গণপরিবহনে প্রতিদিনের বিভীষিকা

0

হৃদিমা হক:

দৃশ্য ১:
ঢাকার একটি পাবলিক বাসে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সংরক্ষিত নয়টি আসনের তিনটিতেই বসে আছেন সামর্থ্যবান তিনজন পুরুষ, পাশে দাঁড়িয়ে আছে পরে বাসে ওঠা কলেজের ইউনিফর্ম পড়া এক কিশোরী , কাঁধে বইখাতা বোঝাই ভারী একটা ব্যাগ।

কিশোরী: ভাইয়া, এই সিটগুলো তো রিজার্ভড, একজন উঠবেন প্লিজ?
সিটে বসা একজন পুরুষ: ক্যান? আরো মানুষ তো দাঁড়ায়া আছে, তারা তো বসতে চায় না, আপনাদের সব কিছুই বেশি লাগে। পিছনের সিটে তো মহিলা বইসা আছে, তারা তো আমাদের সিট নষ্ট করছে। তাদের আগে উঠতে বলেন।

দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ ১: দাঁড়াইয়া যখন যাইতে পারেনই না, বাইর হোন ক্যান ঘর থেইকা? মাইয়া মানুষের এতো পড়ালেহা কইরা লাভটা কী?

দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ ২: প্রধানমন্ত্রী আপনারা, শিক্ষায় বেশি আপনারা, চাকরিতে বেশি আপনারা, তারপরও আপনাদের জন্য কোটা লাগে, বাসে এক্সট্রা সিট লাগে। আপনাদের জন্য কিন্তু আজকাল পুরুষরা নির্যাতিত!
অগত্যা মেয়েটি এতগুলো মানুষের কটূক্তি শুনতে শুনতে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো এই ভারী সময় আর অনন্ত পথ শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।

দৃশ্য ২:
সন্ধ্যা ছয়টা। বাসায় যেয়ে রান্না আর সন্তানের পড়াশোনার একরাশ চিন্তা মাথায় বাড়ি ফেরার জন্য বাসস্টপে অপেক্ষারত কর্মজীবী নারীর সামনে সেকেন্ডখানিকের জন্য একটি বাস এসে থামলো আর তাতে হুড়মুড় করে উঠে পড়লো বেশ কয়েকজন পুরুষ। ওই নারী যখন উঠতে যাবেন ঠিক তখনই কন্ট্রাক্টর সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো তাকে। সিট নাই, সিট নাই, মহিলা উঠানো যাইবো না। তারই ফেরার দরকার সবার আগে, কিন্তু এই পৃথিবীতে নারীর জন্য জায়গার বড় অভাব। ক্লান্ত আফরোজা তাকিয়ে রইলো গোধূলির নিয়ন আলোর ভেতর দিয়ে ছুটে আসা অন্য কোনো লাল সাদা আলোর সম্ভাবনার দিকে।

দৃশ্য ৩:
সিটিং বাস হলেও তিন চার ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। তাদের একজনের আবার শরীরে মোটে ব্যালেন্স নেই। একটু পর পর ঢলে পড়ছে পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটির দিকে, কোমর দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছি মেয়েটির কাঁধে, হাতে। আড়স্ট হয়ে বসে থাকা মেয়েটি প্রানপণ চেষ্টা করছে নিজেকে আরো সরিয়ে নিতে, আরো গুটিয়ে নিতে। কপাল! জন্মান্তর থেকে বয়ে চলা শরীরটাই যে মস্ত ভুল!

স্কুল কিংবা কলেজে পড়া কিশোরী মেয়েটি, কর্মক্ষেত্রে ছোটা ঝকঝকে তরুণী, দায়িত্বশীল মাঝবয়স পেরিয়ে আসা আত্ববিশ্বাসী নারী কিংবা প্রতিদিন প্রাইভেট থেকে পাবলিক পরিসরে বেরিয়ে আসা এদেশের অধিকাংশ নারীর ভরসা এই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এর। জীবনপ্রক্রিয়ার অধিকাংশ জায়গার মতো এ জায়গাটিও তাকে দিতে পারে না একটুখানি স্বস্তি আর নিরাপত্তা।
সকালে ঘরের সব কাজ সেরে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মেয়েটির চুলের শক্ত বাঁধনের চেয়েও শক্ত করে আঁকড়ে ধরা পক্ষপাতিত্বের সংস্কার ছাড়তে পারে না মানুষগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীটির একটু পরে শুরু হওয়া পরীক্ষার ভয়ের চেয়েও ঢের বড় হয়ে দাঁড়ায় পাশের সিটের বৃহত্তম অংশ নিয়ে বসে থাকা পুরুষটির ধরণ চলন কেমন হবে সেই ভয়।

আরো নানা ক্ষেত্রের মত পাবলিক ট্রান্সপোর্টে কিছু পুরুষ যে প্রশ্নগুলো প্রায়ই নারীদের করে থাকেন, হয়তো তারা সত্যিই সেগুলোর উত্তর জানেন না কিংবা কে জানে, হয়তো জেনেও না জানার ভাব করেন। কোটা ব্যবস্থা করা হয় সমতা আনার জন্য। কিছু সুবিধা বেশি দিয়ে কিছু নারীকে পাবলিক সেক্টরে নিয়ে এসে সমাজ নামক গাড়িটার দু’টি চাকা সমান করে গাড়িটা চালানোর চেষ্টা করা হয় মাত্র।

এখনো এদেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে (বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও উচ্চপদে) নারীরা পুরুষের এক চতুর্থাংশও নয়, অবিশ্বাস্য মনে হলেও একথাই সত্যি। আমি বলছি না, সব পুরুষই অসহোযোগী, এখনো অনেকেই আছেন যারা বাসে নারীদের দেখলে সম্মান করে উঠে দাঁড়ান, নিজের সিটটি ছেড়ে দেন।

আসলে পুরুষের সত্যিকারের পৌরুষ- শক্তির যথাযথ ব্যবহারে, অপপ্রয়োগে নয়। নারীদের সাথে পুরুষদের সম্পর্কটা প্রতিযোগিতার নয়, সহযোগিতার। মানুষ হিসেবে নারীর অবস্থায় নিজেকে আসীন করে, নারীর চোখ দিয়ে দেখতে পারলে পুরুষরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে জীবনটাকে নারীদের কিভাবে দেখতে হয় নিশ্চয়ই বুঝবে পুরুষরা, মানুষ বলে কথা!

লেখক পরিচিতি: জেন্ডার ট্রেইনার
প্রাক্তন শিক্ষার্থী,
উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.5K
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares

লেখাটি ৩,২৭৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.