পুরুষরা বলুন তো জোর গলায়, ‘আমি যৌন নিপীড়ক নই’

0

সালমা লুনা:

#MeToo। মানে আমিও। মানে হচ্ছে একজন নারী বলবে, সে এডমিট করবে যে, সে জীবনে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছে কিনা কখনো। কদিন ধরেই নিজের বন্ধু সার্কেলে দেখছি বলছে তারা – #Metoo। সাথে কারো কারো জীবনের সেই কালো কাহিনীটুকু থাকছে। কারো বা বলার ইচ্ছা বা সাহস নাই পাবলিকলি বলার।
তাই শুধুই মি-টু।
এ তো কোন নিজেকে জাহির করার বিষয় নয়। এ কোন প্রচার বা পাবলিসিটি নয়। হলে এই ফেসবুক মি-টু তে ভরে উঠতো। নানা কায়দা নানান কাহিনীতে সয়লাব হতো।

নাহ্। তেমন কিছু হয়নি।
এ যে বড় দুঃখের, একলা ভার বহনের, নিজেকে লুকিয়ে চেপে … একেবার এই এত্তটুকু করে রাখার মতো বড় করুণ বিষয়।
তবুও অনেকে বলে ফেলছেন। লিখে জানাচ্ছেন । শ’য়ে শ’য়ে মানুষ পড়ছে জানছে সেই ভয়াবহ ভয়ানক কাহিনী। একজন নারী হয়ে সেসব পড়ে একমুহুর্তের জন্যও মনে হয়নি এসব ঠিক বলার মতো কোন বিষয় নয়। জনসমক্ষে বলার মতো কিছু নয়। বললে এটি ওই নারীর লজ্জা।
নাহ্, এরকম আমি ভাবতে পারিনা।

আমি বরং ভাবি একটি পুরুষও যেন বাদ না থাকে এই লেখাগুলো পড়তে। একটি পুরুষও যেন জানতে অনিচ্ছুক না হয় তারই মতো দেখতে অবিকল তারই মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ওয়ালা আরেকটি পুরুষ শুধুমাত্র একটুখানি আড়াল মুহুর্তের সুযোগ আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার এক লজ্জাষ্কর ব্যর্থতায় কতটা পশু হয়ে যেতে পারে! তখন তাকে দেখতে ঠিক কেমন লাগে, তা ওই মি-টু বলতে পারা নারীটির বয়ানে সে জানুক।
জানুক নারীর কেমন কষ্ট হয়, কীভাবে বিশ্বাস হারায় পুরুষের প্রতি। আর ওইরকম আচরণ করা পুরুষটির প্রতি কী তীব্র ঘৃণার হলাহল নিয়ে সে বেঁচে থাকে বাকি জীবন। নিজেকে ওই পুরুষের জায়গায় দাঁড় করিয়ে শপথ নিক যে ওই ঘৃণা সয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব না বলেই সে কখনো ওই পুরুষটি হবে না। সে কখনো ভবিষ্যত নিপীড়ক হবে না। কোনভাবেই না।
মি-টু স্বীকারোক্তিটি কেবল তাহলেই যথার্থ মর্যাদা পাবে।

সুইডেনের পুরুষরা সম্ভবত এই অনুশোচনা থেকেই প্রেরণা পেয়েছে নিজেদের স্বীকারোক্তি দেয়ার। তারা শুরু করেছে #Ihave দিয়ে। অর্থাৎ আমার আছে এই যৌন নিপীড়ন করার অভিজ্ঞতা, অথবা দায়। এসম্পর্কে কি আমাদের পুরুষরা এগিয়ে আসবে তাদের অভিজ্ঞতা জানাতে?
মনে হয়, না।
কেননা আমাদের পুরুষরা মনে করে, তারা এমন নয়। সবাই সমান নয়। সবাই সমান নয় এও সত্যি।
তবে আরো একটি খবর আছে এ সম্পর্কিত। আমাদের ঢাকা শহর পৃথিবীর যে কটি দেশে নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন ঘটে তাদের মধ্যে চতুর্থ হয়েছে।
এটি কোন আনন্দসংবাদ নয়। নয় নারীর ত্রুটি। এ ত্রুটি তাদের, যারা এই নিপীড়ন করে থাকে।
এই নিপীড়ন তবে কারা করে?

যৌন নিপীড়ন বলতে কী বোঝায় এটি অনেক পুরুষই বোঝেন বলে মনে হয় না। এমনকি নারীরাও বোঝেন না। অনেকের কাছে শুধু ধর্ষণই যৌন নিপীড়ন। অনেকের কাছে চিপায় টেনে নেয়া বা ধর্ষণ করার ইচ্ছা যৌন নিপীড়ন।
আইনে নাকি বলা আছে, অসত্‍ উদ্দেশ্যে নারীর যে-কোনো অঙ্গ স্পর্শ করাই যৌন নিপীড়ন৷ এমনকি নারীর পোশাক ধরে টান দেয়া, ধাক্কা দেয়া এগুলোও যৌন নিপীড়ন৷

যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে আসলে এইটুকু যথেষ্ট নয়। আরো বিস্তৃত হতে হবে ভাবনা। বাসের কর্মজীবী গৃহমুখী নারীর কানের কাছে এসে ‘রেট কত’ জিজ্ঞেস করা থেকে শুরু করে ইনবক্সে নিজের উদোম লোমশ বুকের ছবি বা গোপনাঙ্গের ছবি পাঠিয়ে বন্ধুত্ব করতে চাওয়াও যৌন নিপীড়ন। রিক্সার পেছন পেছন ধাওয়া করে এসে খ ম গালি দিয়ে যাওয়াও যৌন নিপীড়ন।
অধঃস্তন নারী কর্মকর্তাকে যখন বড়কর্তা একান্তে ডিনারের অফার সহযোগে চোখ টিপে সোনারগাঁও এ স্পেশাল রুম বুক করা আছে বলে খবর দেন, কিংবা শাড়িতেই তোমাকে হট লাগে বলেন তখন সেটিও যৌন নিপীড়ন। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে তো বলতেই হয় এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে, নইলে যৌন নিপীড়নের এই রমরমা যুগে আমাদের ফার্স্ট হবার কথা !

আর এই যৌন নিপীড়ন করে থাকে কারা? এই প্রশ্নের উত্তর জানাই আছে। মুখ ফুটে সেকথা বলতে গেলেই সেই গৎবাঁধা কথা চলে আসে, সব পুরুষ এক না।

আপনি কি কখনোই কোন নারীকে এইধরনের কোনরকম উক্তি করেননি? আপনি কি কোনদিন কোন সহপাঠীকে নিয়ে- তার শরীর নিয়ে বলেননি কিছু? গল্পচ্ছলেও কখনো আদি রসাত্মক ইঙ্গিত করেননি সহকর্মী বা কোন নারী আত্মীয়ার সাথে? এমন কোন সময় কি হয়নি আপনার খর চোখের তীব্রতা সইতে না পেরে কোন কিশোরী বারবার বুকে উড়না টেনেছে? যে নারী বন্ধু ভেবে আপনাকে সময় দিয়েছে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে নিয়ে যৌনতায় ভরা অশ্লীল গল্প ফাঁদেননি বন্ধুদের সাথে নিরালায় বসে? ভিড়ের সুযোগে আঙ্গুল ছুঁইয়ে দেননি কোন মেয়ের বুকে? চোখ টিপে জিভ বের করে অশ্লীল ভঙ্গিমা করেননি? কিংবা রাগ হয়ে গালি দেননি তার সাথে যৌনক্রিয়া করতে চান বলে?

এইরকম পুরুষের একটিও যদি আপনি না হয়ে থাকেন তবে আপনি নমস্য। তবেই আপনি জোর গলায় বলতে পারেন আপনি এরকম যৌন নিপীড়নকারী পুরুষ নন। আপনার মতো এরকম যদি আরো অনেকেই, বেশিরভাগ পুরুষই হতো, তবে ওই তালিকায় বাংলাদেশের ঢাকা চতুর্থ না হয়ে ওই তালিকায় নামই হয়তো থাকতো না তার।

কাজেই গলা ফাটিয়ে কি বোর্ড কাঁপিয়ে #IHAVE লিখে নয়, নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ওইসব পুরুষের সাথে তুলনা করে তবেই বলুন, সব পুরুষ এক নয়। বলুন জোর গলায়, আমি কখনো কোনদিন কোনরকম যৌন নিপীড়ন করিনি কাউকেই।
এই দেশটা সেদিন নারীর জন্য প্রকৃতই নিরাপদ হবে। আর কোন পুরুষকেই বলতে হবে, না, সব পুরুষ এক নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,০৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.