আমাদের পুরুষের মন:স্তত্ত্ব এবং তার মুক্তির উপায়

0

শেখ তাসলিমা মুন:

#MeToo হ্যাশট্যাগ সহমর্মিতা উইক যাচ্ছে এখন বিশ্বজুড়ে। হলিউডের নামকরা অভিনেত্রী থেকে শুরু করে সারাবিশ্বের মিলিয়ন্স অব উইমেন তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা এই হ্যাশট্যাগে শেয়ার করেছেন। অভূতপূর্ব সাড়ায় ভেসে গেছে নারীর এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা। এমনকি সুইডেনের ফরেন মিনিস্টার মারগোত ভালস্ট্রোম ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে কর্মরত অবস্থায় তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।

ভাবতে অবাক লাগে যে, এতো উচ্চ লেভেলেও এমন ঘটনা ঘটে। কিছু বিষয় আমাদের আলাদা রাখতে হবে। দুজন এডাল্ট মানুষের একজনকে আরেকজনের পছন্দ হতে পারে। সেটি সে প্রকাশ করতে পারে। অন্যজনের আগ্রহ না থাকলে সেটি সে ব্যক্ত করতে পারে সহজ মনে। এটিকে সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট বলে না। বরং দুজন মানুষের ভেতর পছন্দ হবার কারণ এবং তার প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক। এটি না হলে মনে হয় একটি সম্পর্কও শুরু হবে না। কিন্তু সেটি হতে হবে সাবলীল ট্রান্সপারেন্ট উপায়ে।

সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট আলাদা। সুইডেনের ফরেন মিনিস্টার যেমনটি বলছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে এক মিটিঙে তাঁর পুরুষ কলিগ টেবিলের নিচে কয়েকবার তাঁর পায়ের উপর চাপ দিতে থাকে। প্রথম তিনি মনে করেন হয়তো ভুল করে পা লেগে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের ভেতর বুঝতে পারে এটি সে ইচ্ছে করে করছে। এটি একটি ডার্টি আচরণ। ওই লেভেলে এটি যদি হতে পারে, তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে?

আমাদের সমাজ তো আসলে একটি কারাগার। যেখানে নারী বা পুরুষের সেক্সুয়াল জীবন এক জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নয়। সেক্সকে তারা একটি ভয়ানক অপরাধ হিসেবে জেনে বড় হতে থাকে। সমাজ তাদেরকে এমনভাবে বড় করে তোলে সেখানে তারা জীবনের শুরুতেই অপরাধপ্রবণ হয়ে বড় হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর এমন কোন নারী পুরুষ নাই যারা বয়োসন্ধিক্ষণে শরীরে পরিবর্তন অনুভব করে না। এটি একটি স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল প্রসেস। কিন্তু আমাদের দেশের মতো কিছু এলাকার ছেলেমেয়েরা এটিকে ভয়াবহ জেনে বড় হয়। তাদের জীবনে এ পরিবর্তন আসে অভিশাপ হিসেবে।

কোন সঠিক ব্যখ্যা, সঠিক তথ্য, সঠিক এডুকেশনের পরিবর্তে এটিকে পাপ ও অন্যায় হিসেবে জানতে শেখে। মেয়েদের তো রীতিমতো অসূর্যস্পর্শা হিসেবে তৈরি করার সকল প্রচেষ্টা চলে। এবং তাদেরকে সেক্স বিষয়ে এমনভাবে ভয় ভীতি পাপ অপরাধের ব্যাখ্যা দিয়ে বড় করে তোলা হয় যে সারাজীবনে তারা এ বিষয়ে কোন সহজ জীবন যাপন করতে সক্ষম হয় না। আর এর মাঝে তাদের জীবনে যা ঘটতে থাকে সেগুলোতো সারাজীবনের নাইট্মেয়ার।

বলছিলাম আমাদের ছেলেদের মনন। আমাদের ছেলেদের মন:স্তত্ব। তারা আজ এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন শর্টকাট পদ্ধতি আর নেই।
সেক্সুয়াল আচরণকে সাপ্রেসড রাখার প্রতিক্রিয়া যা হয়, সেটি হলো সেক্সবিকৃতি। যে আচরণটি একটি ন্যাচারাল আচরণ তাকে যেভাবে পাপাবিদ্ধ করে রাখা হয় তাতে তারা আচরণটি করতে থাকে পর্যাপ্ত অন্যায় এবং অপরাধ আচরণ হিসেবে নিয়েই। যার ফলশ্রুতিতে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজে তারা যেখানে যেভাবে যেটুকুন সুযোগ পায়, তা চরিতার্থ করতে চায় অন্যায় পথে। যেমন কাজের মেয়ের প্রতি চড়াও হওয়া। পুকুরঘাটে একটি মেয়েকে একা পেয়ে চড়াও হওয়া। ছাদে কোন একা মেয়ের জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। স্কুলে যাওয়া মেয়ের পিছু নেওয়া। পুকুরের পাড়ে ঘাপটি মেরে থেকে মেয়েদের উত্যক্ত করতে থাকা। এরকম হাজার পথে।

জীবনের যে সময়টিতে তাদের সেক্সুয়াল ডিজায়ার থাকে সব চেয়ে বেশি তখন তাদের এভাবেই নিজের শরীর নিয়ে, সেক্সুয়াল আচরণ নিয়ে ভুগতে হয়। আমি এমনও শুনেছি, প্রতিবেশীর বাড়ির গাছে উঠে বসে থাকে স্নানঘরের নারীর স্নান দেখবে বলে। কী মর্মান্তিক বিষয়। অনেক ছেলে আছে সারা জীবনে একটি পূর্ণাঙ্গ নারী শরীর দেখেনি। হয় পর্নোগ্রাফি ছবি দেখে তাদের জানতে হয়। নতুবা এভাবে স্নান ঘরের ছিদ্রতে চোখ রেখে। অনেক তরুণ ছেলে অল্প বয়সে সস্তা ব্রোথেলে গিয়ে সিফিলিস গনোরিয়া বাঁধিয়ে বসে থাকে। সেক্স কি না জেনে না বুঝেই সেক্সুয়াল ডিজিজের লামিক হয়ে বসে থাকে। এই ছেলেরা যখন পূর্ণবয়স্ক হয়ে অবশেষে বিয়ে করার যোগ্যতা অর্জন করে, বেশিভাগ ক্ষেত্রেই সুস্থ সেক্সুয়াল আচরণ থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়ে। সেক্সুয়াল জীবনে অপারগ হয়ে পড়ে। চরম অসুখী জীবনযাপন করে পুনরায় কিশোর জীবনের সেই অপরাধ প্রবণ সেক্সুয়াল আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা শুধু নিজের জীবন অসুস্থ করে তোলে না, এমনকি চারপাশের অনেক জীবনও।

মধ্যপ্রাচ্যের ছেলেদের কিছু ঘটনা শুনে আমি বজ্রাহত হয়ে বসে থেকেছি। মধ্যপ্রাচ্যে এখনও মেয়েদের ‘সতীচ্ছেদ’ একটি বড় বিষয়। সেজন্য বিয়ের আগে ছেলেরা মেয়েদের পায়ুপথে সম্পর্ক করে। যাতে তার সতীত্ব ইন্ট্যাক্ট থাকে। এরপর যা হয়, সে ছেলে যখন বিয়ের মাধ্যমে নারীর সান্নিধ্যে আসে সে যোনিপথে সম্পর্ক স্থাপন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তখন তাদের আরেক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয় স্বাভাবিক সেক্সুয়াল জীবনে আসতে। এ লোমহর্ষক আচরণ শুনে হতবাক হয়ে বসে থেকেছি আমি। কী ভয়ানক সে মেয়েটির জীবন? কী ভয়ঙ্কর সে ছেলের জীবন? কত ভয়ঙ্কর?

সংক্ষেপে বলতে গেলে দাঁড়ায় যেখানে একটি সমাজ একটি কিশোরকে অপরাধী করে গড়ে তোলে তাদের অসুস্থ ব্যবস্থা দিয়ে। তার কাছে আমরা কী প্রত্যাশা করবো? এ বিষয়গুলো বিষয়ে স্বচ্ছ হতে গেলে সমাজের কাঠামোকে আগে স্বচ্ছ করতে হবে। সৎ হতে হবে। নিজেদের আগে ছেলেমেয়েদের সাথে আচরণ ঠিক করতে হবে। শঠতা ত্যাগ করতে হবে, অসৎ আচরণ থেকে মুক্ত হতে হবে। যে বাবা নিজে সৎ নয়, যে কিশোর দেখে তার বাবা রাতের অন্ধকারে ঘরের গৃহকর্মীর ঘরে ঢুকছে, দিনের পর দিন তার মাকে নির্যাতন করছে, চারপাশের মেয়েদের সাথে অসদাচরণ করছে, তার বাবা ব্রোথেল থেকে এসে রাতে মাকে পেটাচ্ছে, সে কিশোর কী শিখে বড় হচ্ছে?

যে সমাজে একটি স্কুল থেকে জানে এ বিষয়ে কথা বলা নির্লজ্জতা, যে সমাজের মাদ্রাসা থেকে হুজুরের দল মাইক দিয়ে নারীর শরীরের পাপ বর্ণনা ঘৃণ্যভাবে বয়ান করতে থাকে বীভৎস ভাষায়, যে দেশের স্বাস্থ্যবিভাগের নেই কোনো স্বচ্ছ ট্রান্সপারেন্ট প্রকল্প। সবখানের নিষিদ্ধতার লোবান, সেখানে একজন কিশোর কীভাবে সৎ হিসেবে বড় হয়ে উঠবে?

একজন মানুষের সুস্থ সেক্স জীবন না থাকলে সে জীবনের সর্বস্তরে অসুস্থ আচরণ করে চলবে। এরা সমাজে শুধু অসৎ নয় হিংস্র হয়। এরা অপরাধপ্রবণ হয়। এরা কোনো কাজ আর অপরাধের পথে ছাড়া করতে পারে না। অপরাধ প্রবণ না হয়ে তারা যৌনজীবন ভাবতে পর্যন্ত পারে না। অপরাধপ্রবণ না হয়ে সহিংসতা না করে, জোর না করে তারা যৌন আনন্দ ভাবতে পারে না। তাদের মননের ভেতর এভাবে অপরাধ বাসা বেঁধে যায়। ধর্ষকামী হয়ে ওঠে এভাবে তারা। তারপরও যদি তারা সুখী হতো! তৃপ্ত হতো! না সুখ এবং তৃপ্তি তাদের অধরা থেকে যায় সারাজীবন। এ অতৃপ্ত বঞ্চনার জীবনের হিংস্রতা দিয়ে তারা তাদের চারপাশে ভরিয়ে রাখে।

একজন কর্তব্যরত পুলিশ যদি তার নিজের জীবনে সুখী না হয়, সে নিজে যদি অপরাধ প্রবণ হয়, সে কীভাবে একজন অপরাধীর অপরাধকে ফেইস করবে? বিষয়টি সকল জায়গায়। পরিবারের ঐ পিতাই কোন অফিসের বড় বস, উকিল, জজ। রাজনীতিক? ওহ! একেকটি নির্বাচনী এলাকায় এমপিরা ক্ষমতা পেয়ে প্রচুর দুর্নীতি করে টাকাই ইনকাম করে তাই না! তারা যা করে সেটি হলো যৌন অপরাধ। এলাকার দরিদ্র কারো সুন্দরী বউয়ের উপর নজর দেয়। টাকা ঢেলে সে পরিবারকে তছনছ করে দেয়। এরপর চলে আরেক পরিবার। এমনকি দরিদ্র পরিবার থেকে মেয়ে তুলে নিয়ে আসার ঘটনা ঘটে। ক্ষমতাবানদের অপরাধে যৌন আচরণ বলে শেষ করা যাবে না।

ইউরোপে #Metoo হ্যাশট্যাগের পর ছেলেরা #IHAVE হ্যাশট্যাগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তাদের জীবনে যদি কোনো একটি দিনও কোন মেয়ের উপর অসদাচরণ করে থাকে সেটির স্বীকারোক্তি হিসেবে এ প্রচারণা করছে তারা। যাতে করে অনেক ছেলেরা এগিয়ে আসতে পারে। অনেকে হয়তো এ আচরণ করে অপরাধে ভুগছে। কিন্তু বলতে পারছে না। তাদের জন্য এ ক্যাম্পেইনটি অত্যন্ত একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এটি তাদের থেরাপির মতো কাজ করবে। এটি তাদের মুক্ত হবার জন্য একটি অমোঘ সুযোগ। তারা সেটি গ্রহণ করছে। এতে তাদের সামনে মুভ করার পথ অনেক সুগম হবে। গ্লানিমুক্ত হবে। অন্যায়কে স্বীকার করার মহৎ একটি সুযোগ পাবে। একটি সুন্দর শুরু পাবে জীবনের। সৎ এবং স্বচ্ছ জীবনের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ তারা হেলা করবে না। করছে না।

এ পর্যায়ে আমাদের দেশের ছেলেরা আসতে পারবে এমন প্রত্যাশা করা সহজ কি? না। আর সেজন্য আবারও আমাদের সমাজের স্ট্রাকচারকেই দায়ী করবে। যে সমাজে সততার চর্চা কোনদিন হয়নি, কোনদিন সততার জন্য পুরস্কৃত করা হয়নি কাউকে, বরং তাকে সাফার করানো হয় সততার জন্য! কপটতা ভান ভণ্ডামি যেখানে জীবনযাপনের থেকে শুরু করে সারভাইভের প্রধান শর্ত, ক্রাইটেরিয়া সেখানে একটি ছেলেকে অপরাধ স্বীকার করার আহবান জানাতে আমি পারি, কিন্তু সে সমাজ তাকে কতটা সুযোগ করে দেবে? তার মহানুভবতা নিয়ে বাঁচার সুযোগ কতটা দেবে? হিংস্র একটি সমাজ তার সততার মূল্য দেবে কি? বরং তাকে বাধ্য করবে অন্যায় নিয়ে বাঁচতে, বাধ্য করবে অন্যায় করতে। একবার নয় বহুবার। সে মুখ লুকিয়ে ফেলবে ঐ কদাকার অরণ্যে। কাঁধ ঝাড়া দিয়ে চলে যাবে। গলা উঁচু করে কথা বলবে আরও বেশি। যেখানে অন্যায় করে স্বীকার না করলেই সব সমাধান সেখানে যত অন্যায় তত বড়গলা!

এ বিশাল কাজ যেখানে শুরু হবারই কোন পূর্বাভাস নেই। যেখানে ১% সচেতন শিক্ষিত মননশীল যুবকও কপাল এগিয়ে দেবে না সিঁদুর নেবার, সেখানে ১৫ আনা সাধারণ ‘ভিক্টিম’ ছেলেদের আমি কী বলবো?
ফলে মেয়েদেরই তারা প্রতিমুহূর্তে ধাওয়া করে চলবে। আমাদের মেয়েরা? তারা তো চিরকালের ওই নরপশু ‘ভিক্টিমের’ ‘ভিক্টিম’!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 218
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    221
    Shares

লেখাটি ৭৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.