কেন আমার ঢাকায় পড়া হলো না

#MeToo
শেখ তাসলিমা মুন:

কেউ জানেনা আজও, কেন আমার ঢাকা পড়া হয়নি।
তখন ঢাকায় আমাদের নিজেদের কোন আবাস নেই। আত্মীয় স্বজনের বাসা। সব বাসায় যাওয়া যায় না। সে মুহূর্তে কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। আমার ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পরশু দিন আমার আজও ঢাকায় যাওয়া হয়নি। মা বাসায় নেই। বিদেশে তখন। ভাইও নেই। সে তার ইউনিভার্সিটিতে। এরশাদের আমল। হল বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়ই বন্ধ থাকে। নানান ঝামেলায় পরীক্ষার ডেট হঠাৎ হয়েছে। আমি পেপারে দেখেছি। কেউ আমাকে জানায়নি।

কীভাবে যাবো এতো তাড়াতাড়ি? সে টেনশনের বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। বারান্দায় খবরের কাগজটি হাতে নিয়ে সিঁড়ির উপর বসে আছি। রাস্তার দিকে চেয়ে আছি। আমাদের স্কুলের টিচার সম্পর্কে চাচা হোন ছাতা মাথায় দিয়ে যাচ্ছেন। দৌড়ে গিয়ে বললাম, স্যার, আমার সাথে ঢাকায় যাওয়ার কেউ নেই। পরীক্ষাও দেওয়া হবে না। ঢাকায় গিয়ে কোথায় থাকবো তাও জানি না। আমার পরীক্ষা দেওয়া হবে না স্যার। স্যার বললেন, তুই আমাকে আগে বলবি না? কিছু একটা ভাবলেন, বললেন রেডি হ, আমি আসছি। আমি অবাক। স্যার ধমক দিয়ে বললেন, রেডি হ। ব্যাগ গোছা।

স্যার পড়ন্ত বিকেলে এসে আমাকে নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা দিলেন। খুলনা গিয়ে নাইট টিকিট কিনলাম। স্যারের সাথে ঢাকা যাচ্ছি। ১৮ বছরের তরুণী ততদিনে অনেক কিছু জেনে গেছি। সারা রাস্তা লাঠির মতো সোজা হয়ে বসে আছি। স্যার বললেন, ঘুমা। আমি ঘুমুলাম না। বসে রইলাম।

স্যার বললেন, তোকে আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের বাসায় রেখে পরের বাসে চলে যাবো, আমার জরুরি মিটিং আছে। আমার চাচাতো ভাই, সে তোকে পরীক্ষা হল চিনিয়ে দেবে। সবকিছু করবে। পরীক্ষা শেষে টিকিট কেটে বাড়ি চলে আসতে পারবি না? আমি বললাম, অবশ্যই পারবো।

স্যারের চাচাতো ভাইয়ের ফ্ল্যাট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ভোরবেলায় পৌছুলাম তখনও তাঁদের বাসার গেটের তালা লাগানো। বাসাটি রোকেয়া হল থেকে বেশি দূরে নয়। আমি সারাদিন পড়বো, পরেরদিন সকালে আমার পরীক্ষা। সেদ্ধ আঁটার নরম রুটি আর ঘন দুধের সুজি দিয়ে নাশতা করতে না করতে সারা রাতের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম। এ বাড়িতে একজন নারী আছেন, একজন শিশু। কিন্তু তারা বেড়াতে গেছে। আসবে কাল। একটি রুমে খুব সম্ভব স্যারের ভাই ভদ্রলোক ভাড়া থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিনিস্ট্রেশনে কাজ করে।

হঠাত ঘুম ভেঙে গেল, কে যেন আমার ঘাড়ের কাছে জোরে জোরে চাপ দিচ্ছে। ঘুমের ঘোরে আমার মনে হচ্ছে ঘাড়ের কাছে একটি ব্যাঙ লাফাচ্ছে। আমি চিৎকার করে উঠে বসলাম। সেই ভাই বললেন, আমি তোমাকে ডাকছিলাম। আমি লজ্জিত হলাম। ভয় পাওয়ার কোন মানে ছিল না। উনি কিছুক্ষণের জন্য চলে গেলেন। আমার পরীক্ষা বিষয়ক তথ্য আনবেন বললেন। আসলেন একটু পরে। একজন মহিলা আসলেন রান্না করতে। দুপুরে ভাত খাওয়ার পর আমি আবার পড়তে বসেছি। বিকেলের মুখে উনি বললেন, চলো বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমি বললাম কাল পরীক্ষা। উনি বললেন, তোমার সিট ইত্যাদি বিষয়ে এখনও জানা হয়নি। চলো দেখে আসি কাল কোথায় তোমার পরীক্ষা হবে। আমি আড়ষ্ট অনুভব করছি। কিন্তু আমার নিজের পরীক্ষা। আমাকেই যেতে হবে। সামান্যই দূর। উনি রিকশা নিলেন। রিকশায় উঠেই উনি আমার দিকে জেঁকে আসলেন। আমার ভাঁজ করা দু পায়ের উপর হাত রাখলেন। আমি হাতদুটি ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিলাম। এবার সে খামচানো শুরু করলো।

– টেক ইট ইজি। এটা কোন বিষয় না। দুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তখন এগুলো খুবই সাধারণ ঘটনা।
আমি জোরে জোরে বলতে লাগলাম, আমি নেমে যাবো। এখুনি নেমে যাবো।
উনি ততক্ষণে পেছন দিক দিয়ে আমার ওড়নার নিচে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমি কঁকিয়ে উঠলাম। কেঁদে উঠলাম। জোরে জোরে বললাম, রিকশা থামান, রিকশা থামান।

কীভাবে যে সেদিন তাদের বাসায় প্রবেশ করে নিজের ব্যাগ নিয়ে ফুলবাড়িয়া পৌঁছেছিলাম সে এক ইতিহাস। খুলনার টিকিট কেনার পরও চার ঘণ্টা পরে বাস ছেড়েছিল। সে চার ঘণ্টা কিভাবে কেটেছিল স্টেডিয়াম মার্কেটে একটি মফস্বল থেকে আসা মেয়ের সে কাহিনী বিশাল।
ভোরে যখন খুলনা পৌঁছুলাম। তখন ঢাকা অনেক দূরে। সেদিন দশটায় আমার ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল আমাকে ছাড়াই।

শেয়ার করুন:
  • 567
  •  
  •  
  •  
  •  
    567
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.