মা হয়ে আমারই দায়িত্ব সন্তানকে সেক্স এডুকেশন দেয়া

0

রুমানা রশিদ রুমি:

আমার ছেলে অমি যেদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল ,’মা son sex with mom অথবা father sex with daughter’ এটা কি কখনো হয়? আমি অবাক হয়নি একটুও। শুধু বলেছিলাম এটা সে কোথা থেকে জেনেছে। বলেছিল ইউটিউবে।
মনে আছে আমার ওর তারপরের দিন কী যেন একটা কঠিন পরীক্ষা ছিল স্কুলে। সেটা পড়ানো বাদ দিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে গল্প করেছিলাম আমরা। গল্পের মধ্যে বলেছিলাম sex কেন করি? কীভাবে করি? শরীরের কোন কোন অঙ্গ একাজে লাগে? কার সাথে করি? আমার ধর্ম কার কার সাথে sex করতে নিষেধ করেছে ,কেন বিয়ে আসলো? sex করলে কী হয়, sex এর preparation কী?

কেন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিতে হয়? কেন জাঙ্গিয়া পরতে হবে? মা কেন ব্রা পরে ? কেন পুতুলের (অমির বোন) সাথে এখন আর একসাথে মা গোসল করতে দেয় না, কেন ফারিয়া (অমির খালাতো বোন) এলে এখন আর বেলকনির দরজা বন্ধ করে খেলতে দেয় না মা, কিংবা খালা কেন দাদা্বাড়ি গেলে ফাতিমা, সামিয়া (অমির চাচাতো বোন), চৈতি (অমির ফুপাতো বোন) দের সাথে গায়ে জড়াজড়ি, ধস্তাধস্তি খেলা খেলতে মানা করেছে মা, কেন কোথাও বেড়াতে গেলে অমিকে মা বলে পুতুলের সাথে সাথে থাকো, privacy কী, নিজের সাথে অন্যের কতটুকু দূরত্ব রেখে কথা বলতে হবে হোক সে মানসিক কিংবা শারীরিক—– এরকম অনেক অনেক কেন আর কেন নিয়ে সেদিন আমরা গল্প করেছিলাম।

না, এরকমের গল্প সেদিনই প্রথম হয়নি আমাদের। আগেও হয়েছে অনেকবার। যেমন অমি জন্মানোর আগে কোথায় ছিল? পুতুল কেন হলো? কোথা থেকে বের হলো? আমি সিজারের কাটা দাগটা দেখালেও সে জানতো মার পেট থেকে বের হওয়ার আরো একটা পথ আছে। এটা নাকি একটা গেমের মধ্যেও আছে নাম pregnant surgery simulator।
সেদিন অমি আর পুতুলের বাবাও ছিল আমাদের সাথে। আমরা চারজন মিলে একটা নরমাল ডেলিভারি কেস একসাথে লাইভ দেখেছি ইউটিউবে। তাতে মা যখন চিৎকার করে কাঁদছিল আমার অমি কাঁথার নিচে মুখ লুকিয়ে বলেছিল মা, আমার ভয় হচ্ছে মা। পরে স্বাভাবিক হয়ে বলেছিল, এতো কষ্ট করে তবে কেন বোন আর তাকে মা আনলো? আমি আদর করে বলেছিলাম, তা না হলে আমার ছোট্ট ছোট্ট সুন্দর কিউটি কিউটি বাবুদের কোথায় পেতাম?

আর আগেই গল্পগুলো করার জন্যেই হয়তো অমি এবারের প্রশ্নটা করতে সংকোচ করেনি। এসব একটু বেশি আগেই শেয়ার করা হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অমি পুতুলদের এখনো পিউবার্টি হয়নি, ওরা এসব বোঝে না ,একটু বেশি রকমের বাড়াবাড়ি করে ফেলি, বেশি বেশি চিন্তা করি এসব নিয়ে কখনো যে ওদের বাবার সাথে মতপার্থক্য হয়নি, তা নয়।

কিন্তু তাকে বলেছিলাম, শোন আমার শাশুড়ি অজ পাড়া গাঁয়ের মা ছিলেন। ছেলের সাথে এসব শেয়ার করার জন্য শিক্ষাগত জ্ঞান তার ছিল না। বলোতো, কতদিন মেডিকেল ক্লাস শেষে রুমে এসে মাস্টারবেট করেছো? ব্লু ফ্লিম কি তোমাকে টানেনি? আমার সাথেই রিক্সায় রাস্তায় যেতে পথে কত মেয়েকে ইভ টিজ করেছো? কতদিনই না বাসায় এসে খেতে খেতে অফিসের কলিগ, রোগী কিংবা পথের কোনো মেয়ের বডি শেপ নিয়ে জোকস করেছো? কিংবা আমাদের প্রতিটা intercourse ই কি রোমান্টিক বা mutual understanding ছিল? সব দিনই কি আমরা দুজন দুজনকে কথায়, চিন্তায় respect করতে পারি? এসব কিছুর জন্য কি ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠায় কাউন্সেলিং জরুরি নয়?

আমাদের দুজনের চলার পথে কত কথায় তর্ক হয়েছে, কত ইগো তৈরি হয়েছে, কত সুন্দর সময়গুলো অভিমানে কেটে গেছে। ভাবনার মধ্যে কিছু ভুল শুধরে নিলে ক্ষতি কী? তোমার মেডিকেল সায়েন্স আর আমার সোশ্যাল সায়েন্স। কমিউনিটি মেডিসিনে সামান্য কিছু থাকলেও সোশ্যাল সা্য়েন্সের একটা বড় বিষয় বারবার হয়তো skip করছো।
মনে পড়ে মেঘলা আকাশ সিনেমা’র কথা? সেখান থেকে মানুষ এইডস নিয়ে শিক্ষা যতটুকু নিয়েছে, সিনেমা হলের বড়পর্দায় যৌনতা দেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে তার চেয়ে ঢের বেশি। যৌন শিক্ষা, নারীর প্রতি সম্মান নিয়ে কথা বরাবরই চটি পত্রিকার মতন চুলকানিতে মানুষ শুনে, কিন্তুু মানে না। পারিবারিক শিক্ষাটা জরুরি। তোমাকে কিংবা শাশুড়ি মাকে ছোটো করছি না।

বলছি, চেতনা বোধ সৃষ্টি মাকেই করতে হয়। তা না হলে এখনো কত বড় বড় পজিশন হোল্ডাররা নারীদের মেয়েমানুষ কেন ভাবে? আমাকে কতবার চাকরি ছাড়তে বলেছো ভয়ে যে, পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবো না ভেবে? তুমি মোবাইল-ট্যাব দেবে, আর বলবে ইউটিউবে এডাল্ট কিছু দেখো না, এটা তুমি কি মানতে বা মেনেছে? আর ওরা তো গেমের মধ্যেই কত কী শিখে নিয়েছে।

পার্থ্ক্য ওদের সাথে আমাদের যে আমরা জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া দর্শক ছিলাম আর ওরা straightforward। ওদের সাথে আমাদের জেনারেশনের গ্যাপ, cultural lag টা মেনে নাও। পারলে অনেক বেশি জানার চেষ্টা করো পাল্লা দিয়ে ওদের আগে। যাতে করে নতুন ডিভাইস, নতুন থিম, নতুন কিছুর ভালোটুকু ওরা নেয় খারাপটা বাদ দিয়ে। আমি তো বিশ্বাস করি, ভালো মন্দ’র মিশেল না থাকলে balance থাকে না।

অমির বাবা কথা বাড়ায় না, কিন্তু একথা বলে শেষ করলো ‘দেখো কী লাভ হয়? ‘সাথে কিছু ফোসফোঁসানিও ছিল। আমি যেন সন্তানকে লালন পালনে একটা ভালো মানুষ গড়ে তুলতে আমার বেছে নেয়া পথে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লাম। মানে এপথে ভালো ফল না হয়ে খারাপটাও হতে পারে। যেমন অতি curiosity তে ছেলেমেয়ে আরো বিগড়াতে পারে, ইঁচড়ে পাকা হতে পারে। তবে এ শঙ্কা আমাদের মনে মনে থাকে। বাবা মা হয়ে যা বলছি, অমি পুতুলকে অন্তত মানসিকভাবে এভাবে তৈরি করতে চাচ্ছি অন্যায় বা অপরাধ করলেও যেন অকপটে বাবা মার সাথে শেয়ার করে, তাতে অন্তত তারা পরিবার থেকে সেখান থেকে বের হবার সাহায্য পাবে। একা হয়ে যাবে না।

জানি সময়ের সাথে সাথে অমি সরলতা হারাবে। কিন্তু মা হয়ে প্রতি মুহূর্তে শেখাতে তো পারি অন্তত অমানবিক হবে না। আমি তো চাইবো না, আমার সন্তান কোনো ধর্ষক হোক কী ঘরে কী বাইরে…যদি ছেলের বেড়ে ওঠা দেখে ছেলের বাবা নিজেকে নতুন আয়নায় আবিষ্কার করে তাহলেও তো পাওনা কম হয় না …….তাই আমি বলে যাবো। আর আমাদের মা ছেলের গল্প চলতেই থাকবে……

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 3K
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3K
    Shares

লেখাটি ১৬,১১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.