সেদিনের কথা মনে হলে এখনও শিউড়ে উঠি

0

তনয়া দেওয়ান:

সময়টা ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস …. বিকাল ৫.৩০ এ অফিস শেষ করে আইইএলটিসের জন্য একটা স্পোকেনের ক্লাশ করতাম (স্থান: এক্সিকিউটিভ কেয়ার, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট)। ক্লাশ শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত সাড়ে আটটা হতো। চিটাগাং এর মতো বাণিজ্যিক রাজধানীতে রাত ১১/১২ টায় যেখানে লোকে লোকারণ্য থাকে, সেখানে রাত সাড়ে আটটা তেমন কিছুই না, তাই নির্ভয়ে ইস্পাহানি মোড় থেকে ২নং গেইটের বাসায় আসা-যাওয়া করতাম।

এভাবে একদিন ক্লাশ শেষ করে রিক্সা খুজঁতে খুজঁতে সামনে হাঁটছিলাম, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থাকায় কোন রিক্সাই যেতে চাচ্ছে না (মূলত রিক্সাওয়ালারা ডাবল ভাড়ার জন্য ভারী বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিল)। এর মধ্যেই খেয়াল করলাম, অপরিচিত একটা লোক বাইক নিয়ে খুব ধীরে ধীরে আমার সাথে সাথেই এগোচ্ছে (বাইকওয়ালার পরনে ছিল পায়জামা-পাঞ্জাবী আর মুখভর্তি দাড়ি, বয়স ৩৫ থেকে ৪০ এর মধ্যে হতে পারে, এক কথায় বলতে গেলে হুজুর টাইপ লোক)। বুঝতে পারার সাথে সাথেই ডাবল ভাড়া দিয়ে একটা রিকশায় উঠে পড়লাম।

জিইসি মোড় ক্রস করার পর আবারও বুঝতে পারলাম ওই বাইকওয়ালার উপস্থিতি, ফোন বেজে উঠার সাথে সাথেই ফোনের অপর প্রান্তের মানুষটাকে ঘটনা বলতে থাকলাম, ততক্ষণে জিইসি পেরিয়ে রিক্সা সানমার ওশান সিটির সামনে (মঙ্গলবার হওয়ায় সানমার ওশান সিটির মার্কেটও সেদিন বন্ধ)। অগত্যা বাইকওয়ালা আমার রিক্সার গতিরোধ করে দাঁড়ালো এবং প্রথমে আমার ওড়না, পরে আমার হাত ধরে টান দিতে দিতে বলতে লাগলো, “চাকমা মেয়ে না! তোদের জন্মই হইসে বেশ্যা মাগী হওয়ার জন্য।”

ততক্ষণে একহাতে মোবাইল আর অন্যহাতে সর্বশক্তি দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার করছি, পরে লোকটা না পারতে আমার হাঁটুর উপরে ধরে টান দিতেই নিজেকে বাঁচাতে জোরে দিলাম একটা লাথি।

জীবনের প্রথম আশ্চর্যটা সেদিন হলাম, আশেপাশে এতোগুলো মানুষ, তাও একজনও এগিয়ে এলো না, বরং নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখার মতো করে তাকিয়ে দেখছিলো। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা মানুষটা অবস্থা খারাপ বুঝতে পারার সাথে সাথেই লাইন না কেটে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোকটি দ্রুত বাইক টান দিয়ে চলে গেল। (যেতে যেতে বলতে থাকলো তোদের মতো চাকমা মেয়েদের বেশ্যা বানিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবো, দেখে নিবো… আরও কত ধরনের হুমকি ধমকি)

টমবয় টাইপ যে মেয়েটা স্কুল কলেজে মারামারি করতো, সেই আমিই সেদিনই জীবনের প্রথম উপলব্ধি করলাম ফিজিক্যাল এবিউজড কী জিনিস! সেদিনই প্রথম আমার অসহায়তা আর দুর্বলতার সাথে আবিষ্কার করলাম সমাজে অধিকাংশ মানুষের মুখোশধারী কিছু কাপুরুষের মুখ। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, সেদিন যদি আমি খুনও হতাম তাহলেও তারা বলতো, আমরা কিছুই দেখি নি!

এরপর আর কখনো ওই স্পোকেনের ক্লাশে যাওয়া না হলেও অন্তত কতদিন কত মাস যাবৎ যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছি তা একমাত্র আমিই জানি, আজও মনে পড়লে বুক কেঁপে ওঠে।

এখন কী বলবেন? বাঙালি মুসলিমরাই খারাপ? আমি বলবো, না। কারণ পরিস্থিতি খারাপ আঁচ করতে পেরে ফোনের লাইন না কেটে যে মানুষটি ঘটনাস্থলে এসেছিল, সেও একজন মুসলিম বাঙালি। ঘটনার পর যে বান্ধবীরা সদা সর্বদায় আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে আমার সাথে পাশে থেকেছে, ওরাও বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু। যে স্যাররা অফিসে আমার নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বত করেছিলেন, তারাও বাঙালি মুসলিম। আর যার কথা না বললে লেখাটা অপূর্ণ রয়ে যাবে, সে সুদূর ঢাকায় বসে আমাকে মানসিক সাপোর্ট দিয়ে সাহস জুগিয়েছে, প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যার অনুপ্রেরণা আমাকে পরবর্তীতে দৃঢ়তা দিয়েছে, সেও একজন বাঙালি মুসলিম। (বিশেষভাবে স্পষ্ট করে বলে রাখি, সেই সময় যারাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের কারো সাথেই আমার কোন প্রেমের সম্পর্ক ছিল না, তারা নিতান্তই বিবেকের টানে, মানবতার খাতিরে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল)

সত্যি বলতে কি, সব জাতিগোষ্ঠীর ভেতরেই কিছু আবাল উগ্রপন্থী আছে, যাদের কাজই হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়ানো। সেটা মুসলিম হোক, হিন্দু হোক আর বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান অথবা আস্তিক হোক আর নাস্তিক! #Metoo

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.2K
    Shares

লেখাটি ১২,৩৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.