অচেনা কর্কশ স্পর্শ যে এতো কদর্য হতে পারে!

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

নয়/দশ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে মার্কেটে ঘোরার সময় শরীরে আচমকা একটা অচেনা হাতের কর্কশ স্পর্শ টের পেয়ে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। পৃথিবীতে যে কোনো টাচ এতো কদর্য হতে পারে তা আমার আগে জানা ছিলো না।
একদিন কড়া রোদে স্কুল থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত ছিলাম। দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। তখন বোধহয় ক্লাশ এইট – নাইনে পড়ি।

বাড়িতে আমি, আমার বড় বোন আর হরহামেশা আসা-যাওয়া করে এমন একজন আত্মীয়। বড় বোন নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। হঠাৎ গভীর ঘুমের মধ্যে আমার গলার কাছে ভারী নিশ্বাস অনুভব করলাম। দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে, ঘামছি সমানে। দুই হাতে জোরে ঠেলে সরিয়ে মুক্ত হতে চেষ্টা করছি। এমন সময় বিকট আওয়াজে ফোনটা বেজে ওঠাতে জানি না কোথা থেকে এতো শক্তি পেলাম! এক ধাক্কায় ইতরটাকে ঠেলেফেলে দিয়ে ছুটে গেলাম ফোনের কাছে। অদ্ভুতভাবে ফোনের ওপাশ থেকে কেউ কথা বললো না। কে যে ফোন করেছিলো তা জানা হয়নি। কিন্তু সেই অজানা মানুষটিকে আমি আজো মনেমনে ধন্যবাদ জানাই। কাজ হয়েছিলো আমার শক্ত প্রতিরোধে, প্রতিবাদে। জঘন্য লোকটা ভয় পেয়েছিলো, জীবনে আর কোনোদিন সাহস পায়নি চোখ তুলে তাকাতে।

বিয়ের পর বরের সাথে বাণিজ্য মেলায় কিউতে দাঁড়িয়ে আছি। পেছনে বারবার কে যেন বাজেভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ঝট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি, এটা দীর্ঘকায় এক ভদ্রলোকের বেশধারী অসভ্যের কাজ। সরাসরি চার্জ করলাম। বোঝা গেল এই কুকর্মে সে সিদ্ধহস্ত কেননা ঘাবড়ে যাওয়া তো দূরের কথা উল্টো আমাকে সে যাচ্ছেতাই বলতে বলতে চোখের নিমেষে উধাও হয়ে গেল!

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে PABX এ কাজ করতাম। অশালীন, আজগুবি ফোনকল গায়ে মাখার সময় ছিল না। সেন্টার থেকে ইন্টারকমে যখন কেউ বজ্জাতি করার চেষ্টা করতো, আচ্ছামতো শাসাতে ভুল করিনি। দরজার নীচ দিয়ে কে যেন সাদা খাম ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যেতো। খাম খুলে দেখতাম, ইন্টারনেট থেকে প্রিন্ট করা একগাদা অশ্লীল ছবি । আমি আমার সুপারভাইজারকে দিয়েছিলাম খামটা। কোনো লজ্জা পাইনি।

একদিন খাম ঢোকার সাথে সাথে দরজা খুলে করিডোরে একজনকেই দেখেছিলাম। দ্রুতপায়ে সরে পড়েছিল। অতিশয় ভদ্র একজন রিসার্চার বলে সবাই চিনতো তাকে! এর কয়েকদিন পর এক শপিং মলে দেখি স্ত্রীকে পাশে, শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে সুখী পরিবার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

বলতে কোনো দ্বিধা নেই আমাকেও বহুবার মোকাবেলা করতে হয়েছে বিকৃতমস্তিষ্ক ABUSER পুরুষকে। আবার পুরুষ বন্ধু, সহকর্মীদের মধ্যে অনেক ভালো মানুষদের দেখাও পেয়েছি। প্রতিটি মেয়ে জানে জগতে তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি বনজঙ্গলের বাঘ- ভালুক নয়, কিছু লোলুপ পুরুষ। এই “কিছু” আসলে সংখ্যায় কত কেউ বলতে পারেন?
যারা এখনই “সব পুরুষ ধর্ষক নয়” বলে হৈ হৈ করে উঠতে চাচ্ছেন, তাদেরকে বলবো, “আপনি যদি Abuser না হন, ধর্ষক না হোন তাহলে আপনার তো জাত- মান ডোবার চিন্তা নেই! তাহলে আহাম্মকের মতো বারবার একথা না বলে বরং পারলে আপনিও প্রতিবাদের স্বর উঁচু করুন”!

আমার দুই কন্যাকে নিয়ে যখন কোনো পাবলিক প্লেসে হাঁটি, সামনে – পেছনে আমি আর ওদের বাবা থাকি আর মাঝে ওরা দুই বোন। তারপরেও ওদের শিখিয়েছি কোনো অবাঞ্ছিত স্পর্শ বুঝতে পারলে যেন এতোটুকু সংকোচ না করে চেঁচিয়ে জানান দেয়, “এই যে, এই লোকটা!” বেওয়ারিশ Abuser পুরুষের দেখা কেবল রাস্তাঘাটেই মেলে না, প্রেমিক নামের প্রতারকের মাঝেও মেলে। সংসারেও অধিকাংশ মেয়েরা এর শিকার, ভুক্তভোগী। বিয়ের পর একজন পুরুষ যখন নিজের পরিবারে তার সহযাত্রী নারীকে অপমানিত, অত্যাচারিত হতে দেখেও প্রতিবাদ তো দূরে থাক তার কষ্টটুকুও অনুধাবন করতে পারে না, পরিবারকে খুশি রাখতে পরের বাড়ি থেকে আসা মেয়েটিকে নির্যাতন করতে পিছুপা হয়না – অথচ রাত হলে সেই মেয়ের শরীরটাই তার পরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হয়ে ওঠে –

এমন লোকের সাথে একই বিছানায় ঘুমোতে কেমন গা ঘিনঘিন করে তা কেবল ওই মেয়েটিই জানে।
ব্যাংকে যখন কাজ করতাম, একদিন জরিপের কাগজ হাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে এলো। নারী হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী কী বাধার সম্মুখীন বা Abuse হতে হয়েছে এই সংক্রান্ত জরিপ। মনে আছে , আত্মবিশ্বাসের সাথে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলাম প্রশ্নের জবাবগুলো।

সত্যি বলতে কী, পথেঘাটে ছড়িয়ে থাকা এই “কিছু সংখ্যক (!)” Abuser পুরুষের কুৎসিত মন্তব্য বা নিকৃষ্ট কার্যক্রমকে আমি ময়লার মতো গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আবার পথ হেঁটেছি।
কারণ আমি নিজেকে জানি। জানি, কোনোমতেই এতে আমার কোনো দায়ভার ছিলো না, এই লজ্জা কোনভাবেই আমার হতে পারে না। এতে আমার কোনো অসম্মান হবে না।
এমন অসংখ্য ঘটনা আছে , যা মনে করে আমরা মেয়েরা এতোকাল বারবার অস্ফুটে উচ্চারণ করেছি আর এখন সমস্বরে স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারি –
“#MeToo”
হ্যাঁ, আমিও!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 956
  •  
  •  
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    961
    Shares

লেখাটি ৪,৫২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.