পুষ্টি রক্ষার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা

0

লুবনা ইয়াসমিন:

একটি ছবি দিচ্ছি যা এই সপ্তাহে তোলা (২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭)। একটি লবনের কৌটা যা জানালার পাশে খোলা অবস্থায় রাখা থাকে। আমি বিশেষ কারণে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি এই অবস্থা। মনটাই দমে গেল।
তারপর আমি আমার মতন করে ঘরোয়া পরিবেশে যা বলার বললাম। তারা শুনে বললো, আমাদেরকে তো কেউ কোনোদিন এইভাবে বলেনি।

বাংলাদেশ এমন একটি সম্ভাবনার দেশ যেখানে অনেক ক্ষেত্র অব্যবহৃত অবস্থায় বিদ্যমান আছে। এই সমস্থ অব্যাবহারিত ক্ষেত্র গুলোকে সঠিক ব্যবহার ও সমন্বয় এর মাধ্যমে উত্তরণ ও উন্নয়ন সম্ভব। এর জন্য দরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এই রকম একটি ক্ষেত্র হচ্ছে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র।

শাকসবজি চাষ করা ছাড়াও অনেক পুষ্টিকর শাক সবজি ও ফলমূল আনাচে-কানাচে জন্ম হয় যা অনেকের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের কারণে জনসাধারণের মধ্যে এই সমস্ত পুষ্টিকর শাক-সবজি ও ফলমূল খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়নি। যার ফলে আমাদের দেশে অধিকাংশ জনগণ পুষ্টিহীনতায় ভূগছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ গরিব। ৪০% জনগণ বেশি গরিব, তার মধ্যে ১৫%-২৫% অতি দরিদ্র বা আলট্রা পুওর (অতি দরিদ্র বলতে বোঝাচ্ছি যাদের কাছে ১০ ডেসিম্যল জমির কম জমি আছে, কিংবা যাদের বাসায় কোনো কর্মক্ষম পুরুষ নেই)। সারা বছর ধরে তারা তাদের চাহিদার তুলোনায় প্রয়োজনীয় খাবার খেতে পারে না। সাধারণত তারা প্রতিদিন যা খায়, তা হছে কেবল ভাত আর সবজি আর কিছূ শাক আর মাঝে মাঝে প্রচুর কাঁচা বা লাল মরিচ দিয়ে বিভিন্ন রকম ভর্তা। তারা যা খায় তা তাদের নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জন যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। যার ফলে তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। (তথ্য সমুহ আমার এমপিএচ এ রিসার্চ এর থেকে সংগ্রহ- JPGSPH-BRAC University 3rd batch)

কিন্তূ মূলকথা হচ্ছে তারা তাদের নিজেদের কষ্টার্জিত এই সাধারণ খাবার যে পদ্ধতিতে খাচ্ছে তা তাদেরকে আরো অপুষ্টিতে ভোগাচ্ছে। যা সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করলে অনেকাংশে অপুষ্টি রোধ করা সম্ভব। এর জন্য বিদেশী সাহায্যের কোনো দরকার নেই। শুধু দরকার একটু সচেতনতার। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা।

নিম্নলিখিত খাদ্য প্রস্তুত করার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখলে অনেক উপকার পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয়, যা ধনী গরীব সকল পরিবারের জন্য প্রয়োজ্য।

১। খাদ্যপ্রস্তুত করণের প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র ও উপকরণাদি বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

২। সকল ধরনের শাক সবজি ও ফল রান্নার পূর্বে খোসাসহ ধুয়ে নিতে হবে।

৩। ধোয়ার পর যথাসম্ভব খোসাসহ কাটতে হবে। বড় বড় টুকরা করে কাটতে হবে, কারণ ঠিক খোসার নিচে ভিটামিন ও মিনারেলস থাকে।

৪। কাটার পরপরই রান্না করতে হবে বা খেতে হবে। কেটে বেশীক্ষন রেখে দেয়া যাবেনা।

৫। খাদ্যবস্তু যথাসম্ভব ঢেকে রান্না করা উচিত।

৬। খাদ্য দ্রব্য অধিক উত্তাপে প্রস্তুত করা ঠিক নয়। ১০০° সে. উপরে তাপ দেয়া যাবে না।

৭। খাদ্যদ্রব্য পানি দিয়ে রান্না করলে পরিমিত পরিমাণে পানি দিতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি দিয়ে পানি ফেলে দেয়া যাবে না।

৮। চাল পরিমাণমতো পানি দিয়ে রান্না করতে হবে। যাতে ভাতের মাড় ফেলে দিতে না হয়।

৯। অধিক সময় ধরে রান্না করা যাবে না। বেশিক্ষণ ধরে রান্না করলে খাবারের রং, গন্ধ ও পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়।

১০। রান্নার সময় বারবার নারাচাড়া করা ঠিক না।

১১। খাদ্য প্রস্তুতে খুব বেশি মশলা ব্যবহার করা উচিত না।

১২। খাদ্য প্রস্তুতে খাবার সোডা লবন বা সবাদ লবন ব্যবহার করা উচিত না।

১৩। রান্নার পর খাবার ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে।

১৪। খাদ্য কেনার পরপরই যথাসম্ভব পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে হবে। মাছ, মাংস অতিসত্বর ধুয়ে কেটে পরিস্কার করে ভালভাবে পানি ঝাড়িয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়ে রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে। মাছ-মাংসের কোষের ভিতরে পানি থাকলে রেফ্রিজারেটরের ঐ পানি বরফএ পরিণত হয়ে কোষের নাইট্রোজেন নষ্ট হয়ে যায়।

১৫। যতদুর সম্ভব শাক-সবজি ও ফল কাঁচা খাওয়া উচিত এবং টাটকা অবস্থায় রান্না করা উচিত।

১৬। লবনের কৌটা চুলা থেকে দূরে রাখতে হবে। তাপের কারণে লবনের আয়োডিন কাজ করে না। লবনের কাজ শেষ হওয়ার পড় কৌটার মুখ ভাল করে বন্ধ করে রাখতে হবে।

আজকের লেখাটি যারা অল্পসম্পদের অধিকারী তাঁরা তাদের খাদ্যসস্পদের দ্বারা কিভাবে পুষ্টি রক্ষা করে রান্না করলে এবং সেই অনুযায়ী জীবিকা নির্বাহ করলে অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে সেই সম্পর্কে। সঠিক উপায়ে রান্না করে খাবার খেলে অপুষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। আমাদের গরীব জনগোষ্ঠীর জন্য এই সচেতনতাটুকু বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি।

নিয়মগুলো মানলে সকলের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। বিভিন্ন রকম অসুখ থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করবে। ভাতের মাড় কিছুতেই ফেলা উচিৎ না। যদিও বা কেউ মাড় ফেলে খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে না পারেন তবে বাসার কনিষ্ঠ বাচ্চাটিকে সুপ এর মত করে খাইয়ে দিলে শরীরের বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভাতের মাড়কে ভাতের দুধ বলা হয়, যা মায়ের দুধের (সর্বোৎকৃষ্ট খাবার শিশুদের জন্য) সাথে তুলনা করা হয়।

গর্ভবতী মা যদি প্রথম থেকেই এই নিয়ম মেনে চলে আর আমাদের শিশুদের আমরা যদি ঠিকমতোন প্রয়োজনীয় খাবার দেই তাহলে আমাদের নিজেদের যতটুকু খাদ্য সম্পদ আছে, তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকটা অপুষ্টি রোধ সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 209
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    209
    Shares

লেখাটি ৬৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.