জীবন যেরকম

0

লতা হামিদ:

চৈতির ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ি দেখলো ঠিক পাঁচটা। প্রতিদিন এই সময়টাতে ঘুমটা ভেঙে যায়। আশ্চর্য! শরীরের মধ্যে কী একটা এলার্ম ঠিক করা আছে। একটু হাসলো। মনে মনে বললো দিনটা যেন ভাল যায়। প্রতিদিনই ঘুম থেকে উঠে এই প্রার্থনাটা করে। আস্তে করে বিছানা থেকে নামলো। দিন শুরু হলো।

ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কিচেনে গেল। ওর আর রাহুলের জন্য দু’কাপ চা বানিয়ে রুমে নিয়ে এলো। সকালের এই চা টা ওরা দু’জনে একসাথে খায়।চা খেয়ে ও রাহুলের টাওয়েল ওয়াশরুমে দিল। রাহুল উঠে গোসল করবে। ওর অফিসের কাপড় বের করে দিল। রাহুল এমনিতে পরিশ্রমী। কিন্তু নিজের এই কাজগুলিতে ও পুরোপুরি চৈতির উপর নির্ভরশীল। চৈতি অবশ্য রাগ করে না। ও দ্রুত মেয়েদের রুমে গেল। দু’জনকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। রুমা-ঝুমা দু’বোন। ছোট ঝুমাটা খুব দুরন্ত। পাঁচ বছর বয়স। ওরা দু’জনেও সকালে গোসল সেরে নেয়। ওদের স্কুল ড্রেস বের করে দিল চৈতি। নিজেরাই তৈরি হয়ে নেবে।

কিচেনে গেল তাড়াতাড়ি করে। দু’মেয়ের খাবার জন্য দু’গ্লাস দুধ আর স্কুলে নেবার জন্য টিফিন ঠিক করলো। রাহুলের জন্য নাস্তা তৈরি করলো। ওরা টেবিলে এসে ঝটপট খেয়ে নিল। বাবা অফিসে যাওয়ার সময় দুই মেয়েকে স্কুলে দিয়ে যায়।

ওদের বিদায় জানিয়ে শাশুড়ী রুমে নাস্তা নিয়ে গেল চৈতি।সকালে উনি টেবিলে আসেন না।এলে চৈতির সময়টা কম লাগতো।

এর মধ্যে সকালে সাহায্যকারী মেয়েটি এসে ঘর মুছে, কাপড় ধুয়ে দিয়ে যায়।চৈতি কোনরকমের গোসল করে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নেয়।প্রায়দিনই নাস্তা খাবার আগেই অফিসের গাড়ি এসে যায়।লাঞ্চ বাসা থেকে নিয়ে যায় ও।আর ওদেরটা টেবিলে গুছিয়ে রেখে যায়।

বড় মেয়ে রুমার বয়স সাত বছর হলে কী হবে, খুব গোছালো। ড্রাইভার স্কুল থেকে নিয়ে আসে। তারপর চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেয়। ততোক্ষণ শাশুড়ী বাসায় একাই থাকে। কী আর করা! মেয়ের বাসায় উনি থাকতে চান না।

ঝুমাকে নিয়ে রুমা খেয়ে নেয়। ওর মাকে ফোন করে।বাবা মা দু’জনই ফোন করে সারাদিন ওদের খোঁজখবর নেয়। আগে যে আয়া ছিল,ভালো ছিল। কিন্তু দেশে চলে গেল। এখন দু’জন মেয়ে দু’বেলা এসে কাজ করে দেয়। চৈতি মেয়েদের জন্য এবং শাশুড়ীর জন্য চিন্তা করে কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পায় না। অবশ্য ওদের ফ্ল্যাট নিরাপদ। শাশুড়ীর ওপর নির্ভর করতে পারে না। কেননা তিনি কোন কাজ করতে পছন্দ করেন না। চৈতি কিছু বলে না। বয়স হয়েছে তার,হয়তো ভাল লাগে না। রুমা-ঝুমা নিজেদের মতো থাকে।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে চৈতি পোষাক পাল্টে আধাঘন্টা বিশ্রাম নেয়। বিকেলের মেয়েটা এসে ঘর মুছে, তরকারী কুটে দেয়।রান্নাঘরের কাজ করে। চৈতি ঝটপট নাস্তা তৈরি করে মেয়েদের এবং শাশুড়ীকে দেয়। রাহুল চলে এলে ওকেও দেয়।মেয়েদেরকে নিয়ে পড়তে বসায়। রান্না করে সবাই একসাথে খেয়ে নেয়। যেদিন রাহুল অফিসের মিটিং এ বাইরে খেয়ে আসে, সেদিন ওর খাওয়া হয় না। মেয়েদের দশটার মধ্যে শুইয়ে দেয়। তারপর রাহুলের সাথে সারাদিনের টুকটাক গল্প করে নিজেরাও শুয়ে পড়ে।

মাঝে মাঝে এই জীবনে ও হাঁপিয়ে ওঠে। বিয়ের আগে নাটক,সিনেমা,শপিং,বন্ধু-বান্ধব কত কিছু ছিল। এখন বিয়ে বাড়ি ছাড়া কারো সাথেই দেখা হয় না। এমনকি অন্যান্য ফ্ল্যাটের সবার সাথে লিফটে মাঝে মাঝে দেখা হয়।ছুটির দিনে আরও কাজ!তার মধ্যে কিছু কিছু সামাজিকতা করে।

ঘুম থেকে উঠতে আজ দেরি হলো।অতএব সবটাই এলোমেলো হয়ে গেল।ওদেরটা করে শাশুড়ী নাস্তাটা সাহায্যকারী মেয়েটাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলো।সব গুছিয়ে নিজের অফিসের গাড়িও ধরতে পারল না।অতএব সিএনজি ভরসা।দেরি হয়ে গেল।বাসায় এসে দেখে রাহুল আজ আগেই এসেছে।মুখ গম্ভীর।ওকে বললো,তুমিতো মায়ের নাস্তাটা দিতে পার।আজকে মা নাস্তা,ভাত কিছুই খায়নি।তারতো ডায়াবেটিক আছে।চৈতি কী বলবে?কথা বললেই ঝগড়া হবে।তাই ও চুপচাপ কাজ করে যায়।

পরদিন সকালে চৈতি নাস্তা নিয়ে গেল। শাশুড়ী ঠেলে ফেলে দিল। কালকের রাগ আজও ধরে রেখেছে। ওর রাগ উঠে গেল।ও একা মানুষ, এতো অবুঝ হলে কি করে চলবে। আবার নাস্তা দিল। ওর শাশুড়ী অসম্ভব রাগী। সন্ধ্যার পর মেয়ে বেড়াতে এলো। তার কাছে বউয়ের বদনাম করলো। তার দিকে লক্ষ্য রাখে না। মেয়ে বোঝাল একা হাতে কতটা করা সম্ভব। তাওতো চৈতি অনেক লক্ষ্য রাখে। এতো অবুঝ হলে চলবে কিভাবে?

এ নিয়ে রাহুলের সাথেও একদিন তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল।চৈতি বললো ওর একার পক্ষে আর কতোটা সম্ভব।মা ছেলে দু’জনেই গুম মেরে রইলো।চৈতির দিশেহারা লাগছে।ওরা চাকরি ছেড়ে দিতে বলে।কিন্তু ও কেন চাকরি ছাড়বে?রাহুলকি কোন ছাড় দেয়?

চৈতি ওর বন্ধু ইলার সাথে কথা বললো।ইলাই ওকে বৃদ্ধাশ্রমের পরামর্শ দিলো। ওরা দু’জনে মিলে খুঁজে একটি মোটামুটি বৃদ্ধাশ্রম পেলো।

চৈতি রাহুলের সাথে কথা বললো।এতোদিন রাহুল ওর সাথে তেমন ভাল করে কথা বলেনি।রাহুল শুনেই বললো, না তা হয়না।চৈতি বললো তাহলে আমিই কোন হোস্টেলে চলে যাই।তোমরা কিভাবে থাকবে ঠিক করে নাও।

অবশেষে চৈতি বৃদ্ধাশ্রমে টাকা পয়সা দিয়ে ওর শাশুড়ী জন্য রুম ঠিক করে এলো।রাহুলের খুব মন খারাপ।কিন্তু চৈতির জিদের কাছে ওকে হার মানতে হলো।ও মার সাথে কথা বললো।ওর মা অসম্ভব অবাক হয়ে গেল।চুপ করে গেল।বললো তোমরা যা ভালো মনে করবে তাই করো।একদিন রাহুল আর চৈতি গিয়ে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে এলো।

বাসার ছন্দটা যেন কেটে গিয়েছে।ওদের দু’জনের সম্পর্কে যেন সেই আগের সুরটা আর নেই।রাহুল মাঝে মাঝে গিয়ে মা কে দেখে আসে।

দেখতে দেখতে তিন মাস হয়ে গেল।ওরা ঠিক করলো কক্সবাজার বেড়াতে যাবে। একটা পরিবর্তন হলে ভাল লাগবে। চৈতির মন খারাপ লাগছে।ও রা কক্সবাজার যাচ্ছে শাশুড়ীকে রেখে। ওর মা হলে কী করতো? এতোটা কি পারতো! রাহুল বলছিল মার শরীরটা ভাল না। খুব চুপ হয়ে গিয়েছে। চৈতি ওর শাশুড়ী কাছে একদিনও যায়নি। ও বিব্রত বোধ করে।

আজকে রাহুলকে ফোন করে বললো ও যেন গাড়িটা ওর অফিসে পাঠিয়ে দেয়।ছুটির পর ওর লাগবে।

সন্ধ্যার পর ও বাসায় এসে কলিংবেল দিল। রাহুলই দরজা খুললো। খুলেই অবাক। দুই মেয়ে দিদা এসেছে দিদা এসেছে বলে ছুটে এলো। বললো দিদা আমরা কক্সবাজার যাচ্ছি। হ্যাঁ আমিও যাচ্ছি বলে নাতিদের আদর করলো। চৈতি বললো, তোমরা সরো, দিদাকে ভিতরে ঢুকতে দাও। আর ড্রাইভারকে বললো জিনিসপত্রগুলো মা’র ঘরে দিয়ে এসো।

চৈতি শাশুড়ীর হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এলো। রাহুল এগিয়ে এলো। ও চৈতিকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরলো।

লতা হামিদ
ধানমন্ডি,ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 201
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    201
    Shares

লেখাটি ৭১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.