অ্যাবিউজের শিকার হয়েছি আমি

0

#Metoo
সুপ্রীতি ধর:

আমি জানি, আমার এই স্বীকারোক্তির কোনো মূল্য কারও কাছে নেই। সবাই বলবে, কী দরকার এসব বলার! সত্যিই তো, কোনো দরকার নেই। ছোটবেলা থেকে বলার চেষ্টা করেছিলাম বলে ‘খারাপ মেয়ে’ তকমা জুটেছিল। ‘খারাপ মেয়ে’দের সাথেই এসব ঘটে। ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার অনেক চেষ্টা করে গেছি জীবনে, হতে পারিনি। চোখের সামনে যেসব মেয়েকে অ্যাবিউজ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছি, শুধুমাত্র মুখ বন্ধ রেখেছে বলে, নিজেদের স্বজনদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেনি বলে, বা তারা এটাকেই নিয়তি হিসেবে ধরে নিয়েছিল বলে, তারা ‘ভালো মেয়ে’ হিসেবেই জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছে। নিজের ঘরেই ছিল এমন একজন ‘ভালো মেয়ে’। এখনও সে ভালো মেয়ে হয়েই জীবন কাটিয়ে দিল। আর আমি যে ‘খারাপ’ ছিলাম, খারাপতর হয়ে রইলাম তাদের কাছে। আমার এই প্রতিবাদী মানসিকতা আমাকেও ক্ষমা করেনি। তারপরও ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আজও তো আমি বলতে পারি, ‘আমি কোনো অন্যায়ের সাথে আপোস করিনি’।
তখন কোন ক্লাসে পড়ি, ঠিক মনে নেই। ক্লাস টু বা থ্রি হবে। গ্রামের বাড়িতে লজিং থাকতো অনেকে। তাদের হাতে প্রথম নিগৃহীত হই কিছু বুঝে উঠার আগেই। ভগবানভক্ত ঠাকুরমার ভগবানের দরবারে তখন মাথা কুটে মরেছি, বলেছি, আর যেন এরকম কিছু না হয় আমার সাথে। আমি সারাজীবন বড়দের কথা শুনবো, লেখাপড়া করবো। কিন্তু ওই অন্ধ ভগবান শোনেনি। একের পর এক কোথা থেকে যে তার ভক্তদের হাজির করতো আমাকে নানাভাবে নিপীড়ন করার জন্য। খুব কাঁদতাম তখন।
বাড়িতে পূজো আর্চা তেমন কিছু হতো না, এক মঙ্গলচণ্ডি পূজা হতো প্রতি মঙ্গলবার। আমি সেখানে ভাঙতি পয়সা দিতাম যাতে আমার গায়ে কেউ হাত না দেয়। কিন্তু তারপরও দিতো। তখন রাগ করে সেই পয়সা ফিরিয়ে নিতাম আমি। কী মনে করে জানি না, ক্লাস টুতে পড়ার সময় একবার নিজাম আউলিয়ার মাজারে গিয়েছিলাম কাউকে না বলে, সেখানেও পাঁচটা মোম জ্বালিয়ে এসেছিলাম শুধুমাত্র ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার আশায়! কীসের ভগবান, কীসের ঠাকুর, কীসের আল্লাহ! এক সামান্য মেয়েকে যে রক্ষা করতে পারে না! সেই থেকে যে বিশ্বাস হারালাম, আর ফেরত পেলাম না। খারাপ মেয়ের ভগবানে বিশ্বাস থাকে না। আর ভগবান-ঈশ্বরও খুব একচোখা এসব মেয়েদের প্রতি।

বড় হতে থাকলাম, বড় বড় মানুষ অ্যাবিউসিভ হয়ে উঠলো আমার প্রতি, সেখানে সবাই আমার আত্মীয় স্বজন। আদর করার ছলে বেশিক্ষণ বুকে চেপে ধরা থেকে শুরু করে মাথা ব্যথায় মাথা টিপে দেয়ার ছলে যেখানে-সেখানে হাত দেয়া, যদিও ঝটিতে সেই হাত ততদিনে আমি সরিয়ে দিতে শিখে গেছি। তারপরও বেহায়া, নির্লজ্জ সেই পুরুষগুলো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতো। তাদের নাম-ধাম আজ যদি নেই, কেউ বিশ্বাস করবে আমাকে? তাই চুপ করে থাকি। খারাপ মেয়ে যে আমি!

চাকরি জীবনে মৌখিকভাবে অ্যাবিউজড হয়েছি, এবং বড় বড় হাউজগুলোতেই। সেইসব বড় বড় হাউজে যেসব মেয়ে মুখ বুঁজে সব সয়ে নেয়, তারা টিকে থাকছে, যারা পারছে না তো পারছেই না। অশ্লীলতাও এক ধরনের অ্যাবিউজ, যা বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলোতে অনবরত হচ্ছে। ‘ফেমিনিজম বা নারীবাদ’ কথাটা জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে কিছুটা সতর্কতা এইক্ষেত্রে এলেও ইন্সটিংক্ট কী করে লুকোবে সবাই! কোনো না কোনভাবে প্রকাশ হয়েই যেতো! আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারতো না পরবর্তীতে, আর তার ফলশ্রুতিতে ‘ছাঁটাই’। 

যাই হোক, এবার আসি অনলাইন অ্যাবিউজের কথায়। বেশিদূরের  কথা বলবো না। এ বছরের এটা অক্টোবর মাস। মানে ১০ মাস যাচ্ছে। এর মধ্যে গত আট মাসই আমি অনলাইন হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়েছি। কখনও অনলাইনের বিখ্যাত গালিবাজদের, কখনও জামাত-শিবিরের, কখনও বা নিজেদেরই সতীর্থদের, যাদের সাথে দিনের পর দিন গলায় গলা মিলিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে সোচ্চার থেকেছি। ওরা আমাকে এতোটুকু ছাড় দেয়নি কোথাও। কেন? শুধুই নারী বলে? বিষয়টা সহজ হয়ে যায় নারীর ক্ষেত্রে। নারীকে গালি দিতে সহজ, বিছানা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া সহজ।

আর এই মুহূর্তে আমি অনলাইন অ্যাবিউজের শিকার হচ্ছি ঠিক তাদের, যাদেরকে সাথে নিয়ে আমার পথচলা, যাদের নিয়ে আমার আন্দোলন, যাদের বিপদে আমার ঝাঁপিয়ে পড়া আমার সর্বো্চ্চ দিয়ে। অ্যাবিউজের ক্ষেত্রে মেয়েরাও যে কম যায় না, তারাও যে দিনশেষে অস্ত্রটুকু পুরুষতন্ত্র এবং মৌলবাদের হাতে তুলে দিতে পারে, নিজের জীবনে না ঘটলে জানতেই পারতাম না। তারা কী বলছে? তারা আমাকে সাম্প্রদায়িক বলছে, বলতেই পারে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের দেশে সংখ্যালঘু উপাধি দিয়ে নিজের ঝাণ্ডা উড়িয়ে চলেছি, এইটুকু না বললে কী হয়! তারা আমাকে ‘ঘাটের মড়া’ বলছে, তাও বলতে পারে, বয়স তো কম হয়নি। পঞ্চাশ পার করছি এ বছর, মড়াই তো একদিকে। বলছে, আমাকে অর্থ দিয়ে পেলে-পুষে চালাচ্ছে। এটা কতোটা সত্য, কতোটা আধা সত্য, তার বিচার করার আমি কেউ না। অ্যাবিউজ অ্যাবিউজই।

থাকগে, লড়াইয়ের ময়দানে কে কাহার! তারপরও কিছু ‘মানুষ’ পাই, যারা ঘাড়ে স্নেহের-ভালবাসার হাতটি রাখে। এটাই আমার সাকসেস।

এতো কথা বললাম (সংক্ষেপে), প্রেমই বা বাকি থাকে কেন? হমম, প্রেম আমার হয়েছে। কিন্তু যারাই আমার মানসিক প্রেমকে অবহেলা করে শুধুই শরীরের দিকে তাকিয়েছে, তাদের প্রতি আমার না ছিল আস্থা, না বিশ্বাস, শ্রদ্ধা তো ছিলই না।

এই গল্পগুলো বলার কারণ একটাই। শুরু করা। মেয়ে মাত্রই নানারকম অ্যাবিউজের মধ্য দিয়ে যেতে হয় জীবনভর। যখন নারীনেত্রী আয়শা খানম বলেন, এখনও আমাকে রিকশায় বসতে গিয়ে সতর্ক থাকতে হয়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, মেয়েদের অবস্থা আসলে কী! শহুরে মেয়েদের বেশি মিশতে হয় পুরুষের সাথে, চলাফেরা করতে হয়, তাই তাদের গল্পও নানানমুখী।

কিন্তু যে মেয়েটা গ্রামে থাকে, যে মেয়েটা ঘরের চৌহদ্দি পেরোয় না, সে কী নিরাপদ? মোটেও না। সে নিজের আপন বাবা-ভাই-চাচাতো-মামাতো ভাই, পাড়াতো ভাই সবার দ্বারা নির্যাতিত হয়। সব খবর পত্রিকার পাতায় আসে না, সব খবর মেয়েরা মুখ ফুটে বলে না। সেই সাহস এখনও আমরা মেয়েদের জোগাতে পারিনি। যতদিন না মেয়েরা মুখ খুলবে, বলবে নিজেদের কথা, এগিয়ে আসবে প্রতিবাদ করতে, ততদিন এসব হ্যাশট্যাগেই সীমিত থাকবে আমাদের প্রতিবাদের ভাষা।

আমরা বেরিয়ে আসতে চাই, বলতে চাই। একটা বেড টাচও যেন অকথিত না থেকে যায় আমাদের জীবনে, সেই সময়ের অপেক্ষায়।
#Metoo

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2K
    Shares

লেখাটি ১১,৬৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.