীদের ক্ষেত্রে। এই সমস্যা বহুমুখী।
নারী অবান্ধব, ঠাসাঠাসি পূর্ণ কোর্ট পরিবেশ।

নারীদের জন্য আলাদা কমন রুম, স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন সুবিধা, খাবার পানির সুবিধা না থাকা।
আদালত প্রাঙ্গণে কক্ষ বরাদ্দকরণ এর ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ে পুরুষ পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করে ।
নিরাপত্তা, শারিরীক নিরাপত্তা এবং অপর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা ।
শারীরিক বা যৌনহয়রানী বিশেষ করে জুনিয়র আইনজীবীদের ক্ষেত্রে।
হয়রানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে অনিচ্ছা, ভয়, এবং সুস্পষ্টতার অভাব।
অভিযোগ করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পেশাদার কর্মকান্ডে, এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রভাবের ভয়।

২০০৯ সালে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি বাধ্যতামূলক রাখার ব্যাপারে হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় ঘোষণা হওয়ার পরও, কোর্টরূমে এবং চেম্বারে নারী আইনজীবী দের সাথে হওয়া হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার কোন ফোরাম বা স্থানের অস্তিত্ব না থাকা।
অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার ভয়ে কাজ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক চাপ।

পুরুষ দের তুলনায় নারী আইনজীবী দের কম ফিস প্রদান এবং লাভজনক কোন মামলায় বা বিষয়ে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে নারী আইনজীবীদের বঞ্চিত রাখা।
ক্লায়েকন্ট দের অভিব্যাক্তিতে নারী আইনজীবীর তুলনায় পুরুষ আইনজীবীর উপর বেশি আস্থা প্রকাশ পায়।
আদালতের ক্লার্কদের তরুণ এবং নারী আইনজীবীদের প্রতি বিরূপ আচরণ।

আইন নিয়ে যারা পড়েছেন, তাদের আইন সম্পর্কিত অনেক জায়গায়ই কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কোম্প্যানী তে লিগ্যাল এডভাইসার হতে পারেন কেউ, কেউ এনজিও কিংবা মানবাধিকার সংগঠনে কাজ করতে পারেন, কেউ জুডিশিয়াল সার্ভিসে পরীক্ষা দেয়ার মাধ্যমে বিচারক হতে পারেন, আইন মন্ত্রণালয়েও কাজের ক্ষেত্রে রয়েছে। এই সকল ক্ষেত্র তূলনামূলক কম ভোগান্তিমূলক, একজন নারী আইনজীবীর পেশা জীবনের “আদালত অভিজ্ঞতার“ তুলনায়।
নারী রা সকল পেশায়, সকল ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারে, যদি সেই পরিবেশ নারীবান্ধব হয়।

আমাদের দেশে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থায়, নারী কে নানান বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তবেই এগিয়ে যেতে হয়। বেশিরভাগ পুরুষ যেমন পুরুষতান্ত্রিক, তেমনি বেশিরভাগ নারীও পুরুষতান্ত্রিক । আর তাই একজন পুরুষ যখন বলে এই কাজ নারী তোমার জন্য না, তখন নারী সেই কথাটা বিশ্বাস করে বসে। এবং এই কাজ যে নারীর না সেটা প্রমাণ করার জন্য নানান ভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দেয় আমাদের সমাজ, সমাজের মানুষেরা।

পরিশ্রম করতে হবে সবাইকেই। নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সমাজ এগিয়ে যায়। কিন্তু সেইজন্য সকল কর্মক্ষেত্রে চাই নারীবান্ধব পরিবেশ।

তাই আদালত প্রাঙ্গণ হোক নারীবান্ধব, জেন্ডার বৈষম্যহীন। নারী পুরুষের জেন্ডার সমতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সবার প্রথমে সমতার মাধ্যমে ন্যাবিচার প্রতিষ্ঠা পাক আদালত প্রাঙ্গণে।
লেখকঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ৩৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.