নারীদের নারীত্বের নিরাপত্তা চাই

0

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী:

২১ মাস জেল!
একটু চমকালাম।
নিউইয়র্কের এক সাবেক মহারথীকে আদালত এই শাস্তি দিয়েছে। অপরাধ কী জানার জন্য টিভি স্ক্রলে মনোযোগ দিলাম।
এক কিশোরীকে অশ্লীল মেসেজ পাঠাবার অপরাধে।

এইবার আমি হাসলাম আমাদের দেশের কিছু ব্যস্ত পুলিশদের মতো। আমি তাদের দোষ দিব না। যারা সারাদিন খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে খুন করা কিংবা ধর্ষণের শিকার এবং তার মায়ের মাথা কামিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা অহরহ দেখছে, তদন্ত করছে!

যে দেশে জীবনে গোসল করেছে বলে মনে হয় না, দুর্গন্ধযুক্ত পোষাক পরে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পাগলী নামে খ্যাত মানসিক রুগী মেয়েটির হঠাৎ পেটের আয়তন দেখে প্রমাণ হয় কামুক পশু তার ঐ শরীরটাকেও ছাড় দিচ্ছে না, সেই দেশে কোন কিশোরী বা তরুণী যখন অভিযোগ করে যে, তার টাইমলাইন থেকে কিংবা কোন নিউজ পোর্টাল থেকে ছবি নিয়ে অন্য আইডি প্রোফাইল পিকচার করেছে, তার নামে ফেক আইডি খুলেছে, তাকে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও পাঠিয়েছে কিংবা অপ্রীতিকর মেসেজ পাঠিয়েছে – তখন ঐ পুলিশগণ গুরুত্ব দেবে না কিংবা হাসবে – এটাই স্বাভাবিক।
আমার হাসির কারণও এটা।

কাউকে ছোট করতে লিখছি না। তবে অগোচরে যারা ছোট কাজ করে বেড়াচ্ছেন ডেফিনেটলি তাদের ছোট করেই লিখছি। অশ্লীল মেসেজ দেয়ার অপরাধে একুশ মাস (দু বছরের তিন মাস কম) জেল হলে, এই দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চুপিরুস্তম হয়ে এমন বহু নামি, দামী খ্যাতিমান ব্যক্তিও হয়তো আছেন, যারা চৌদ্দ শিকের আড়ালে থাকতেন!

আর আপন জুয়েলার্স এর কীর্তিমান পুত্র এবং সহোচরদের কি শাস্তি হতো ভেবে দেখেন!
তুফান সরকার? হযরত আলীর সেই ছোট শিশুকন্যার ধর্ষক? রুপার ধর্ষণ ও হত্যার আসামী ঐ কুকুরগুলো? দেশের হাজার হাজার ধর্ষক পশু??

অথচ বাস্তবতা শুধু ভিন্নই না, জঘন্য। এখানে ধর্ষকরা অপরাধী না। ধর্ষিতারা অপরাধী। আপনার আমার মাঝেই লুকিয়ে থাকা সুশীলগণ কী এক অলৌকিক সুবিধার বিনিময়ে পাশা উল্টে দিচ্ছে। ধর্ষকরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে তাদের প্রাপ্য শাস্তি থেকে অনেক দূরে।
নারীর সম্মান এদেশে পানির থেকেও মূল্যহীন।

কিছু নারী লেখক মাঝে মাঝেই চলতি পথে, বাসে মেয়েদের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং কষ্টকর অভিজ্ঞতাগুলো তাদের ভাষায় হবহু তুলে ধরছেন। আমি যারপরনাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, কিছু হাই প্রোফাইল খ্যাত পার্সোনালিটি এদের চটিলেখক বলে গালাগাল দিচ্ছে।

যারা রাস্তাঘাটে ফোনে ম্যাসেঞ্জারে অনায়াসে এসব বলছে, লিখছে, তাদের আমি পিশাচ বলছি না, পশু বলছি না। যারা এটা শেয়ার করছে, তাদের চটিলেখক বলছি? ঘাপটি মেরে থাকা শয়তান গুলোকে ইনডাইরেক্ট মেসেজ দিচ্ছি, “যা খুশি বল!যা খুশি লেখ! পঁচা দুর্গন্ধযুক্ত মনের খায়েস মিটা।”
কেউ কোন অভিযোগ করলে তাকে চটিলেখক বানাবার গুরুদায়িত্ব শিক্ষিত সমাজ নেবে।

আমাদের সরকার ফেসবুক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। ইমো, ভাইবার, মেসেঞ্জার, ভিডিও কল – হরেক এ্যাপস সব এদেশে চলছে। শুধু অনলাইন নিরাপত্তা নাই।

সাইবার ক্রাইম এখন দেশের একটা ভাইটাল সমস্যা। ইন্ডিয়াতে ক্রাইম ইভেন্ট নিয়ে প্রচারিত ঘটনাগুলো সত্য হলে ইন্ডিয়া পুলিশ সাইবার ক্রিমিন্যালদের বিরুদ্ধে ভীষণ সক্রিয়। তারা প্রশিক্ষিত এবং হেল্পিং সব টুলস তাদের আছে।

বাংলাদেশে বেসরকারি বা সরকারিভাবে সাইবার ক্রিমিনালদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া, ভিকটিমের পরিচয় গোপন, নিরাপত্তা দেবার কোনো একটিভ সংস্থার কথা জানা থাকলেও তাদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অপরাধের ভয়াবহ মাত্রার সাথে হয় তারা পেরে উঠছে না, বা তাদের সেইরকম প্রস্তুতি নেই।

পুলিশের একটা আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষিত টিমের পক্ষ থেকে অন্ততপক্ষে প্রতি থানাতে যেন একজন অফিসার পোস্টেড থাকবেন। এবং তাদের ব্যাপক অনলাইন এক্টিভিটিজ থাকবে। যারা চাইলেই হ্যাকার কিংবা এই ধরনের পার্ভার্টেড চরিত্রহীনদের আইডি ব্লকসহ জেল জরিমানা করবেন উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে।

তাহলেই দেশের লক্ষ লক্ষ নারীগণ তাদের ব্যস্ততম কর্মময় জীবনে কিছুটা হলেও নিরাপত্তা এবং স্বস্তি অনুভব করবে।

আমি জানি এমন বৃহৎ কিছু করা আমার ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু এমন নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুন্দর একটা সমাজের স্বপ্ন তো দেখতেই পারি, যেখানে কোন উচ্ছল কিশোরীকে বাসে কানের কাছে মুখ এনে কোন প্রৌঢ় পশু এমন কিছু বলবে না তার সারা জীবনে,যা ভেবে তাকে ঘুমের মাঝেও ঘৃণায় কুঁকড়ে উঠতে হবে !!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 295
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    296
    Shares

লেখাটি ৮৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.