তবু্ও শান্তি, তবুও অনন্ত জাগে!

1374232150Humayun Ahmed faceলুতফুন নাহার লতা (উইমেন চ্যাপ্টার): লন্ডনে মহা সমারোহে চলছে অলিম্পিকের আয়োজন! সারা পৃথিবী থেকে ক্রীড়ামোদীরা এসে ভরে গেছে এই শহর । তিল ধারণের ঠাঁই নেই এমন অবস্থা ! ২০ সে জুলাই সারাদিন কেটে গেল বাকিংহাম প্যালেসের সামনে, লন্ডনের ট্রাফেলগার স্কোয়ার , লন্ডন টাওয়ার আর লন্ডন ব্রিজের আশেপাশে ঘুরে । এবারের ইউরোপ যাত্রায় আমার ছেলে সিদ্ধার্থ আমার সঙ্গী ! তার লিস্ট অনুসারে অনেক কিছু দেখার ইচ্ছে থাকলেও এবার তা দেখা হল না বলে সে খুব মন খারাপ করলো !
কথা ছিল ফ্রাংকফুর্ট, বার্লিন হয়ে লন্ডনে এসে কয়েকটি দিন থাকবো, আর সে সব ঘুরে ঘুরে দেখবে ! কিন্তু এর মধ্যে থেকে তিন, চার দিনের জন্যে আবার নরওয়েতে যাবার প্ল্যান করায় সে টা আর হল না। আমারও খুব ইচ্ছে ছিল পিকাডিলি সার্কাসে একটি সন্ধ্যা কাটানোর ! লন্ডনে এলে সব সময় আমার প্রিয় হ্যারডস থেকে এক চক্কর না ঘুরে আসলে আমার মনেই হয় না, লন্ডনে এলাম ! মনের অতৃপ্তি মনে রেখে আর আমার দিকে কপাল কুচকে চোখ সরু করে তাকিয়ে পরদিন হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে সিদ্ধার্থ ফিরে গেল নিউইয়র্ক আর আমি চললাম দেশে!
সারাটি পথ মনে পড়লো কত কথা! কত বছর নাটক করিনি! অথচ চোখ বন্ধ করলেই আমার চোখের সামনে আজো তিনটি ক্যামেরার লালবাতি জ্বলে ওঠে ! ১৯৯৭ সালে বুক ভরা অভিমান নিয়ে স্বদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম! ১৯৯৬ তে নিজের জীবন বাজী রেখে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষার জন্য প্রতিবাদের দুর্গ গড়ে তুলেছিলাম! আমার অহংকার আমি নেমেছিলাম রাজপথে! আমার গৌরব আমি প্রতিবাদ করেছিলাম! আমার প্রাপ্তি, সেই ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা আজো এই দেশের মাটিতে নি:শ্বাস ফেলতে পারছেন! ওরা বেঁচে আছেন! কিন্তু আমি দেশের কাছে, সরকারের কাছে রইলাম মূল্যায়নহীন, বহুদূরের একজন অচেনা মানুষ! যে দেশ ও তার মানুষের জন্য আমার কত না হাহাকার! সেই প্রিয় স্বদেশের সীমানা ছেড়ে, দেশান্তরী হয়েছিলাম আমার পাঁচ বছরের একমাত্র সন্তান সিদ্ধার্থকে নিয়ে! পেছনে ফেলে গেলাম আমার জননী, জন্মভূমি। আমার রেডিও, আমার টেলিভিশন, আমার মঞ্চ, আর আমার সত্ত্বার শেকড়, আমার নাটক!!!
২২ জুলাই রোববার সকালে প্লেনের জানালা দিয়ে লাল রঙের মাটি দেখা গেলে আমার আত্মা বরাবরের মত হু হু করে কেঁদে উঠল! ঐ তো! ঐ তো আমার মাটি! আমার দেশের মাটি! প্লেন রানওয়ে স্পর্শ করল, আমি লন্ডন থেকে ঢাকায় পৌঁছুলাম! এয়ারপোর্টের ঝামেলা শেষ করে বের হবার সময় একজন অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম ‘আজ তো নিউইয়র্ক থেকে লেখক হুমায়ূন আহমেদের আসার কথা তাই না! উনি কি পৌঁছে গেছেন?’ জবাবে উনি যা বললেন তাহলো কিছু একটা সমস্যার জন্য আজ এসে পৌঁছুবেন না, তবে কাল সকালে উনি আসবেন!
দেশে যখনই যাই প্রতিবারের মত এবারেও এয়ারপোর্টে বিশেষ সম্মান, বিশেষ যত্নের এতোটুকু ব্যত্যয় হল না! আমাকে বসিয়ে আমার নাটকের কথা বলতে কেউ ভুললেন না! এবারে তার সাথে যুক্ত হল আমার অধিকাংশ নাটকের প্রিয় নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের নাম! কেমন করে তারা অধীর অপেক্ষায় বসে থাকতেন আমাদের নাটকের জন্য! হুমায়ূন আহমেদের প্রথম টেলিভিশন সিরিজ নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি ‘ প্রচারিত হত মঙ্গলবারে। সেদিন সন্ধ্যার পরেই ঢাকা শহর সুনসান হয়ে যেতো সবাই নাটক দেখবে বলে! এমন অনেক কথার ফাঁকে ফাঁকে সবাই ছল ছল চোখে হুমায়ূন আহমেদের আত্মার শান্তি কামনা করলেন! একটি ছোট্ট জীবনে এতো মানুষ তাঁকে কী করে এতো ভালোবাসলো! এটা অসম্ভব ভালোলাগা এক বিস্ময় আমার মনে ! দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে এক আকাশ শূন্যতাকে বুকে চেপে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলাম!
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সাদা শাড়ী পরে রেডি হলাম শহীদ মিনারে যাবার জন্য! প্রতি বছর এই সময়টাতে আমি দেশে আসি! আর সৌভাগ্য কি দুর্ভাগ্য জানিনা শহীদ মিনারে ছুটে যেতে হয় কারো না কারো জন্যে বিদায়ের এই মহাসমারোহে! গত বছর এখানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম অনন্য সাধারণ দুই সংস্কৃতি কর্মী, ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনিরের অকাল প্রয়াণে! এবার হুমায়ূন আহমেদের জন্যে!
বহুদূর থেকে হুমায়ূন ভাই এসেছেন। সারা বাংলাদেশ ভেঙ্গে পড়েছে শহীদ মিনারে। লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকার, নাট্য ব্যক্তিত্ব, ছাত্র, শিক্ষক, সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন, সকল মিডিয়া আর হাজার হাজার মানুষ এসেছে স্রোতের মত সারা বাংলাদেশ থেকে! লোকে লোকারণ্য। সকল টিভি চ্যানেল এসে তাদের অবস্থান নিয়েছে অনেক আগেই। ক্রেনের মত লম্বা স্কাই স্ক্র্যাপারের সাহায্যে ক্যামেরাম্যান উপর থেকে ক্যামেরা প্যান করে স্ক্রল আপ বা স্ক্রল ডাউন করে ছবি নিচ্ছেন! বাংলাদেশের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কর্মী কেউ কেউ ধারা বর্ণনা দিচ্ছেন!
সব কটি টিভি চ্যানেল সরাসরি সমপ্রচার করছে এই বিদায় উৎসব! হ্যাঁ উৎসবই তো!
মানুষের স্রোত চলেছে সারি দিয়ে, প্রিয় লেখক, প্রিয় নাট্যকার, প্রিয় পরিচালক, প্রিয় মানুষ হুমায়ূন আহমেদকে শেষবারের মত দেখতে। তাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে! হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় ফুল কদম! যত দূর চোখ যায় সবার হাতে কদম! সেই সাথে বকুল, জুঁই, বেলী, দোলনচাঁপাসহ নানা রকম সাদা ফুলে ওদের দুহাত ভরা! জীবনে তিনি যেমন উজাড় করে দিয়ে গেছেন তার পাঠকদেরকে, তেমনি আজ ওরাও প্রাণ উজাড় করে এনেছে ওদের পরম ভালোবাসা একজন হিমু’র জন্যে!
তাঁকে রাখা হয়েছে একটি অস্থায়ী মঞ্চের মত বানিয়ে, তাতে দুগ্ধ ধবল শামিয়ানা দিয়ে ঘেরা! তার পেছনে আর একটি শামিয়ানার তলায় হাজারো ভীড়ের মধ্যে আত্মীয়-পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে পাথরের মত বসে আছেন ওনার মা। মুখোমুখি শাওন। শাওনকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে অভিনেত্রী তানিয়া, মায়ের পাশে দাঁড়ানো ড. জাফর ইকবাল! এছাড়াও কত যে মানুষ! সে দৃশ্য যে না দেখেছে তাকে তা বলে বোঝানো যাবে না।
আমি গিয়ে দাঁড়ালাম হুমায়ূন আহমেদের মায়ের পাশে! ওনাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘খালাম্মা, আপনি তো কোন সাধারণ মা নন, আপনি ৭১ এ দেশের জন্য স্বামীকে হারিয়েছেন! আজ জননন্দিত সন্তান হারিয়েছেন! আপনি হুমায়ূন ভাইয়ের মা! আপনাকে তো ভেঙ্গে পড়লে চলবে না!’ শাওনের দিকে তাকানো যায় না। এই চার-পাঁচ দিনে সে যেনো ঝরে পড়া একটি শুকনো পাতার মত ফ্যাকাশে! সে থেকে থেকে কেঁদে উঠছে, অনর্গল কথা বলছে! আমাকে দেখে আবার সে গুঙিয়ে উঠলো! হাত দুখানি ধরে কেবল বললাম ‘ শাওন, শান্ত হও! শান্ত হও!’
হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর আগে ওনার শেষ ইচ্ছা কি ছিল বা কোথায় উনি সমাহিত হতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয়নি তখনো! সেই বিতর্কে, সারা পরিবার, সারা দেশের মানুষ ,সারা পৃথিবীতে ছড়িতে থাকা অগণিত হুমায়ুন ভক্ত দ্বিখন্ডিত! জাফর ভাইয়ের সাথে কথা বলে বুঝলাম পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে ওনারা বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে চান!
কফিনের পাশে সাদা কাগজের মত দাঁড়িয়ে আছে নোভা, শীলা আর কালো ফ্রেমের চশমা পরা নুহাশ! নুহাশ কিছুক্ষণ পর পর বাবার কফিনের উপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে! আমি শীলাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলে শীলা তার ভার ছেড়ে দিয়ে কেঁদে উঠলো! নোভাকে খুঁজছিলাম নোভার কাছেই! মাথায় ওড়না বেঁধে রাখায় আমি ওকে চিনতেই পারিনি! বিপাশা আমেরিকা থেকে এখনো এসে পৌঁছায়নি । ওরা তিন বোন আমাদের কত প্রিয় ছিল! ওরা ‘ এইসব দিনরাত্রি’ র সেটে এসে বসে বসে খেলা করত! আমরা ওদের সবাইকে ডাকতাম টুকটুকি বলে! আমাদের ঐ নাটকে ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল যার নাম টুকটুকি! ‘বহুব্রীহি’ নাটকের সেটে ওরা এলে আনন্দ বয়ে যেতো ! এই নাটকের মা (আলেয়া ফেরদৌসি) আমাদের জন্য খাবার বানিয়ে আনতেন! হুমায়ূন ভাইয়ের তিন মেয়ে, পরিচালক নওয়াজিশ আলী খানের ছেলে তোরসা আর ছোট্ট মেয়ে রেহনুমাকে সাথে নিয়ে আমরা সেই মজার নুডলস খেতাম! হুমায়ূন ভাইও বাদ পড়তেন না! আর নুহাশ! সে তো সেদিন হলো! ও আমার ছেলে সিদ্ধার্থের বয়সী!
সময় শেষ হয়ে এসেছে প্রায়, ঈদগাঁ মাঠে নামাজে জানাজা হবে সেখানে যেতে হবে, কেউ এসে জানান দিলে সবাই গিয়ে ঘন হয়ে দাঁড়ালাম তার কফিনের পাশে, ফুলে ফুলে পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা জুড়ে! এই সব মূহূর্তে মন কেমন এক অপার্থিব আলোকে ভেসে বেড়ায়, কফিনের উপর থেকে একটি তাজা বকুলের মালা তুলে নিলাম হাতে! দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম ‘ হুমায়ূন ভাই, আপনার কি মনে হচ্ছে আপনার প্রিয় বই তারাশংকরের ‘কবি’ থেকে সেই উদ্ধৃতি! “জীবন এতো ছোট কেনে!”
হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এগিয়ে গেল তাঁর শেষযাত্রা! পিছনে অগণিত মানুষের মিছিল! ক্রন্দন! হাহাকার! ফুল! পায়ের কাছে পড়ে থাকা বর্ষার প্রথম কদম! কিছুক্ষণের মধ্যে আস্তে আস্তে শূন্য হয়ে এলো শহীদ মিনার । আজ দাফন হবে না । আজ রাতে তিনি থাকবেন বারডেমের হিম ঘরে! কাল পারিবারিক সিদ্ধান্ত হলে তারপর শেষ হবে এই পার্থিব আয়োজন!
অপার্থিব এক যাত্রায় তিনি একাকী চলেছেন সেই আনন্দধামে! আমার হাতের ভেতর তাঁর শেষ চিহ্ন বকুল মালা! ছোট নয়, তাঁর বিশাল জীবনের সুষমায় ভরা এই ফুল! আমার মনের শূন্যপ্রান্তরে আমি যেনো শুনতে পাচ্ছি সেই অনন্তধামের পানে ছুটে চলা এক স্বর্গ সংগীত গীত হতে ! তা যেন সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিব্যাপ্ত হয়ে কী এক অজানা ইন্দ্রজাল বিছিয়ে দিয়ে গেলো আমার উপলব্ধির উপকূলে। আমি শহীদ মিনার থেকে পা বাড়ালাম এই জেনে ,~~~~~~~” তবুও শান্তি , তবু আনন্দ , তবু অনন্ত জাগে ~~~~~~”

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.