হিতাহিত জ্ঞানশূন্য বিবাহিত পুরুষ ও তাদের অনুগত চিয়ার গার্লস

0

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

ক্রিকেট খেলা দেখার সময় প্রথম যেদিন দেখেছিলাম খেলার মাঠে কিছু মেয়ে উদ্ভটভাবে ক্রমাগত লাফাচ্ছে, বিষয়টা কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ক্রিজে খেলোয়াড়দের খেলার সাথে এদের লাফানোর যোগসূত্রটা মাথায় আসছিলো না। পরে আসল সত্যটা উদঘাটন করলাম যে এদের নাম হলো চিয়ার গার্ল, ক্রিকেটারদের চিয়ার করতে ক্রমাগত লাফাচ্ছে।

ইদানিং দেখছি আমাদের সমাজেও চিয়ার গার্ল এর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।এদের কাজ হল যেসকল পুরুষেরা বিবাহিত জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় অথচ স্বজ্ঞানে বিয়েশাদী করেছে, হয়তো বাচ্চারও জন্ম দিয়েছে কিন্তু নিজ গুনে বউ, বাচ্চা কিছুই চিনতে পারছেনা বা পারার প্রয়োজন বোধ করছে না তাদের কোমল মন কে চিয়ার আপ করা।তারা দিব্যদৃষ্টিতে একজন বিবাহিত হয়েও অবিবাহিতের মতো জীবন যাপনকারী পুরুষের শোক,দুঃখ, হাসফাস, চাপা কান্না একদম নিজ দায়িত্বে শুধু অনুভবই করেনা,তার স্ত্রী কে অসম্মানের হেতু মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারে।
আর সেইসব মহামানবের বউ যদি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন কেউ হয় তাহলে তো কথাই নেই চিয়ার গার্লদের চিয়ারিং আরও বেড়ে যায়।

এই চিয়ার গার্লরা ঐ সমস্ত খানদানী পুরুষের আত্মীয়-পরিজন, বান্ধবী,বন্ধুর বউ, এমনকি প্রেমিকাও হতে পারে। তবে এদের প্রেমিকার আবার রকমফের থাকে যেমন এক্সপি, এফ অর্থাৎ প্রাক্তন প্রেমিকা, বর্তমান প্রেমিকা বা ভবিষ্যতে হবেন করছেন এমন প্রেমিকাও চিয়ার গার্ল এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে একবিন্দু সময় নষ্ট করে না। যদিও দুর্ভাগ্যবশত যে ধরনের প্রেমিকার সাথেই প্রেম গজিয়ে উঠুক, তা মেবি পরকীয়ার আন্ডারে পড়ে যাবে কারণ গুণধর ব্যক্তিটি যে বিবাহিত।

যাই হোক, যে যে উৎস থেকে যারাই চিয়ার গার্ল এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক না কেন এরা সব সময় প্রস্তুত থাকে এই সমস্ত পুরুষকে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা দিতে যেন তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লজ্জা-শরমের মাথা পুরোপুরি খেয়ে ঐ পুরুষদের দুর্নিবার গতিতে এগিয়ে যেতে কোন অসুবিধা না হয়। তারা এই নিষ্পাপ পুরুষের স্ত্রীই যে সকল নষ্টের মূল অর্থাৎ স্ত্রীর কারণেই যে ঐ সব পুরুষেরা সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তা নিজ দায়িত্বে প্রচারের মাধ্যমে প্রসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তা মন থেকে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক।

আর এজন্য তাদের মেয়েটিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনারও প্রয়োজন হয় না। অথচ মেয়েটিকে সর্বদোষে দোষান্বিতা বানাতে কাল বিলম্ব তারা করে না। নিজের জীবনে যে জিনিস মেনে নেয়া দূরে থাক সহ্যই করতে পারবে না তা আরেকজনের জীবনে যখন কোন পুরুষ ঘটায় তা দেখলে ঐ পুরুষের প্রতি তারা কৃতজ্ঞতার নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়া মেয়ে হওয়ার সুবাদে আরেকটি মেয়ের কষ্টের জায়গাটা ঠিক কোথায় সেই বিষয়ে তারা জ্ঞান রাখে এবং সে অনুযায়ী ঝোঁপ বুঝে কোপটা বেশ ভালই মারতে পারে।

কেন তাদের দৃষ্টিতে দায়-দায়িত্ব, কাণ্ডজ্ঞানহীন ঐসব পুরুষেরা বীরপুরুষের তকমা পায় এর সুনির্দিষ্ট কোন কারণ হয়তো থাকে না। একটি কারণ হতে পারে ওইসব পুরুষের প্রতি সীমাহীন প্রীতি আবার এও হতে পারে ঐ পুরুষের দ্বারা একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ে চরমভাবে অসম্মানিত হয়েছে সেটি। আমাদের সমাজে পুরুষের সাথে সাথে কিছু কিছু নারীরও এই সমস্ত মেয়েদের সহ্য করার ক্ষমতা নেই। যে মানুষের যা নেই সেই বিষয়ের প্রতি সহজাত ক্ষোভ থেকেই হয়তো আন্তরিক সমর্থন তারা বিপরীত পক্ষকে দিয়ে থাকে। এতে তাদের এক ধরনের আত্মতৃপ্তিও বোধ হয় কাজ করে।এর মাধ্যমে তাদের মূল্যবোধ যে শূন্যের কোঠায় তা বুঝতে খুব একটা সময় লাগে না। নিজের প্রতি মেয়ে হিসাবে না হোক মানুষ হিসাবে ন্যূনতম সম্মানবোধ থাকাটা বোধ হয় প্রতিটা মেয়ের উচিত, যা এই ধরনের চিয়ার গার্লদের থাকে না।

বিবাহিত, এক/দুই বাচ্চার বাপ ছাড়া যারা প্রেমিক হিসাবে কাউকে পায় না অথচ প্রেমিক ছাড়া যাদের চলেই না সেইসব মেয়ের দৈন্যদশাটা বুঝতে পারছি। কিন্তু এর বাইরেও যারা ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াতে বদ্ধপরিকর হয়ে চিয়ার গার্ল হিসাবে আবির্ভূত হয় সেই বিষয়টা বুঝতে আমি আসলেই অক্ষম। যে সমস্ত পুরুষ নিজের স্ত্রীকে অসম্মান করাকে নিজের পুরুষত্ব প্রমাণের চাবিকাঠি মনে করে আমি তো তাদের পুরুষত্বহীন মনে করি। আর যেসমস্ত মেয়েরা সেখানে সমব্যথী হয়ে আরেকটা মেয়ের অপমানকে বাহবা দেয় আমি তাদের মনুষ্যত্বহীন মনে করি।

তারা একবারও ভাবে না যেসমস্ত পুরুষ নিজের পরিবারের কাছে বিশ্বস্ত থাকতে পারে না, যার কোনো ভাবনায় নিজের স্ত্রী, সন্তানের মঙ্গলের চিন্তা স্থান পায় না, তারা আর যাই হোক অনুপ্রেরণার দাবিদার হতে পারে না। এদের উভয় পক্ষের মানসিক সুস্থতা আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মানসিক বিকৃতি যে বিরাজমান তা প্রশ্নাতীত।

আমি হতবাক হয়ে যাই কোন মেয়েকে অনুপ্রেরণাদানকারীর ভূমিকায় দেখলে। লজ্জায় আমার তখনো মাথা নত হয়েছিল যখন দেখেছিলাম কিছু মেয়ে তাদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ক্রিকেটারদের চিয়ার করতে খেলার মাঠে লাফাচ্ছিল হোক না বাই প্রফেশন, লজ্জায় আমার এখনো মাথা নত হয় যখন দেখি কিছু মেয়ে নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে এই সমস্ত পুরুষকে চিয়ার আপ করার জন্য এদের জীবনের মাঠে লাফায় হোক না বাই ইমোশন।

মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সাথে অন্যায় হচ্ছে দেখে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা না করলে চুপ করে থাকুন, আনন্দ অনুভূত হলে তা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন কিন্তু দয়া করে উৎসাহ দিতে যাবেন না।আপনার উৎসাহ দিতে হয়তো লজ্জা লাগে না কিন্তু তা দেখতে অন্যের লজ্জা লাগে এবং
প্রশ্নও জাগে….
Why are you happy being a cheer girl?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৬,২৬২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.