‘নারীর শত্রু নারী’ – একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রবচন

0

শেখ তাসলিমা মুন:

নারী নারীর শত্রু – কথাটি শিক্ষিত নারীর মুখে বেশি ঘোরে। অনেক শিক্ষিত নারী নারীর বিরুদ্ধে আক্ষেপ প্রকাশ করতে অনায়াসে ব্যবহার করেন কথাটি। তাঁরা ভুলে যান কথাটি তাদের মুখে পুরে দিয়েছে পুরুষতন্ত্র, আর সে কথাটি সহজে ব্যবহার করে ফেলছেন।

হাজার বছর ধরে নারীকে একটি কুঠুরিতে আবদ্ধ রেখে পুরুষ বাইরে হাল চাষ করেছে। রাজা উজির গ্রহ নক্ষত্র দখলে রেখেছে পুরুষ। নারীদের অন্দর মহলে লেপ কাঁথা ঘটি বাটির ভেতরে জীবন আবদ্ধ করে রেখেছে। পুরুষেরা গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে কথা বলবে, আর নারীরা বলবে ঘটি বাটি নিয়ে। মেয়েদের হাতে বড় টপিক স্বেচ্ছায় এসেছে কি? বেগম রোকেয়াও বলেছেন, ‘আমাদের পুরুষেরা যখন গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব মাপিতেছেন, সে সময় আমাদের মেয়েরা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপিতে ব্যস্ত।‘

বিষয়টি এই যে, সে যার এবং যাদের ভেতর থাকে সে তার ভেতর নিজের মেধা ও স্কিলসের প্রমাণ দেন। আমরা অনেক সময় একটি কথা বলতে শুনি, ‘উফফ! মেয়েটি যে কি কুটনা আর মুখরা’! একবার ভেবে দেখি এ মেয়েটি তার এ দিকটি নিয়ে বড় একজন কূটনীতিক হতে পারতো, বা তার্কিক। কিন্তু তার কাটছে একটি সংকীর্ণ গণ্ডিতে। তার কাজ সকাল থেকে ঘটিবাটি মাজা। ঘটিবাটি তেল মশলার হিসেব রাখা। সেগুলোর কম পড়লে সে ঝাঁঝিয়ে উঠছে। আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। তার সকল স্কিল সেগুলো ঘিরেই ডেভেলপ করে। মেয়েদের সকল সঙ্কীর্ণতা এভাবেই মাপা হয়ে থাকে।

নারীর বিরুদ্ধে নারীকে পুরুষ কিভাবে লেলিয়ে দিয়ে রেখেছে সেটি দেখা যাক। শুধু শাশুড়ি এবং পুত্রবধূর সম্পর্ক দেখি। এই দুই নারীর ভেতর কাজ করে ক্ষমতার একটি লড়াই। শাশুড়ি মনে করেন এ সংসার আমার। এ ছেলেকে আমি গর্ভে ধারণ করেছি। বড় করে তুলেছি। একটি মেয়ে হুট করে এসে আমার সব কেড়ে নিচ্ছে। সে কেড়ে নিচ্ছে আমার ছেলে এবং আমার সংসার আমার চাবি।

মেয়েটি মনে করছে, আমারও এ সংসারে রাইট রয়েছে সমান সমান। আমাকে এ অধিকার নিজ হাতে নিয়ে নিতে হবে। আমি তো দয়ার উপরে আসিনি। আমি তার স্ত্রী। জীবনসঙ্গিনী। এখানে একটি ক্ষমতার ক্ল্যাশ তৈরি হয়ে থাকে। একটি লড়াই চলতে থাকে প্রকটভাবে। ছেলেটির উপর মায়ের ‘পাওয়ার’ বেশি? না স্ত্রীর ‘পাওয়ার’? বিষয়টি কি তাই? এটা কি আদৌ পাওয়ারের বিষয়? সম্পর্কে সবার ভূমিকা আলাদা। স্ত্রীর ভূমিকা মা পূর্ণ করতে পারেন না। মা’র ভূমিকা স্ত্রী নয়। কিন্তু ক্ষমতার লড়াইটা তবু তাদের ভেতর চলতে থাকে। ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

অথচ এ দুজন নারীর যদি রাষ্ট্রীয় দুটি দপ্তর থাকতো। একবার ভেবে দেখি তাঁরা কী নিয়ে লড়াই করতেন? তাদের জগতটি হঠাৎ বৃহৎ হয়ে যেতো। তাদের প্রতিদিন শত মানুষের, শত বিষয়ের সংস্পর্শে আসতে হতো। তাদের দেখার পরিসর অনেক বড় হয়ে যেতো। সেগুলো তাদের যেমন ব্যস্ত রাখতো, একইভাবে তাদেরকে সমৃদ্ধ করতো। সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে তাঁরা একটি বৃহৎ বিষয় নিয়ে বৃহৎ সমস্যা নিয়ে ভাবতো। বড় বড় কনফ্লিক্ট হ্যান্ডলিং করতে হতো পেশাগত দক্ষতায়। পুরুষতন্ত্রের মহিমায় তাঁরা সেটি হয় না। নারীকে পুরুষরা যত ক্ষুদ্র বিষয়ে ব্যস্ত রাখতে পারে, তত পুরুষতন্ত্রের জয় হয়। ক্ষুদ্র বিষয়ে তাদের ইনভলভ রাখলে তাঁরা নিরাপদবোধ করে। তাদের সুবিধাগুলো নিরপদ থাকে। নারী যত জ্ঞান অর্জন করবে, বড় বিষয়ে ইনভলভ হবে তত তাঁরা অধিকার সচেতন হবে। বড় বিষয়ে প্রশ্ন করবে। সেজন্য পুরুষতন্ত্র সব চাইতে আনন্দিত হয় নারীকে যুদ্ধে লিপ্ত রেখে।

মনে রাখতে হবে মানুষ স্বভাবতই মেধার অধিকারী হয়ে জন্ম নেয়। সেটি ব্যবহারের সঠিক ফিল্ড না পেলে সে তার আশেপাশের ক্ষুদ্র ফিল্ডেই ব্যবহার করতে বাধ্য। ঠিক এটাই আমাদের সংসারে মেয়েদের ভেতর ঘটে। এ যুদ্ধে একইভাবে আমরা জায়ে জায়ে, ননদ বৌদি, ঝি গৃহিণী সবার ভেতরে দেখতে পারি। খুব সামান্য বিষয়ে তাঁরা ইনটেন্সিভ হয়ে ওঠে। তাদের কনফ্লিক্টগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুবই সামান্য বিষয় নিয়ে তৈরি হয়। বৃহত্তর পরিবেশ না পাওয়ায় তাদের ভেতর খিটখিটে সঙ্কীর্ণতা, ঈর্ষা, গসিপিং, কানকথা, ষড়যন্ত্র এসব দেখা যায়। এবং এর সবই খুব ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে।

কিন্তু মজার বিষয় এর সবই পুরুষের ভেতরও বিদ্যমান। কিন্তু তাদের টপিকগুলো ভিন্ন। প্রিমিটিভ সমাজে পুরুষের ভেতরও মল্লযুদ্ধ ছিল। নারীকে বিয়ে করতে পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে জিতে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হতো। বড় বড় চাকরিতে পুরুষের ভেতর প্রতিযোগিতা যড়যন্ত্র কারসাজি কম নয়। রাজনীতিতে, কূটনীতিতে, যুদ্ধনীতিতে তাদের ভূমিকা আমরা কম জানি না। পৃথিবীতে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখেছে পুরুষ। নারী নয়। পারমানবিক শক্তির খেলা নারী নয়, পুরুষ দেখিয়ে চলেছে। সীমানা দখল, ধনী দরিদ্রের ভেতর বৈষম্যের ইতিহাস পুরুষেরা তৈরি করে রেখেছে। নারীরা নয়। অথচ নারীর ভেতর কোন আলোচনা দেখলেই তাঁরা কত সহজেই বলে ফেলে ‘নারীর শত্রু নারী’! প্রশ্ন, তারা কাদের শত্রু?

নারীরা হাজার বছর ধরে একটি সংকীর্ণ জগতে বাস করে আজ যে সামান্য অংশ বাইরে আসতে সক্ষম হয়েছে তাদের যুদ্ধটা ছোট নয়। সহস্র বছরের বঞ্চনার ইতিহাস কাঁধে নিয়ে একদিনে উত্তীর্ণ হওয়াও সহজ নয় তাদের জন্য। শিক্ষিত নারীর মতভেদ বিতর্ক-তর্ক তাই আমরা ‘নারীর আপন যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে ফেলি। মনে করি নারীর সঙ্কীর্ণতা। নারীর পারস্পরিক ঈর্ষা যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলি সহজে। বিষয়টি মোটেও তা নয়। এমন কি আদর্শিক কোন পয়েন্টে নারীরা পরস্পরের সাথে দ্বিমত হতে পারেন। বাকযুদ্ধে লিপ্ত হতে পারেন। তার ইন্টেন্সিটিকে ‘মেয়েলি ঝগড়া’ মনে করে ‘নারীর বিষয়’ করে তোলা সম্পূর্ণ ভুল বিষয়। নারী কোন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলে ‘নারী নারীর শত্রু’ হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে বিষয়টির গুরুত্ব লঘু করার একটি মনোভাব আমরা দেখতে পারি।

মনে রাখতে হবে পুরুষ যেখানে প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধে লিপ্ত, বাক বিতণ্ডায় লিপ্ত, হুমকি প্রতি হুমকিতে ব্যস্ত, সেখানে নারী কোন বিষয়ে বিতণ্ডায় লিপ্ত হলেই সেটি ‘ঝগড়া’ হিসেবে বা ‘অনৈক্য’ এবং নারীর ব্যর্থতা হিসেবে বিশেষায়িত করে নারীর ঘাড়েই দায়িত্ব চাপানো একটি চেপে বসা মানসিকতা। এই একই বিষয় পুরুষ প্রতিদিন করছে কিন্তু সেটিকে সেভাবে বিশেষায়িত কেউ করছে না। যেভাবে নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারীকে এখানেও ‘ডাবল দায়িত্ব’ ‘ডাবল অভিযোগ’ এ অভিযুক্ত করা হচ্ছে। নারীকে এ ক্ষেত্রেও মাল্টিপল দায়িত্ব পালন করতে হয়। একদিকে বিষয়ের উপর। আরেক দিকে এটি ‘নারীর ঝগড়া’ ট্যাগ না পাওয়ার প্রচেষ্টা। নারীর দায়িত্ব বেড়েই চলে।

নারীকেও অব্জেক্টিভভাবে এগুতে হবে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা ক্রতেহবে বিষয় থেকে ব্যক্তিকে আলাদা করে। বিতর্ককে একটি জ্ঞান অর্জনের টপিক করে তুলতে হবে। নারী বা পুরুষ উভয়ই কোন না কোন আদর্শের অনুপ্রেরনায় বার্ন করেন। তাঁরা তাদের টপিকে লিখবেন। বিতর্ক করবেন। এমন কি সে বিতর্ক যেমন পুরুষে পুরুষে বা নারীতে নারীতে বা নারী ও পুরুষে। কাউকে কারো শত্রু করে নয়, বিষয়বস্তুর গুরুত্ব তুলে ধরা হোক আক্রমণ প্রতিআক্রমণের শেলে। নারীর বুঝতে হবে তাঁদের বিরুদ্ধে হাজার বছরের ষড়যন্ত্র। তাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বহু মত বিতর্ক নিয়েই একসাথে এক কাঁধে এগুতে হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 524
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    524
    Shares

লেখাটি ১,১৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.