“আমিই সেই বিশাখার সন্তান বলছি”

0

সৌম্যজিৎ দত্ত:

চারিদিকে যে দিকেই তাকাই, পুরুষতন্ত্রের বিছানো জাল চোখের সামনে একটা করে উদাহরণ তুলে ধরে। সমাজ ও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। কেউ মুখ্য, কেউ গৌণ। কেউ পুরুষতন্ত্রকে বীরদর্পে বহন করছে তো কেউ পুরুষতন্ত্রে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়েছে যেন এটাই জীবন, এটাই নিয়ম, এটাই ধর্ম আর এটাই সমাজ। আবার কেউ বাধ্য হয়ে পুরুষতন্ত্রকে গলার মালা বানিয়ে ফেলেছে আর কিছু মানুষ আছে যারা চোখের সামনে সবটা দেখছে, বুঝতে পারছে, কিন্তু চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারছে না।

হ্যাঁ, আমরা প্রত্যেকেই এমনই এক পুরুষতন্ত্রের অংশ হয়ে উঠেছি। ন্যায়, অন্যায়ের জ্ঞান থাকার পরও আমরা প্রতিমুহূর্তে পরাজিত হচ্ছি, মাথা নত করছি এই পুরুষতন্ত্রের সামনে। আর এটাকেই জীবন ভেবে হাসছি, খেলছি, যাপন করে চলেছি নিয়মিত। পুরুষতন্ত্র কোনো ধর্ম নয়, পুরুষতন্ত্র কোনো মানবিকতা নয়, পুরুষতন্ত্র কখনোই মানুষের পরিচয় বহন করেনা। পুরুষতন্ত্র সমাজের সবথেকে উচ্চস্তরে থাকা একটা রোগ যা মানুষের শিরাতে, ধমনীতে রক্তের সাথে বাহিত হয়ে চলেছে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জর্জরিত বিশাখা (বাস্তব চরিত্রের নাম পাল্টে) নামের একটা মেয়ের গল্প বলি।

বিশাখা ছোট থেকে অনেক অনেক স্বপ্ন দেখতো, সে অনেক পড়াশোনা করবে, অনেক বড় হবে, কিছু করবে সমাজের মানুষের জন্য। পড়াশোনা করার অনেক চেষ্টা করে, কিন্তু দুর্বল মেধাশক্তি বিশাখাকে পরাজিত করে। মেট্রিক পরীক্ষাতে সে ফেল করে। ফেল করে ভেঙে পড়ে ও আবারও উঠে দাঁড়ানোর কথা ভাবে। মনের মধ্যে সমস্ত জোরকে একত্রিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হয়ে সে পরাজিত হয় দারিদ্রতার কাছে। মনের মধ্যে পড়াশোনা করার তীব্র ইচ্ছা থাকার সত্তেও তাকে তার বাবা এক ব্যবসায়ী ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিশাখা প্রতিবাদ জানিয়েছিল বিয়ে করবেনা বলে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ তার দরিদ্র বাবার সামনে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ছেলের সম্পর্কে ভালো খোঁজ, খবর না নিয়েই, শুধু ভালো রোজগার করে, ছেলে কর্মঠ এটুকু দেখেই বিশাখার বাবা বিশাখাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিশাখা বাধ্য হয় বিয়ে করতে।

এক শহুরে পরিবেশে পড়াশোনা নিয়ে ভাবা একটা ছোট মেয়ে বিয়ে করে আসে অনেক পিছিয়ে থাকা একটা গ্রামের অনেক বড় একটা পরিবারে বাড়ির প্রথম বউ হয়ে। শ্বশুর বাড়িতে সর্বমোট সদস্য সংখ্যা তখন একুশজন। বাড়ির রান্নার দায়িত্ব পড়ে রান্না করতে না জানা ছোট মেয়েটির ওপর। অতয়েব বিশাখার পড়াশোনার স্বপ্ন ওই রান্নার চুলায় জ্বালানি হয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়িতে বিশাখাকে অনেক দায়িত্ব সামলাতে হলেও শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি, ননদ, স্বামী ও ভাশুরদের বন্ধুর মতই সে পেয়েছিল। বিরূপ ছিল শুধু তার একমাত্র দেওর। দেওরের বলা কটূক্তিগুলো বিশাখাকে প্রতিদিন তীরবিদ্ধ করে। বাড়ির ছোট ছেলে হওয়ার জন্য শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য লোকেরা দেওরকে বোঝায় কিন্তু সেই বোঝানোটা কখনোই প্রতিবাদের আকার নেয়না। তাই দেওরের কটূক্তিও কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকে। এরপরও বিশাখা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একদিন বিশাখার স্বামী তীব্র প্রতিবাদটুকু জানিয়ে ওঠে তার ছোট ভাইয়ের করা অপমানগুলোর বিরুদ্ধে। বিশাখাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বিশাখা রাজি ছিলনা ওভাবে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে, কিন্তু স্বামীর আদেশে সে বাধ্য হয়।

তাদের একটা ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। বিশাখা আবারও স্বপ্ন দেখে যে সে যা কিছু করবে ভেবেও কখনো করতে পারেনি, পড়াশোনা করতে পারেনি, সমাজের জন্য কিছু করবে ভেবেও করতে পারেনি, সেইসব অপূর্ণ থেকে যাওয়া স্বপ্নগুলো পূরণ করবে তার ছেলে। পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর থেকে বিশাখার স্বামী পাল্টাতে শুরু করে। টাকার নেশায় ব্যবসায় মত্ত হয়ে যায়, বাইরে নানা মানুষের সাথে মিশে মদ খেতে শুরু করে, আরও অনেক অনেক নেশাতে ডুবে যায়। আস্তে আস্তে বিশাখার কর্মঠ স্বামী ব্যবসায় উন্নতি করতে শুরু করে। ব্যবসায় যত উন্নতি হতে থাকে, সে আরও বেশি উদ্ধত হতে থাকে। বিশাখার সাথে রোজ অশান্তি করে রাতে মদ্যপ অবস্থায় ঘরে ফিরে, বিশাখার গায়ে হাত তোলে। বিশাখা এরপরও ধৈর্য ধরে তার ছেলের কথা ভেবে। সে তার ছেলেকে অনেক পড়াশোনা করাবে, মানুষের মত মানুষ করে তুলবে। পুরুষতন্ত্রের সমস্ত রূপ ফুটে উঠতে শুরু করে বিশাখার স্বামীর মধ্যে থেকে।

চিন্তা-ভাবনাগুলো এমন যেন “আমি পুরুষ, আমি করতেই পারি। আমি পুরুষ তাই বাইরে যাকিছুই করিনা কেন, আমার বদনাম হবেনা। কিন্তু ও একটা মেয়ে হয়ে বাইরে মিশতে পারবেনা। একটা মেয়ে বাইরে পা রাখলেই সে বদনামি।” বিশাখার প্রাণ অস্থির হয়ে ওঠে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে। বিশাখা নিজের সমস্ত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। সে সবসময় চেষ্টা করে স্বামীকে বুঝিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য, শান্ত করার জন্য। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশাখা ঘরের মধ্যে কষ্টে জর্জরিত হয়ে পচতে থাকে, আর তার স্বামী বাইরে মদ খেয়ে আনন্দ করে।

বিশাখার স্বামী বাইরে মানুষকে অনেক সাহায্য করে। দরিদ্রকে অর্থদান করে, বাইরে সবার সাথে বন্ধুত্ব করে, মানুষসুলভ আচরণ করে। তার যত অত্যাচার শুধু ঘরে ফিরে আর বাড়ির মানুষগুলোকে বঞ্চিত করে। যদিও সেও তাদের ছেলেকে ভীষণ ভালবাসে, নিজের ছেলেকে কখনো সে কোনোকিছু থেকে বঞ্চিত করেনি। তাদের ছেলে কখনো মুখফুটে কিছু চাইনা। তাদের ছেলেকে বিলাসিতা কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। সে অনেক পড়াশোনা করে, মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে, অত্যাচারিত নারীদের কষ্টকে সে উপলব্ধি করতে পারে। বিশাখার অপূর্ণ পড়াশোনা করার ইচ্ছা সে তার ছেলের মধ্যেও জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল।

জীবনে হারতে হারতেও সে এই একটা দিকে জিততে পেরেছে। বিশাখার ছেলে আজ অনেক বড় হয়েছে, অনেক পড়াশোনা করছে, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে, আরও অনেক সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। আজ বিশাখার ছেলে স্বপ্ন দেখে এক অন্যরকম আদর্শের। সে পুরুষতন্ত্রকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চায়। মনের মধ্যে ভীষণ প্রেম, ভালবাসা নিয়ে সে বড় হয়েছে। কিন্তু এই এতকিছুর পরও বিশাখার ছেলে আজও একপ্রকার হীনমন্যতায় ভোগে, অশান্তি, চিৎকার, গালাগালি সহ্য করতে পারে না।

আজও বিশাখার স্বামী বাইরের জগতে ভীষণ ভালো একজন মানুষ ও বাড়ির পরিবেশে একজন প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ। বাড়ির এই পরিবেশে আজ বিশাখা অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে, কিন্তু অভ্যস্ত হতে পারেনি তার ছেলে। সে এই পুরুষতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেনা, কষ্ট পায়, সেও অশান্তিতে জর্জরিত হয়ে ওঠে। একসময় বিশাখার যেমন এমন অশান্তিতে দম বন্ধ হয়ে আসত, আজ তাদের ছেলের এই পরিবেশের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে। এমনই তীব্র অশান্তির মধ্যে থেকেও তাদের ছেলে মনের মধ্যে সমস্ত জোরকে একত্রিত করার চেষ্টা করে চলেছে অবিরাম। সে চেষ্টা করে চলেছে এই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।

লেখক পরিচিতি: Research in Finite Automata Geometry at Indian Statistical Institute, Blogger at আওয়াজ সত্যের পথে and লেখক at অমৃতপুর লিটল ম্যাগাজিন

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 609
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    609
    Shares

লেখাটি ২,৮৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.