আমাদের মন ভালো থাকতে নেই কেন?

ফারদিন ফেরদৌস:

প্রাণিকুলের একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক সামাজিক জীব মানুষের মানসিক অবস্থা তিনভাগে বিভক্ত। চেতন, অচেতন ও অবচেতন। যে বিষয়, চিন্তা ও উপলব্ধির ভিত্তিতে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমাদি পরিচালিত হয় তা চেতন; যা সম্পর্কে ব্যক্তি অবগত নয় তা অচেতন আর যা ব্যক্তির মস্তিষ্ক-প্রক্রিয়ায় সঞ্চিত থেকে ব্যক্তির অজান্তেই তার সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে তা অবচেতন।

আমাদের বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় এটা প্রমাণিত যে, সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের সর্বোত ঝোঁক দেখা যায় অবচেতন বা ‘সাব-কনসাস’-এর দিকে। কার্যত মানুষের ঘোষিত বক্তব্য ও কার্যক্রমের তুলনায় তার প্রকৃত কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে স্ববিরোধী করে ফেলছে। এভাবে আমরা আমাদের মানসিক ভারসাম্যকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছি। প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছি পৃথিবীতে আমাদের বিকাশের সর্বোচ্চ রূপ। অথচ প্রাণিজগতে আমরাই একমাত্র বিবেকসম্পন্ন ও কথা বলতে সমর্থ প্রাণি।

আমাদের বিকাশের বড় বাধা আর্থ-সামাজিক বৈষম্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে উঁচুনিচু বিভেদের চেয়েও বড় বৈষম্য নারী ও পুরুষে। দার্শনিক কার্ল মার্কসের মতে, মানুষের চেতনা, আধ্যাত্মিকতা এবং বিচিত্র ধরণের শ্রমের হাতিয়ার ব্যবহার করার ক্ষমতা সবকিছুই হলো সামাজিক শ্রমের ফসল। শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় সকল মানুষ তাদের শারীরিক ও আত্মিক ক্ষমতার পূর্ণবিকাশ ঘটাতে পারে না।

এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমরা বাঙালিরাও প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করি। এবার এই দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য’!
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসকে সামনে রেখে তৈরি করা ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথের (ডব্লিউএফএমএইচ) ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় ভোগেন। তাদের মধ্যে গুরুতর মানসিক সমস্যার জন্য ৮০ শতাংশ কাজ হারান। এসব মানুষ অনুপস্থিতি, কর্মদক্ষতা হ্রাস, কাজে কম মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং মনে রাখার সমস্যায় ভোগেন। কর্মী ছাঁটাই, বেতন নিয়ে অসন্তুষ্টি, সহকর্মীদের অসহযোগিতা, দারিদ্র ও সামাজিক অবস্থান হারানোর ভয়ে কর্মীরা বিষন্নতায় ভোগেন। বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদ সামাল দিতে কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

হিসেবটি কর্মক্ষেত্রের মানসিক অবস্থার পরিসংখ্যান হলেও এই মানসিক সমস্যায় ভোগা কর্মীদের পরিবারও নিশ্চিতার্থেই একইরকম সমস্যায় জর্জরিত হওয়ার কথা। এছাড়া দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হারের সাথে পাল্লা দিয়েও নিশ্চয় বাড়ছে মানসিক বিকারগ্রস্ততা। আর বিকারগ্রস্ততার ভয়াল শিকার শেষ পর্যন্ত নারীরাই বেশি। আমরা কোথায় পাব এমন একজন মানুষ যিনি তাঁর নেতৃত্বের কারিশমা দিয়ে আমাদের সবার মন ভালো করে দেবেন?

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ একধরণের মানসিক দৈন্যদশায় উপনীত হয়েছে। আজও পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, নেত্রকোণার চল্লিশায় সম্পত্তি লিখে না দেয়ায় দুই প্রকৌশলী সন্তানের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বয়োবৃদ্ধ মা। বাধ্য হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ঐ অসহায় মা মাজেদা বেগম। এমন ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক।

আমরা মূল্যবোধ পুরোদস্তুর হারিয়ে ফেলেছি। একপ্রকার মানসিক বিকারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। জীবনের আনন্দকে পায়ে দলে নৈরাশ্য ও হতাশা আমাদেরকে এতটা গ্রাস করেছে যে, এখন শিশুরা পর্যন্ত সহিংস হয়ে হয়ে ওঠছে। সম্প্রতি রাজশাহীর তানোরে শিশুরা তাদের বন্ধুকে কান কেটে, নাক কেটে, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে দাঁত ও বুকের পাজর ভেঙ্গে দিয়ে খুন করে। শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনার এখন আর সীমা পরিসীমা নেই। নিজের পিতৃপ্রবর পুরুষের কাছেও মুক্তি নেই শিশুর। মা কিংবা পিতারা নির্বিকারভাবে হত্যা করছে আপন সন্তানদের। এসবই প্রমাণ করে আমাদের মানসিক অবস্থাটা এখন কোন পর্যায় অতিক্রম করছে।

জার্মান দার্শনিক নিতসে সুপারম্যান বা ‘অতিমানব’-এর কল্পনা করেছিলেন। তাঁর মতে মানুষ নৈতিক শক্তি ও প্রাণশক্তির চরম বিকাশসাধনের মাধ্যমে অতিমানবে পরিণত হতে পারে। আত্মশক্তি বৃদ্ধি ও অগ্রগতিই হল মানুষের অতিমানব হওয়ার সাধনার পদ্ধতি ও লক্ষ্য! অনেকে ধারণা করেন, এই মতবাদে উদবুদ্ধ হয়েই ইতালীতে ফ্যাসিবাদী মুসোলিনি ও জার্মানিতে হিটলারের অভ্যুদয় ঘটে। যদিও ধ্বংসাত্মক ও অকল্যাণকর অতিমানব সৃষ্টি নিতসের চিন্তায় ছিল না। নিতসের দর্শনের অন্তর্নিহিত উদ্দ্যেশ্য ছিল মানুষের চূড়ান্ত কল্যাণকর গঠন ও বিকাশ।

নিৎসের নিগূঢ় দর্শনতত্ত্বের ধার না ধেরে বাঙালিমাত্রই এখন মুসোলিনি ও হিটলারকে গুরু মেনেছে। খাবারে ভেজাল দিয়ে, নকল ওষুধ বাজারজাত করে, গলাকাটা নকল ডাক্তার সেজে সবাই হিরো হতে চাইছে। এখানে হিটলারের শিষ্যরা খাল ভরাট করে দখল করে, ড্রেনে আবর্জনা ফেলে বন্ধ করে দিয়ে বৃষ্টির জলে দুর্বিপাকে ফেলে সাধারণ মানুষকে। অচল নৌকা চালায় মহাসড়কের লজ্জার জোয়ারে। লোভের বর্জ্যে সব নদী এখন কৃষ্ণবর্ন। মাছেদের বড় দুর্বিপাক। বনের গাছ খায় জমি খায় বনখেকোরা। সরকারি ভূমি গ্রাস করে মাটিখেকো। দ্রব্যের মিথ্যাদামে ভোক্তাকে ফাঁসিয়ে দেয় ছ্যাঁচড় কালোবাজারি। যদিও এসব অপরাধপ্রবণতার মূল কান্ডারি প্রধানতই পুরুষ তবু সামগ্রিকভাবেই দিন দিন মানসিক ভারসাম্যহীনতার প্রতীক হয়ে উঠছি আমরা সবাই?

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের দ্য ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ডেভিড জেফেন স্কুল অব মেডিসিনের সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এমেরান মায়েরের নেতৃত্বে একদল গবেষক গবষণা করে দেখিয়েছেন, পাকস্থলী হচ্ছে মানব শরীরের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক। গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলেও এই দ্বিতীয় মস্তিষ্ক শরীরকে সচল রাখতে সক্ষম! গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকস্থলীর ব্যাকটেরিয়া আমাদের ব্যক্তিত্ব পাল্টে দিতে পারে। খাদ্যাভাসের জন্য যে কোনো বয়সী মানুষ বিষন্নতা এবং উদ্বেগে ভুগতে পারেন। পাকস্থলীতে ব্যাকটেরিয়া ভালো থাকলে মানুষ অনেক বেশি ক্ষমাশীল এবং সামাজিক হয়ে ওঠে। একবার ভাবুন তো আমরা হররোজ কী পরিমাণ ভেজাল খাই? কী পরিমাণ অখাদ্য গ্রহণ করি? মনোবিকার ঝেড়ে ফেলে ক্ষমাশীল ও সামাজিক মানুষ হয়ে ওঠবার কোনো উপায় আছে আমাদের?

তার ওপর বৈশ্বিকভাবেই সদাসর্বদা আমরা মগজধোলাইয়ের শিকার হচ্ছি। পুঁজিবাদী মোড়ল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা বরাবর তৃতীয় বিশ্বের মগজধোলাই করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্য দুনিয়া তাদের প্রাচুর্য দেখিয়ে, প্রচার চালিয়ে ওরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে এবং সর্বোপরি বিবিধ প্রকার উৎকোচ দিয়ে অনুন্নত বিশ্বের রাজনীতিবিদ, সমাজবিদ,অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনাবিদ, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মস্তক ধোলাই করে দিচ্ছে, যাতে তারা এমন নীতি গ্রহণ করে যে নীতি এ সমস্ত দেশকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশসমূহের ওপর অর্থনৈতিকভাবে চিরকাল নির্ভরশীল করে রাখে। আর পরনির্ভরতার খেসারত দিতে হয় নারীকেই সবচে’ বেশি।

এমতাবস্থায় যে দেশের নীতিনির্ধারকদেরই মগজের ঠিকঠিকানা নেই সেখানে সাধারণের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। সাধারণভাবে কথা বলার স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা, পারিবারিক জীবনের অধিকার, ফৌজদারি মামলায় সুবিচার পাওয়ার অধিকার, অমানবিক শাস্তি থেকে নিষ্কৃতির নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক কর্মকান্ডের স্বাধীনতা ইত্যাদি মানবাধিকারের পর্যায়ভুক্ত। অনুন্নত, একনায়ক বা স্বৈরাচারশাসিত গোঁড়া কমিউনিস্ট দেশেই মানবাধিকার বেশি লঙ্ঘিত হয় বলে মনে করা হয়ে থাকে। কী গণতন্ত্র চর্চা, কী সেবা আমাদের দেশের মানুষেরাও কি তাদের কাঙ্ক্ষিত মানবাধিকারের ছিটেফোঁটা পাচ্ছে?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মানবকল্যাণবাদ বলে একটি টার্ম আছে। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বাধিক মানুষের সর্বাদিক সুখ বিধান করা যায়, সেই ব্যবস্থা বা ব্যবস্থার দর্শনকেই বলা হয় মানবকল্যাণবাদ। আধুনিক দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম সামাজিক পর্যায়ে মানবকল্যাণবাদ প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ‘সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ’ শ্লোগানটিকে জনপ্রিয় করেছিলেন।

যতদিন না আমাদের রাজাধিরাজরা আত্মস্বার্থ ত্যাগ করে বৈশ্বিক মগজধোলাইয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সুখের বিষয়টি তাদের ভাবনায় প্রাধান্য দিচ্ছেন ততদিন সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবায় দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ফেরানো সম্ভব নয়। নারী ও পুরুষের সমানাধিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সুষম মানবিক উন্নয়নও অসম্ভব। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য বা মন ভালো থাকবার কথা আসবে তারও অনেক পরে।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১০ অক্টোবর ২০১৭।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.