রমা চৌধুরী ও একটি সোনার বাংলার স্বপ্ন

rama maমিজানুর রহমান (উইমেন চ্যাপ্টার): ‘কবে বলো হাসবে সবাই, দুঃখের হবে শেষ’ বলেই কেঁদে ফেলেন তিনি। এতোটাই দেশপ্রেমিক, এতোটাই সন্তানপ্রেমিক, এতোটাই ভালোবাসেন এই দেশ ও দেশের মাটিকে। তিনি আর কেউ নন, একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী। একাত্তরে সব হারিয়েছেন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন হানাদার বাহিনীর কাছে। যুদ্ধের কারণে দুটি সন্তান, তারও পরে আরও একটি সন্তান হারিয়েছেন তিনি। বিজয়ের পর ভেবেছিলেন হয়তো এবারে তার দুঃখ ঘুচবে। স্বপ্নের স্বাধীনতা যে পেয়েছেন তিনি আজ। কিন্তু হায়, দেশ হানাদার বাহিনীর হাত থেকে স্বাধীন হয়েছিলো ঠিক। কিন্তু ধর্ম ও ধর্মীয় গোঁড়ামী থেকে স্বাধীন হয়নি। নির্যাতিতা বলে অপবাদ সইতে হয়েছিলো দিনের পর দিন। সমাজ যেনো তাঁর বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো। সহায়তা করেনি কেউই। না খেয়ে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। দোকানে যেতে পারতেন না গঞ্জনা সহ্য করতে হয় বলে।

১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন তিনি। দক্ষিণ চট্টগ্রামে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী স্নাতকোত্তর। একাত্তরপূর্ব সময়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অনেক উচ্চ বিদ্যালয়ে। দুই সন্তান সাগর ও টগরকে নিয়ে সুখের সংসার ছিলো তাঁর।

আসে একাত্তর, ভয়াল সেই সময়। স্বামী সব ছেড়ে সন্তান ও স্ত্রীকে একা করে চলে যায় ভারতে। দিশেহারা রমা চৌধুরী তখন দুই সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নেন চট্টগ্রামের মোয়ালখালি উপজেলার পোপাদিয়ার গ্রামের বাড়িতে। ১৩ই মে ‘৭১ সেই বাড়িতে আসে হানাদার বাহিনী। এক এক করে নির্যাতন চালায় বাংলার নারীদের উপর। আসন্ন-প্রসবা থেকে শুরু করে কিশোরী কেউই বাদ যায়নি সেদিন। মা ও সন্তানের সামনেই নির্মম পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তিনি বলেন, সেদিন আমি প্রাণে মরিনি, আমার আত্মার মৃত্যু হয়েছিলো। আত্মাকে সমাধিস্থ করে সেদিন জন্ম নিয়েছিলো এক সংগ্রামী নারীর। সংগ্রাম শুরু করেছেন সমাজের বিরুদ্ধে। সহ্য করতে হয়েছে অনেক অপমান। অঘোষিত অসহযোগ পালন করছিলো চারপাশের সমাজ। দোকানে গেলে খাবারের বদলে পেতেন গঞ্জনা, চলাফেরা করলে কটুক্তি। না খেয়ে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। মুক্তির একদিন আগের কথা, ১৫ ডিসেম্বর খাবার কষ্টের কারণে সাগরের প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কোনো ডাক্তার দেখতে আসছিলো না। পরে পাগলপ্রায় রমা চৌধুরীর জোরাজুরিতে ডাক্তার আসেন। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি সাগরকে। ২০ ডিসেম্বর মারা যায় সাগর। তারও অল্প কিছুদিন পরই সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় রমার অসাবধানতাবশত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায় টগরও।

কোনভাবেই রমা চৌধুরী ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস মনে করতে পারেন না। তিনি বলেন, এই দিন বিজয়ের নয়, এই দিন শোকের। শোকেরই তো। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের উপর দাঁড়িয়ে কি করে বিজয়োল্লাস করে মানুষ? বিজয়ের পর থেকেই যেন শুরু হয় রমা চৌধুরীর জীবনের আরেক অধ্যায়। নতুন করে শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন আরেকবার। তবে সংসারে আসে আরেকটি সন্তান। টুনু নামের সেই ছেলেটিও মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়।

সনাতন ধর্মে শবদাহের কথা থাকলেও রমা চৌধুরী তা মানেননি। তিনি ওদের কবর দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানের মৃতদেহ মাটির নিছে রেখে তিনি জুতো পরে হাঁটতে পারতেন না। সন্তান কষ্ট পাবে বলে। পরে সকলের জোরাজুরিতে কিছুদিন জুতা পড়লেও টুনুর মৃত্যুর পর ১৯৯৮ সাল থেকে একেবারে জুতা পরা ছেড়ে দেন।

কখনো কারো কাছ থেকে কোন প্রকারের সহায়তা নেননি। নিজের লেখা বই ‘একাত্তরের জননী’তে লিখেছেন নিজের জীবনের অনেক কথা। নিজের লেখা বই ফেরি করে দু-বেলার খাবার জোগান তিনি। ৭২ বছর বয়স হয়েছে তবুও সংগ্রাম শেষ হয়নি তাঁর। এখনো যেদিন বই বিক্রি হয়, সেদিন খান। না হলে সেদিন না খেয়েই কাটে তাঁর। একাত্তরের জননী, স্বর্গে আমি যাবো না সহ লিখেছেন ১৭টি বই। সেগুলোই ফেরি করেন। তাঁর সংগ্রামের কথা জানে এখন প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষ। একাত্তরের পরে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে বেঁচে আছেন আজও। ‘লিখবো আমি লিখবোই’ মন্ত্রে আজো লিখে যাচ্ছেন নিজের কথাগুলো। অনেকেই সহায়তা করতে চেয়েছে, কিন্তু তিনি নেননি। তিনি বলেন, সাহায্য লাগবে না, বরং সবাইকে বলেছেন, আমার বই কিনেন তাতেই আমার চলবে।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে বলেন, আমার কাছে লিস্ট চাইলে আমি লিস্ট দিবো, এই কয়টা যুদ্ধাপরাধী না। অনেক আছে। সবার বিচার করতে হবে।

আজ ৪২ বছর পরে মনে প্রশ্ন জাগে আসলেই আমরা স্বাধীন? আসলেই কি আমরা দিতে পেরেছি সেই সমাজ, যেই সমাজের স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন রমা চৌধুরী। হারিয়েছেন সব কিছুই। আজো সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে দেশ। আজো নারীকে ‘তেঁতুল’ বলে অপমান করে সেই প্রেতাত্মাগুলো। না, আজো স্বাধীনতার নামটুকু ছাড়া কিছুই পাইনি আমরা। দিতে পারিনি কিছুই রমা চৌধুরীকে।
মা, আপনি লিখে যান। এই সমাজের প্রথার ভিত্তিগুলো নাড়িয়ে দিন। আমি আজ রমা চৌধুরীর মত চিৎকার করে বলতে চাই, এমন স্বাধীনতা আমি চাই না, যে স্বাধীনতা আজো ভিখারীর মুখে অন্ন জোগাতে পারে না। ধর্ম ব্যবসাকে বন্ধ করতে পারে না। মা, কোথায় রেখেছো তোমার জুতাগুলো? আজ তোমার সেই জুতাগুলো আমাকে দাও। কষে মারি এই সমাজের মুখে। এই সমাজ তোমার জুতা ছাড়া আর কিছুরই উপযুক্ত নয়। মা জননী, তুমিই আমার স্বর্গ। তোমাতেই এই সমাজের স্বর্গসুখের বীজ।

যদি জননীর ত্যাগের একটুও চেতনা তোমাদের মনে থেকে থাকে তবে স্বর্গলোভ ছেড়ে আসো আমাদের এই সমাজটাকেই স্বর্গ বানাই। জননীকে স্বর্গ উপহার দিই। এসো সবাই একসাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলি, হবেই হবে সোনার বাংলা, দুঃখের হবে শেষ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.