আমরা নারীরা পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নই, বরং সহযোগী

0

শক্তি রাণী মণ্ডল:

আমিও একজন বেকারের দায়িত্ব নিতে চাই। আমার মতো হয়তো আরও অনেকেই চায়, কিন্তু আমাদের সমাজ কি আমাদের সেই সুযোগ দিবে? আমরা জন্ম থেকে বিবাহ পূর্ব পর্যন্ত বাবার উপার্জন, কখনো ভাইয়ের উপার্জন, বিয়ের পর স্বামীর উপার্জন এবং শেষ বয়সে এসে সন্তানের উপার্জনের উপর নির্ভর করার ব্যাপারটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।

আমরা জন্মের পর থেকেই দেখেছি আমার বাবাই পরিবারের কর্তা, জেঠু, জেঠতুতো ভাইয়েরা তাদের পরিবারের কর্তা। অর্থাৎ পুরুষপ্রধান এবং একমাত্র পুরুষই উপার্জনকারী। বাবা জ্যাঠারা জমিজমার দেখাশুনা করেন, চাষবাস করেন। বাড়ির বউ মেয়েরা বাড়ির মধ্যেই থাকেন, বাবা জ্যাঠুরা বাজারসদাই এনে দেন, আর মা জেঠিরা রান্নাবান্না করেন, খান-দান।পরিবারের এই টুকটাক কাজগুলোর স্বীকৃতি নারীরা এখনো পাননি।

কেননা এইটাও আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমি পেয়েছি আমার মায়ের কাছ থেকে, মা পেয়েছেন তার মায়ের কাছে, তার মা পেয়েছেন তার মায়ের কাছে। এভাবেই আমরা এতোদিন এটাকে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে ব্রতের মতো পালন করছি। বাড়ির সব ব্যয়ভারই মোটামুটি বাবার হাতেই হয় (যদিও আমার মায়ের ব্যাপারটা একটু আলাদা, আমি জন্মের পর থেকেই আমার মাকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে দেখেছি, বাবার সাথে কাজেকর্মের তুলনা করলে প্রথম পুরষ্কার আমার মায়েরই প্রাপ্য, ভদ্রমহিলা ভিতর-বাহির দুইটাই সামলাতেন বাবার সাথে, এখনো তাই হয়। আমাদের জীবনে যেটুকু সফলতা তার পুরোটাই আমাদের মায়ের পরিশ্রমের ফসল)।

আমার মা নারীর আর্থিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও উনার ব্যক্তিগত কোনো একাউন্ট নেই। উনার ভাষ্যমতে, “আমরা তিন ভাইবোনই উনার ব্যাংক ব্যালেন্স।” সব মা-ই বোধহয় এরকম হয়!

আমার এক আত্মীয়াকে দেখেছি ইন্টারমিডিয়েট এ পড়ার সময়ে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তার শ্বশুরবাড়ির মানুষ বাড়ির বউ বাইরে গিয়ে পড়াশুনা করলে বাহিরমুখো হয়ে যাবে, চাকরি করলে শ্বশুর শাশুড়িকে সম্মান দিবে না, ভাত রান্না করবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি তাই তার পড়াশুনা একরকম বন্ধ করার বন্দোবস্ত করেন। কিন্তু বউটি ছিলো নাছোড়বান্দা। বিয়ের তিন মাস পরই ছিলো টেস্ট পরীক্ষা। জোরজবরদস্তি করে পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হয়, বাবা মায়ের সহায়তায় ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ডিগ্রি শেষ করে এবং পরিবার পরিকল্পনা অফিসে একটা ছোটোখাটো চাকরিও পেয়ে যায়, এর মাঝে তার একটা মেয়ে বাচ্চাও হয়। মেয়েটার বয়স এখন আনুমানিক বারো কী তেরো বছর।
আর্থিক স্বাধীনতা লাভে তার পরিবার থেকে, সমাজ থেকে কম বাধাবিপত্তির শিকার হতে হয়নি।

এবার একটা নিজের ব্যক্তিগত কথা বলি। আমার জন্ম একটা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। বর্ষায় একসময় কোমর পানি ভেঙে স্কুলে যেতে হতো। (যদিও এখন বন্যায়ও পানির দেখা যায় না) আমার বাবা অধিকাংশ সময় স্কুলে যাওয়ার সময় বাড়িতে থাকতেন না। আমরা তিনভাইবোন একইসাথে স্কুলে যেতাম। একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে বাবা জেঠু কাকার পরিবার তিনভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে যার যার পরিবার নিয়ে সে সে ব্যস্ত হয়ে যায়, তাই পুরুষ বলতে বাবাই ছিলো একমাত্র ভরসা। কিন্তু বাবা যখন থাকতেন না, তখন? তখন আমার মাকেই কোমর পানিতে আমাদের তিন ভাইবোনের একজনকে কোলে এবং একজনকে পিঠে করে সড়কে তুলে দিয়ে আসতেন, আবার স্কুল শেষ হলে আমরা এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম, মা গিয়ে নিয়ে আসতেন। এভাবেই আমাদের ছোটবেলা শেষ হয়। একসময় আমরা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে এলাম।

তিন ভাইবোনের খরচ চালাতে যখন বাবা প্রায় হাঁপিয়ে উঠলেন, আমার মা হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল হেনতেনের বাদান (দল) লালনপালন শুরু করলেন। অবশেষে মহিলা আমাদের ছোট্ট একটা পুকুরে (গ্রামে আমরা এটাকে পাগার বলি) মাছের পোণা ছাড়লেন। পুকুরের সাথে ছিলো ধান ক্ষেত। ক্ষেত আর পুকুর মিলে মায়ের মোটামুটি একটা ফিশারি হয়ে গেলো। মায়ের এইসব কাজের জন্য অনেক সময় অনেক নিন্দাজনক কথা শুনতে হয়েছে, কিন্তু একজনও তখন বের হয়নি একশো টাকা দিয়ে সাহায্য করার মতো। অনেক কাছের মানুষও নাক সিঁটকেছে। আমার মায়ের সেই মাছ, হাঁস-মুরগি গরু-ছাগলের টাকা দিয়ে আমাদের অনেক খরচই সম্ভব হয়েছে।

আমাদের সমাজের পুরুষেরা নারীর আর্থিক স্বাধীনতা কোনোদিনই মেনে নিতে পারেন না এইটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই।
আমি আমার এক দুঃসম্পর্ক এর আত্মীয়াকে জানি যিনি স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব ভালো একটা সাবজেক্ট এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও তিনি আজ বালিশের কভার এবং রন্ধন শিল্প নিয়ে ব্যস্ত। মাতাব্বর বাড়ির বউ বাইরে চাকরি করবে এর চেয়ে খারাপ কাজ আর কী হতে পারে??

আমার জানা মতে, অধিকাংশ শিক্ষিত মেয়েই চান তার শিক্ষাকে ঘরেবাইরে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে, পুরুষের সহযোগী হয়ে দেশ ও সমাজের সাথে পরিবারের উন্নতি সাধনে নিজেকে নিয়োজিত করতে। শুধু উচ্চশিক্ষিত কেন, সাধারণ কম শিক্ষিত মেয়েরাও কি পিছিয়ে আছে?

না। আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, নারীরা কী হারে নিয়োজিত। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় ৬০% এরও বেশী নারী শ্রমিক। এইগুলা আমাদের চোখে পড়ে না। আমাদের চোখে পড়ে “প্রেমিকের পকেটের দিকে প্রেমিকার চোখ”, কিভাবে মেয়েদের লোভী প্রমাণ করা যায় আমরা সবসময় তার ধান্ধায় থাকি। অথচ আমি এমন অনেক প্রেমিক দেখেছি, “প্রিয়তমার টিউশনির টাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রত্যাখ্যান করে চলে যেতে।”
ভালোমন্দ মিলিয়েই মানুষ।

আমরা নারীরা পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নই সহযোগী। আমাদের পুরুষ সমাজ আমাদের সহযোগিতা না করলে আমাদের সহযাত্রী মনে না করলে, আমাদের সবসময় দমিয়ে রাখতে চাইলে আমাদের পক্ষে কি কখনো সম্ভব সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া?
“তুমি আর আমি মিলেই যখন আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে অসুবিধে কোথায়?”

মুখে অনেকেই প্রগতিশীলতার কথা বললেও পুরুষদের একটা অংশ কখনোই নারীর আর্থিক স্বাধীনতা চায় না। কারণ তাদের ইগো একটু বেশি, বউয়ের টাকা সংসারে দিলে আত্মসম্মানে লাগবে, তাছাড়া বউ বাইরে চাকরি-বাকরি করলে যদি বিপথে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি আশংকা। তারা বউদের ঘরের শোপিস এর মতো দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

রন্ধনশিল্প আর বিছানা শিল্পে পারদর্শী হইলে একজন নারীর কাছে স্বামীর আর কি চাওয়ার থাকতে পারে?
আরেকটা অংশ আছে যারা সত্যিই নারীর মুক্তি চায়, চায় এরাও মানুষের মতো বাঁচুক কিন্তু এই সম্প্রদায়ের সংখ্যা খুবই নগণ্য তাই আশানুরূপ ফল আশা করা যায়না।

পুরুষের একটা বৃহৎ অংশ মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করে এরা বাইরে বাইরে চরম প্রগতিশীল ভাব দেখালেও ভিতরে ভিতরে সেই লেবেলের গোঁড়া। একেকটা বজ্জাতের চরম পর্যায়।
যেসব ছেলে সবসময় মেয়েদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন এই পোস্টটা বিশেষ করে তাদের জন্য।মেয়েরা পরনির্ভরশীল, মেয়েরা লোভী, আগাছা, ইত্যাদি ইত্যাদি বলার আগে নিজের মনকে প্রশ্ন করুন, আপনার চিন্তাধারা ঠিক কতটুকু উন্নত?

আপনি আজ কারো ভাই, কারো প্রেমিক একদিন বাবা হবেন নিশ্চয়ই?
আজ আপনার প্রেমিকার যখন আপনাকে ছাড়া অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তখন তাকে লোভী, ছলনাময়ী বলে আখ্যায়িত করছেন, অথচ আপনার বোন যখন কোনো সমবয়সী ছেলের সাথে প্রেম করছে, তখন তাকে জোর করে একটা প্রতিষ্ঠিত ছেলে দেখে বিয়ে দিচ্ছেন।

আমার একজন সুশিক্ষিত বেকার বিয়ে করতে অসুবিধে নেই, তার ভরণপোষণ থেকে যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নিতেও অসুবিধে নেই, হয়তো যে মেয়েটা একটা বেকার ছেলেকে ভালোবাসে, তারও বিয়ে করতে, সংসার করতে কোনো অসুবিধে নেই, প্রেমটা তো সংসার করার লালনীল স্বপ্ন নিয়েই করেছিলো, তাই না?

এইবার আপনি ভাবুন, আপনার বোনকে, আপনার মেয়েকে একটা বেকার যুবকের হাতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও তুলে দিবেন কিনা? আপনার চারপাশের আত্মীয়স্বজনদের নাক উঁচু করা কথা সইতে পারবেন কিনা? পরিবর্তন কেবল চাইলেই হবে না, আপনাকেই শুরু করতে হবে, কারণ আপনি পুরুষ, আমার সমাজে আপনিই সর্বেসর্বা।।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ১,৬৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.