গল্পে গল্পে জেন্ডার বা সামাজিক লিঙ্গ বুঝি (প্রাথমিক পাঠ)

0

ফেরদৌস আরা রুমী:

মুন্না – মুন্নি: সামাজিক লিঙ্গ

অবস্থা ১:
আমরা একটি গল্প শুনবো। গল্পটি হলো জমজ সন্তানদের নিয়ে। এক হাসপাতালে দুই জমজ শিশু জন্ম নিল। তাদের মধ্যে একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে। আমরা তাদের দেখতে হাসপাতালে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম তারা দুজনই দুটি টাওয়েল দিয়ে মোড়ানো, শুধু তাদের মুখটি দেখা যাচ্ছে। মুখ দেখে কি আমরা বুঝতে পারবো, কে ছেলে আর কে মেয়ে? না, বাইরে থেকে সেরকম কিছু চোখে পড়বে না যা থেকে তার লিঙ্গ বোঝা যাবে। ধরা যাক, একজন মুন্নি অপর জন মুন্না। কিন্তু কখন আমরা বুঝতে পারবো মুন্না একজন ছেলে, মুন্নি একজন মেয়ে? যখন তার বায়োলজিক্যাল পরিবর্তনগুলো চোখে পড়বে তখন আমরা বুঝতে পারবো। অর্থাৎ তারা যখন কৈশোরে পৌঁছাবে তখন তাদের চিহ্নিত করা যাবে।

অথচ বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। তাদেরকে চিহ্নিত করার জন্য আমাদের মোটেই এতোদিন অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের কাটিং, আচরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা তাদেরকে চিনতে পারবো। অনেকে মনে করেন, তাদের এই আচরণসমূহ সে প্রাকৃতিকভাবে পেয়েছে। যেহেতু খুব ছোটবেলা থেকে এটা বুঝতে পারা যায়। কিন্তু এই ধারণা আসলে ঠিক? এখনতা বোঝার জন্য পরবর্তী অবস্থা দেখবো।

অবস্থা ২:
মুন্না – মুন্নীর বয়স এখন তিন মাস। তারা দুজনই এখন ক্ষুধার্ত। এখন মুন্নী কি ক্ষুধার জ্বালায় কম চিৎকার করবে। অথবা মুন্নী কি তার ভাগের খাবার (দুধ) থেকে কিছুটা তার ভাইকে দিয়ে দিবে? না, সে তা করবে না।সুতরাং, কি থেকে আমরা বলছি যে, মেয়েরা প্রকৃতিগতভাবে ত্যাগ স্বীকার করে। শুধু তাই নয়, যখন তাদের বয়স যখন এক বছর তখনও তারা একইভাবে খাবার, খেলনা অথবা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য লড়াই করে যাবে। আমরা পরবর্তী অবস্থাগুলো বোঝার জন্য তদেরকে আরো পর্যবেক্ষণ করি।

অবস্থা ৩:
মুন্না – মুন্নী এখন তিন বছরে পা দিল। মুন্নাকে শার্ট – প্যান্ট এবং মুন্নীকে পড়ার জন্য ফ্রক দেওয়া হলো। দুই বছরের বচ্চা নিজের পোশাক নিজে পছন্দ করতে পারবে? আমরাই তাই ওদের পছন্দটা ঠিক করে দেই। আমরা ধরেই নেই যে, যেহেতু মুন্না ছেলে তাই শার্ট – প্যান্টএবং মুন্নী ফ্রক পছন্দ করবে। এই পছন্দ বা আকাংক্ষাটি কোথা থেকে এসেছে? এটা সমাজ থেকে এসেছে। এটা কখনও শিশুর সহজাত নয় বরং আমরা চাপিয়ে দিয়েছি। আমাদের সমাজ-পরিবেশই ঠিক করে দেয়, ছেলে -মেয়ে কে কি পড়বে, কী আচরণ করবে, কী খাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। যেহেতু মুন্নী ফ্রক পড়েছে, তাকে বলা হয় সুন্দরভাবে পা ঢেকে বস, লাফালাফি করো না, গাছে উঠ না ইত্যাদি। কারণ এগুলো করলে তোমার আন্ডারপ্যান্ট দেখা যাবে।

এখানেই শেষ নয় তাকে আরো বলা হবে, চিৎকার করবে না, জোরে হাসবে না, এটা করবে না, সেটা করবে না, একা একা কোথাও যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। মোট কথা নিষেধের তালিকা তার কখনও শেষ হবে না। এই সামাজিক প্রভাবকে বলা হয় সামাজিক লিঙ্গ, যা একেবারে সমাজের তৈরি। একারণে এই বিষয়ের সাথে তাদের এক/দুই বছর বয়স থেকে পরিচিতি ঘটে এবং সেইমত তারা আচরণ করে। পরবর্তীতে যখন তাদের বায়োলজিক্যাল রূপ প্রকাশ পায় তখন তারা নিজেদের অবস্থা/রূপ সম্পর্কে আরো ভালভাবে বুঝতে শেখে। শিশুদের বেড়ে ওঠার সময় থেকে সামাজিক লিঙ্গ এবং এর ভূমিকা তাদের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং সেই অনুযায়ি তারা আচরণ করে। আসুন আমরা এখন পরবর্র্তী অবস্থা দেখি।

অবস্থা ৪:
এই জমজ ভাই-বোনের বয়স এখন ছয় বছর। ছয় বছরেপা দেওয়ায় জন্মদিনের উৎসবে আমরা আমন্ত্রিত হই। তাদের জন্য উপহার কিনতে খেলনার দোকানে গেলে দোকানদার প্রথমে আমাদের কি জিজ্ঞেস করবে? আমাদের বাজেট কত? না, সে জানতে চাইবে ছেলে না মেয়ে? ছেলের কথা বললে সে আমাদের খেলনা গাড়ি, ব্যাট, বল, এরোপ্লেন, বন্দুক, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি দিতে চাইবে। অন্যদিকে মেয়ে বাচ্চা শুনে সে আমাদের পুতুল, খেলনা হাড়ি-পাতিল, সেলাইয়ের জিনিস-পত্র, চুলের ক্লিপ, খেলনা প্রসাধন সামগ্রি, সুন্দর চিরুনী ইত্যাদি দেখাবে। এদিকে আমরা কি করবো- মুন্নার জন্য ব্যাট বল এবং মুন্নীর জন্য পুতুল এবং খেলনা হাড়ি-পাতিল কিনব। এই উপহারসমূহ কি তাদের মধ্যে কোন বিভক্তি তৈরি করছে না?

অবস্থা ৫:
মুন্না ব্যাট বল পেয়ে মনের আনন্দে খেলতে থাকে। কোথায় সে খেলতে যায়? বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে সে ইচ্ছামত খেলাধুলা করে। তার মানে দেখা গেল, সে বাসা থেকে বের হওয়ার সে সুযোগ পেল, কিভাবে রাস্তা পার হতে হয় জানতে পারল, সে তার সমবয়সীদের সাথে কিভাবে মিশতে হয় কিংবা কোন কিছু হলে কিভাবে মিমাংশা করতে হয় এই বয়সেই শিখে গেল। শুধু তাই নয়, মুক্ত বাতাসে মিশে এবং খেলাধুলা করে তার শারিরীক গঠন-কাঠামো উন্নত হলো। এবং নিজের বয়সী ছাড়াও সে তার চেয়ে বেশি বয়সীদের সাথে যেকোন কিছু কিভাবে মিটাতে হয় তা সে এই বয়সেই জেনে গেল। বাইরের পরিবেশে ছোটবেলা থেকে মেশার কারণে সে যেকোন কিছুর সাথে খাপ খাওয়ানো, কোন কিছু সঠিকভাবে পরিচালনা করা ইত্যাদি সে এই বয়সেই শিখে ফেলে। সে বড় হতে হতে তার বাবা-মায়ের জন্য আয় রোজগার করতে হবে এটিও সে ছোটবেলা জেনে যায়। বাবা-মাও তাকে বাইরের কাজ করানো বা কোন দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আস্থা পায় এবং ধীরে ধীরে তাকে বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে তাকে উৎসাহ দেয়-যা তার মনোবল বাড়াতে সহায়তা করে।

অন্যদিকে, মুন্নী তার সেই পুুতুল আর কিচেন সেট নিয়ে ব্যস্ত। কোথায় সে খেলাধুলা করছে? বাসার ভেতরে রান্না ঘরে অথবা বসার ঘরের কোণে সেই সময় কাটায়। খেলার সময় আমরা তার কাছে কি জানতে চাই, তোমার বাবুকে খাওয়াও, আদর কর, ঘুম পাড়িয়ে দাও, আজ কি রান্না করেছ, তোমার বাবু কি খেতে পছন্দ করে ইত্যাদি ইত্যাদি। মুন্না ঘরে ঢুকে দেয়ালে জোরে জোরে বাড়ি দেয়, হৈচৈ করে কিন্তু আমরা তাকে কিছু বলি না। কিন্তু যদি মুন্নি পুতুলটি নিয়ে আছাড় দেয় তাহলে সাথে সাথে আমরা চিৎকার করে উঠি, এভাবে বাড়ি দিও না, এটা করতে নেই এইসব।

তার মানে আমরা খুব ছোটবেলা থেকে তাকে মায়ের মতো আচরণ, স্ত্রীর মতো আচরণ শিখাতে থাকি এবং বড় হয়ে সে তারই বাস্তবায়ন করে থাকে। আমরা তার খেলার সময়, তার কৈশোরের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ না দিয়ে কিভাবে সে ভাল মা, ভালো স্ত্রী, ভালোভাবে সংসার পরিচালনা করতে পারে তার প্রশিক্ষণে বেশি মনোযোগি হয়ে উঠি। আমরা অনেকসময় মনে করি যে, নারীরা প্রকৃতিগতভাবে বেশি শান্ত/নম্র। কিন্তু এটা ঠিক নয়। নম্রতা/ভদ্রতা (যা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ভাল গুণ-উভয় থেকেই আশা করা যায়) সাধারণত আমরা নারীর কাছেই আশা করে থাকি। যার ফলে আমরা তাদের সেভাবে গড়ে তুলি। যদি একজন মেয়ে/ নারী রান্না-বান্না করতে বা বাচ্চা লালন পালন করতে না চায় তখন তাকে আমরা ভৎসনা করি, সংসার থেকে তাড়িয়ে দেই কিংবা অলক্ষী বলে চিহ্নিত করি। কখনও পাগল/জ্বীনের আছর আছে ইত্যাদি বলতে থাকি। কারণ মেয়ে হয়ে সংসার দেখবে না, বাচ্চা লালন- পালন করতে চাইবে না এটাতো অস্বাভাবিকতা।

অবস্থা ৬:
কিছুদিন যাওয়ার পর মুন্না-মুন্নীর তাদের খেলনা দিয়ে খেলতে খেলতে বিরক্তি ধরে গেল এবং তারা তাদের খেলনাগুলো বিনিময় করলো। মুন্নী ব্যাট-বল নিয়ে বাইরে খেলতে চলে গেল। আমাদের প্রতিক্রিয়া কি হবে তার প্রতি? ‘তুমি মেয়ে তুমি কেন ছেলেদের মত বাইরে খেলতে যাচ্চ? প্রতিবেশিরা কি বলবে? তুমি যে বাইরে যাচ্চ কেউ যদি তোমাকে ফলো করে বা উত্যক্ত করে তাহলে তুমি কি করবে? কেন তুমি ছেলেদের মত আচরণ করছো? অন্যদিকে মুন্না বাইরে না গিয়ে বাসায় মুন্নীর পুতুল নিয়ে খেলতে বসে গেল, আমাদের প্রতিক্রিয়া কি হবে তার প্রতি? ছি ছি! ও এটা খেলছে কেন? ও তো বড় হয়ে মেয়েদের মত মেয়েলী আচরণ করবে। বাবা-মাসহ বাড়ির বড়রা বলবেন, তাকে বড় করার সময় আমি কি ভুল করছিলাম যে, সে এখন এমন আচরণ করছে। অন্যরা বলবে তার অবশ্যই বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করা উচিত। সে যদি বইরে না যায় অথবা ছেলেদের মত আচরণ না করে তাহলে আমরা ভীষণ চিন্তিত হয়ে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ি আচরণ করার জন্য বাধ্য করবো। সে যদি তা না হয় তাহলে তাকে ছেলেদের মতো আচরণ করতে প্রয়োজনে শাস্তি পর্যন্ত আমরা তাকে দিব। যদিও আমাদের আশা আনুযায়ি আচরণ একেবারে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এবং এটা কোনভাবেই প্রকৃতিগত নয়। জেন্ডার সম্পর্কিত এই দৃষ্টিভঙ্গি বা আচরণ তাদের দুজনের জীবনে কি প্রভাব ফেলবে? চলুন পরবর্তী ধাপে আমরা তা দেখি।

অবস্থা ৭:
মুন্না-মুন্নীর বয়স এখন ২০ বছর। বাবা- মা এখন মুন্নীকে বিয়ে দিবেন। মুন্নী এরই মধ্যে শিখে গেছে কি করে রান্না-বান্না, কাপড় সেলাই, ঘর কন্নার কাজ করতে হয়? সে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের ওপর ডিগ্রিও নিয়েছে। তার বাবা তার বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার জন্য কিছু টাকাও সঞ্চয করেছেন। তারা মুন্নাকে বাড়ি এবং মুন্নীকে যৌতুক দিবেন। মুন্না হোটেল ম্যানেজমেন্ট এ উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে একটি ভাল হোটেলে শেফ হিসেবে চাকরি নিয়েছে। সে এখন বেশ সম্মানজনক বেতন পায়। অন্যদিকে মুন্নীর যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে সে হলো এবয় সে একটি টেইলারিং শপের বড় দর্জি হিসেবে চাকুরি করে। সেও ভালো টাকা রোজগার করে। যৌতুকের টাকা দিয়ে সেই তার নিজের একটি দোকানও নিয়েছে এবং নিজের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে এখন।

আমরা প্রায়শই বলি ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি ভালো রান্না করতে পারে। তাহলে কেন সব হোটেলের মালিক এবং শেফরা ছেলে হয়? অথবা যদি ছেলেরা তাদের নিজেদের পোশাক নিজেরা সেলাই পারে না বলি, তাহলে সব দোকানের দর্জি কিভাবে ছেলে হয়? তারা নাকি সেলাই করতে জানে না? তাহলে তারা কেন এই ক্ষেত্রগুলোতে মেয়েরা নেই। কারণ এর সাথে অর্থের একটা যোগ আছে। নারী প্রধানত রান্নাবান্না, কাপড় সেলাই এবং পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি নানাবিধ কাজ সে বিনা পারিশ্রামিকে করে। কিন্তু পুরুষরা একই কাজই তখন করে যখন তার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পায়। এবং যদি একজন নারী খুব ভাল রান্না করে বলে স্বীকৃতি পায়ও তবু তাকে কোন বড় হোটেলে কাজে নিবে না। যেখানে পুরুষরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে, নিজের সম্মানী বাড়ানোর জন্য দর কষাকষি কিভাবে করতে হয় তা শিখছে, বিপরীতে নারীরা স্বামী, ছেলের সেবায় নিজেদের যুক্ত রাখছে। কারণ এদের ওপরই তার বুড়া বয়সে নির্ভর করতে হবে। কারণ নারীর নিজের সম্পদের ওপর কোন অধিকার নেই।

জেন্ডারের ভূমিকাটি আমরা শিশুদের মধ্যে খুব ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, গণমাধ্যম, বাজার, আইন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় পলিসি, ধর্ম, ও সংস্কৃতি ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুদের মগজে আমাদের অজান্তেই ঢুকিয়ে দেই। এটা ঠিক যে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই প্রথা/সংস্কৃতির রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে আমারা যদি আজ থেকে আমাদের পরিবার, কর্মক্ষেত্র, বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে এই ধারা পরিবর্তনের জন্য চর্চা শুরু করি তাহলে নারী পুরুষের এই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসবে।

—গল্পটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 507
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    509
    Shares

লেখাটি ১,০৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.