ধর্ম-আবেগ-জীবন, সবই যখন নিয়ন্ত্রিত

0

দিলশানা পারুল:

ধর্ম ত্যাগ করেছি বহু আগে। ধর্মীয় আচার পালন আমার কাছে যুক্তি হারিয়েছে বহু আগেই। কিন্তু আমার মা নিয়ম করে নামাজ পড়েন, কোরান পড়েন, সেইটা নিয়ে আমার কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। আমার উচ্চ শিক্ষিত বোন, বিরাট বড় চাকরি করেন, দ্বিতীয় মাস্টার্স করেছেন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, তিনিও নিয়ম করে নামাজ করেন, ধর্মীয় সমস্ত আচার রেওয়াজ পালন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন।
আবার আমারই আরেক বোন হিন্দু একটা ছেলেকে বিয়ে করেছে। তারা কেউই কারো ধর্ম ত্যাগ করেনি। দুইজন মিলে ঈদও করে, পুজোও করে। ওদের ছেলেটা একটু খানি কনফিউজড ওর ধর্ম পরিচয় নিয়ে, কিন্তু পরিবারের ভিতরের চর্চা থেকে তার মনে হয়েছে এইটা নিয়ে আসলে চিন্তা বা দু:শ্চিন্তা কোনোটা করারই খুব বেশি দরকার নাই!

আমার এক বন্ধু অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা নিতে যেয়ে কার্ল মার্ক্স এর লিটারেচার এর সাথে পরিচয় এবং পড়তে পড়তেই সে এখন বামপন্থি এক্টিভিস্ট। কিন্তু সে ধর্মভীরু। আপনি নিজেও এমন অনেক লোকের উদাহরণ দিতে পারবেন যারা একটা সময় নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু এখন ভীষণ রকম ধর্মভীরু। এই্টা কেন? আপনি কি গড়পরতা বলবেন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড? আমরা একই পরিবারের তিন বোন ধর্মকে কেন্দ্র করে তিনভাবে ভাবি। কেন?

তার মানে মানুষের মনস্তাত্বিক জগৎকে আপনি কখনই শুধু সাদা বা শুধু কালো এইভাবে বলতে পারবেন না। সাদা এবং কালোর মাঝখানে একটা ধূসর লাইন বিদ্যমান। যেই লাইনটাকে আপনি সরল যুক্তিতে খণ্ডাতে নাই পারেন, এবং এই ধূসর লাইনকে আপনি আপনার নিজস্ব বোধবুদ্ধির জোরে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গেলে ভুল সিদ্ধান্তে আসাটা অস্বাভাবিক কিছু না। প্রতিটা ব্যক্তির চিন্তা পদ্ধতির পিছনে তার ব্যক্তিগত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা যেমন প্রধান ভূমিকা পালন করে, তেমনি পরিবার এবং সমাজ থেকে পাওয়া/সরবরাহকৃত তত্ত্ব এবং তথ্য অনেক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে ব্যক্তির চিন্তা পদ্ধতি প্রভাবিত করার জন্য।

এখন আসেন মানুষের এই চিন্তা পদ্ধতি কী? চিন্তা পদ্ধতি মানে আপনার মস্তিষ্ক যেভাবে কাজ করে। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে? মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ দুই ভাবে বিভক্ত, ডান এবং বাম অংশে। এই দুই অংশের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানের জন্য মস্তিষ্কে স্নায়বিক কানেকশন থাকে। মস্তিষ্কের বাম অংশের কাজ কার্যকরণ নির্ধারণ করা, যুক্তি তৈরি করা। আর ডান অংশ কী করে? ডান অংশ আপনার সৃষ্টিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে। মানে আপনি কবি হবেন না শিল্পী হবেন, না আঁকিয়ে হবেন, তা মস্তিষ্কের এই অংশ নির্ধারণ করে।

এক কথায় মস্তিষ্কের বাম অংশ ব্যক্তির যুক্তি করার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে আর ডান অংশ ব্যক্তির আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখন আমি বিষয়ভিত্তিকে আসি।
অংক, বিজ্ঞান, যুক্তি এইগুলোর নিয়ন্ত্রক আপনার বাম মস্তিষ্কে আর শিল্প, ধর্ম, প্রেম এইগুলার নিয়ন্ত্রক আপনার মস্তিষ্কের ডান অংশ। মানুষের মস্তিষ্কের দুই অংশ সুষমভাবে সক্রিয় থাকে না। বয়সের সাথে সাথে যে কোনো এক অংশ বেশি সক্রিয় হয় এবং চিন্তা পদ্ধতির নিয়ন্ত্রণ সেই বেশি সক্রিয় অংশ নিয়ে নেয়। তার মানে যার মস্তিষ্কের বাম অংশ বেশি সক্রিয় হবে, তার চিন্তা পদ্ধতি হবে যুক্তিনির্ভর, আর যার মস্তিষ্কের ডান অংশ বেশি সক্রিয় হবে, তার চিন্তা পদ্ধতি হবে আবেগ নির্ভর।

এখন আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই, মস্তিষ্কের কোন অংশ বেশি ভালো ডান না বাম? এর কোনো উত্তর আছে আপনার কাছে? এর কোনো ভালো মন্দ উত্তর হয় না। যদি তাই হয় তাহলে বিজ্ঞান চিন্তার নিয়ন্ত্রক যখন মস্তিষ্কের ডান অংশ এবং ধর্ম চিন্তার নিয়ন্ত্রক যখন মস্তিষ্কের বাম অংশ, তখন আপনি কিভাবে বিচার করবেন কোন চিন্তা পদ্ধতি ভালো অথবা সঠিক? কারণ এই চিন্তা তৈরি হচ্ছে মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ দুই অংশে। ব্যক্তির মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে অথবা চিন্তা পদ্ধতি বিকাশের ক্ষেত্রে নেচার এবং নারচার এর ভূমিকার কথা মোটামুটি সবাই জানি। মস্তিষ্ক যেভাবে কাজ করে এইটা নেচার।

চিন্তা পদ্ধতির ক্ষেত্রে নারচারের ভূমিকা কী রকম? মস্তিষ্ক ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিবেশ এবং প্রকৃতি থেকে ক্রমাগত তথ্য সরবরাহ করে তার কগনেটিভ ডেভলপমেন্ট এর জন্য, এই তথ্যকে স্টিমুলেশন বলতে পারেন। এই যে পরিবেশ, প্রকৃতি থেকে মস্তিষ্ক স্টিমুলেট হওয়ার জন্য ক্রমাগত তথ্য সরবরাহ করছে, এইখানে মানুষ চাইলে সচেতন ভূমিকা রাখতে পারে। তার মানে আপনি যদি শিশু বয়স থেকে মস্তিষ্কে ক্রমাগত আবেগীয় স্টিমুলেশন দিতে থাকেন, তাহলে মস্তিষ্কের বাম অংশ সক্রিয় হওয়ার চান্স বেশি থাকে, কিন্তু সেইটাও কেউ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারে না। কারণ জন্মের সময় সে মস্তিষ্কের কী গঠন নিয়ে এসেছে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেটাকে আমরা বলছি নেচার।

তার মানে একজন মানুষের যদি মস্তিষ্কের আবেগীয় অংশ বেশি সক্রিয় হয় তার ধর্মবিশ্বাসী হওয়ার চান্স বেড়ে যায়। নেচার নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য আমার বা আপনার নাই। কিন্তু নারচার চাইলে আমরা প্রভাবিত করতে পারি। সেইটা কী রকম? ওই যে মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য স্টিমুলেশন হিসেবে যে তথ্য দেবেন সেইটা আপনি যে ধরনের তথ্য দেবেন ব্যক্তির চিন্তা প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব থাকবে।

মোদ্দা কথায় আমি বলতে চাইলাম চিন্তা পদ্ধতি তৈরির ক্ষেত্রে নেচার এবং নারচারের ভূমিকা। একজন ব্যক্তির ধার্মিক হওয়ার পিছনে এই চিন্তা পদ্ধতিই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তার মানে কি এই চিন্তা পদ্ধতি প্রভাবিত করা যায় না? যায়। একটু আগেই যেটা বলার চেষ্টা করেছি। এই চিন্তা পদ্ধতি প্রভাবিত করেই বিজেপি হিন্দু মৌলবাদী সৃষ্টি করে আর জামাত বা হেফাজত মুসলিম মৌলবাদী তৈরি করে।

যার মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশ সক্রিয় বেশি তাকে র্ধমীয় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত করা কঠিন, যার মস্তিষ্কে আবেগীয় অংশ সক্রিয় বেশি তাকে র্ধমীয় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত করা তুলনামুলকভাবে সহজ। ধর্ম আবেগ এবং ধর্ম দর্শন আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার এবং বতর্মানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এমনভাবে প্রোথিত আছে যে একজন ধার্মিক ব্যক্তি যদি মৌলবাদী হোন, আপনি সেই ব্যক্তিকে এককভাবে দোষারোপ করতে পারেন না। ব্যক্তির মনস্তাত্বিক অবস্থান হলো তার চিন্তা পদ্ধতি, পরিবার এবং সমাজে বিদ্যমান সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 662
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    665
    Shares

লেখাটি ২,৫৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.