রাস্তায় সন্তান প্রসব এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশা

0

উইমেন চ্যাপ্টার: সম্প্রতি আজিমপুর মাতৃসদনের বাইরে চিকিৎসকদের অবহেলায় একটি গরীব তরুণী মেয়ের সন্তান প্রসব এবং পরবর্তীতে সন্তানটির মারা যাওয়া নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হচ্ছে। মাত্র ১৫০০ টাকা দিতে না পারায় তরুণী ওই মায়ের স্থান হয়নি হাসপাতালে। ফলে তাকে ওই প্রসববেদনা নিয়ে রাস্তার ওপরেই সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে। করুণ এই ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই সাধারণের মনে নানা ক্ষোভ তৈরি করেছে। সমালোচনায় মাতৃসদনটির অবহেলা, দুর্নীতির পাশাপাশি চিকিৎসকদের অবহেলার প্রসঙ্গটিও বার বার আসছে।

এ প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রুমানা বিনতে রেজা নামের একজন একটি লেখা দিয়েছেন। উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের জন্য লেখাটি লেখকের অনুমতিক্রমে এখানে তুলে দেয়া হলো। তিনি তার লেখায় পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশার কথাই তুলে ধরেছেন।

ঢামেক, মিটফোর্ড ও আজিমপুর ম্যাটার্নিটি ঘুরে এক গরীব প্রসুতি মা চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় বাচ্চা প্রসব করেছে, এ ব্যাপারে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল জারি করেছেন। এ ব্যাপারে আমি কিছুটা খুশি। এতে যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য-অধিদপ্তরের টনক কিছুটা নড়ে। হাসপাতালে দালাল,তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কিছু গল্প শোনাই আজ।

ইন্টার্ন এর সময় সার্জারি ওয়ার্ডের ঘটনা, এডমিশন ডে,এক রোগী খুবই চিৎকার চেঁচামেচি করছেন কেন তাকে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। তার সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝলাম,একজন ডাক্তার তাকে কেবিন এ রাখবেন বলে ১২০০ টাকা নিয়েছেন,এখন সেই ডাক্তারকে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না!!!! সরকারী হাসপাতালে প্রফেসর নিয়মিত রাউন্ড দিয়েছেন তাঁর মতই,মামা-খালারা রোগীকে গিয়ে বলছেন– ‘ভাল ডাক্তার দেখে গেল,উনার ভিজিটটা দেন এখন, রুমে পৌঁছাই দিয়ে আসি”।

আমি আর পরী মেডিসিন ওয়ার্ড কিছু ক্যাথেটার করতাম,কে না জানে এইসব কাজ নতুন ইন্টার্নরা কতটা আগ্রহ নিয়ে করে।কিন্তু মেডিসিন এ এই কাজটা করতে গিয়ে ওয়ার্ড বয়দের চক্ষুশূল হতে হয়েছিল।ওয়ার্ড ইনচার্জ দিদি একদিন বলল ‘আপা,ক্যাথেটার করলে সাথে খালাদের সাথে নিয়ে করেন,আপনার আর পরী আপার ডিউটি থাকলে ওরা কোন টাকা পায় না,তাই এডমিশন ইভেনিং এ আর আসতে চায় না!!”

সিজার এর রোগী রেডি করে, সিনিয়রদের সাথে এসিস্ট করে,বাচ্চা নিয়ে ছবি টবি তুলে ইন্টার্নরা খুশিই! অইদিকে খালারা বাচ্চার আত্নীয়দের কাছে বলে “৫০০ টাকা দেন,ভেতরের ডাক্তারদের মিষ্টি খাবারের ব্যবস্থা করি,তাইলে বাচ্চা বাইরে আনতে দিবে”।

সংগত কারণে হাসপাতালের নাম ও সময়কাল উল্লেখ করছি না,একজন ব্রাদার নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে পোস্ট ন্যাটাল ওয়ার্ডের কিছু রোগীদের চেক-ড্রেসিং করার নামে ব্যান্ডেজ ও স্যানিটারি ন্যাপকিন খুলিয়ে পরীক্ষা করতেন রাতের বেলা। পরে সেই ঘটনা জানাজানি হওয়ায় তাকে অন্য ওয়ার্ডে বদলি করা হয়েছিল,অন্যত্র গিয়ে সে আর কি করেছিল সেটার অবশ্য আর ফলো-আপ রাখা হয় নি।

আমার বাসার বুয়া গল-ব্লাডার স্টোন নিয়ে ভর্তি হতে গিয়েছিল ঢামেকে, তার অপারেশন রাতারাতি দুই ঘন্টায় চানখারপুলের এক ক্লিনিক এ হয়ে গেলো ২২ হাজার টাকায়! তার ভাষ্যমতে তারা সিএনজি থেকে নেমেছিল, দুইজন লোক এসে বলল ঢাকা মেডিকেল এ অপারেশন করাবেন? আসেন আমার সাথে! তারা তাদের সাথে গেল, এরপর সে আর কিছুই জানে না!

এই যে হাসপাতালের ইনডোর, আউটডোর, হাসপাতাল প্রাঙ্গণ সব জিম্মি দালাল, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী দ্বারা, এদের নিয়ন্ত্রণ এর কোন পরিকল্পনা আদৌ হাসপাতাল কতৃপক্ষের আছে কি না আমার জানা নেই। এদের নিয়ন্ত্রনের গুরত্বটুকু আসলে স্বাস্থ্য সেক্টরের হর্তাকর্তারা বুঝেন কি না সেটাও আমি বুঝি না।

ডাক্তাররা পার্ট ওয়ান-পার্ট টু কোর্স লিখতে পারবেন না,কোন মেডিকেলের কেমন পোস্টে আছেন (সহকারী/সহযোগী /অধ্যাপক) এটা লেখার নিয়ম নেই চেম্বারে, নামের আগে অভিজ্ঞ/বিশেষজ্ঞ লেখা নিয়ে কত নিয়ম, কোন কোন ডিগ্রী লেখা যাবে আর যাবে না সেইটা ঠিক করা নিয়ে কত মাথাব্যথা বিএমডিসি-স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের। ডাক্তারদের ‘ভুল চিকিৎসা’, কর্তব্যে গাফলতি নিয়ে আইন এর দাবি উঠে মাঝে মাঝে।
কিন্তু এমন একটা আইন কি আছে যেখানে দালাল/কর্মচারীদের দ্বারা রোগীদের হয়রানি করার জন্য এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়?

আমি নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছি, সরকারী হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি করাতে এক প্যাকেট প্যাড ছাড়া কিছুই রোগীর কিনতে হয় না। কিন্তু এই যে ১৫০০ টাকা লাগবে বলা হয়েছে, আমি জানি এটা কিসের জন্য। এটা দুই/তিনটা নরমাল স্যালাইন লাগবে, কিছু এন্টিবায়োটিক লাগতে পারে, ক্যানুলা, মাইক্রোপোর, কোন কোন সময় অজ্ঞান করার সুই এর জন্য, ব্লাড গ্রুপিংয়ের খরচটুকু বাদে এই সবগুলিই সরকারের দেয়ার কথা।সাপ্লাই নেই, তাই রোগীকে আনতে বলা হয়েছে। সাপ্লাই নেই কেন, কোন দিন কি প্রশ্ন জাগে না কারো মনে?

ব্লাড গ্রুপিং এর কথা এলোই যখন, সরকার এত নাই নাই এর মধ্যেও প্রতিটা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সএকদম নামমাত্র মূলে এন্টি-নেটাল চেক-আপের সময় প্রসুতি মায়ের সিবিসি,ব্লাড গ্রুপিং,সুগার আর ইউরিন এর পরীক্ষার ব্যবস্থা রেখেছে।
যারা পৃথিবীতে একটা বাচ্চা আনার সিদ্ধান্ত নেন তারা এই সেবাটুকু নেয়ার প্রয়োজনীয়তাটুকু অনুভব করবেন না, এ কেমন কথা?

প্রতিটি ওয়ার্ডের একটা পুওর ফান্ড আছে (যদি সিএ নিতান্ত চশোমখোর না হন)। অসংখ্য গরীব রোগীদের এই ফান্ড থেকে সাহায্য করা হয় এটা সকল সরকারী মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন /অনারারী/ চাকরী করা ডাক্তারেরা জানেন। এই যে ১৫০০ টাকার অভাবে একটা শিশুর মৃত্য হলো, হাসপাতাল গেট থেকে এই রুগি যে ডাক্তারের কাছে পৌঁছাতে পারল না, এই দায়ভারটুকু কার?ডাক্তারের? রোগীর? নাকি হাসপাতাল চত্বরের দালালদের?

প্রসুতি মায়ের খবর সংক্রান্ত যে নিউজটি হয়েছে, আমজনতা ডাক্তারদের ধুয়ে দিচ্ছে দেখলাম।

এবার বলুন তো,গুলিস্তান একজন আসন্ন প্রসবা মা বসে কাতরাচ্ছিলেন, লোকজন সেটা ভিডিও করেছে, আপনারা যারা ভিডিওটি করেছেন, আপনারা কি মানুষ? হাসপাতাল এ সে আসার পর তাকে বলা হয়েছে ১৫০০ টাকা লাগবে। সব হিসাব পরে, ঐখানে থাকা ১৫ জন সাধারণ মানুষ তো ১০০ করে টাকা দিলেও ১৫০০ টাকা হয় তৎক্ষণাৎ। তা না করে আমজনতা দাঁড়িয়ে মজা নিয়েছে।
বলি মানবতার ইজারা কি শুধু ডাক্তাররাই নিয়েছেন?”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 536
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    536
    Shares

লেখাটি ১,৪৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.