ধর্ম ও অাফিম: অাস্তিক্য/নাস্তিক্য/মধ্যত্ব-ভণ্ডত্ব নয়

0

ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল:

ধর্ম নাকি আফিমের নেশার মতো? ধর্ম আর আফিমের নেশায় নাকি পার্থক্য নেই? অামরা নাকি আস্তিক? না? তাহলে নাস্তিক?
মানুষের জীবনের হা-হুতাশ, না পাওয়া থেকেই ধর্মের উৎপত্তি….

‘Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people.’

মার্ক্স বলে একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন, যিনি এটি বলেছিলেন, তাই আমার ওপর হামলে পড়ে কোনোই লাভ নেই! যদিও এর সব ব্যাখ্যা পুঁজিবাদের সাথেই সম্পৃক্ত। তারপরেও কথা থাকে। ধরুন, আপনি কোনভাবে নদীতে পরে গিয়েছেন, সাতার জানুন কি না জানুন, প্রবল স্রোতের সাথে অাপনি পেরে উঠছেন না। অথচ বাঁচতে চান অাপনি।
হাতের নাগালের ভেতর যাই পাবেন, সেটা খড়কুটো হলেও, সেটাই আঁকড়ে ধরবেন। আশা করবেন এই খড়কুটোই আপনাকে হয়তো পাড়ে নিয়ে যাবে। এই ’আশা’টিকেই মার্ক্স নামের ভদ্রলোকটি ‘ধর্ম’ বলেছেন। অাফিমের নেশা যেমন কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্বপ্ন দেখায়, অানন্দ দেয়; একটি অন্যরকম পরাবাস্তব জগতের মাঝে নিয়ে যায়, তাঁর ভাষায় সেরকম ধর্মও শোষিত, হতাশাগ্রস্ত শ্রেণির কাছে পরম আশ্রয়; যা তাদের বাস্তব ও অবাস্তবের মাঝামাঝি নিয়ে গিয়ে তারা ‘ভালো’ থাকবে এটা ভাবতে সহায়তা করে। তিনি পুঁজিবাদী সমাজে শোষিত শ্রেণির টিকে থাকার প্রবল সংগ্রামের মাঝে এক টুকরো আলো, আশা হিসেবে ‘ধর্ম’ কে দেখেছেন।

এখন প্রসঙ্গে আসি, আমি আসলে কি? বা বলা ভালো আমরা অাসলে কি? আস্তিক,নাস্তিক? অামার হঠাৎ হিজাব পরা নিয়ে সবাই আঁৎকে উঠেছিল। আলোচনা এবং সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জনগণ দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একভাগ দাবী করেছে যে সবই ভান, অারেক ভাগ দাবী করেছে ঢং এবং স্টাইল!! সবাইকে আমার অভিনন্দন। অামি যে আপনাদের ভাবনার বিষয় এটাও কম কি? আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ আমাকে বলেছে, যে মার্ক্স,ফ্রয়েড ছাড়া কিছুই ভাবতে পারতো না, সে কিভাবে এভাবে হিজাব পড়ে? এটা কি তবে দ্বৈত অবস্থান নয়? ভান নয়?

অাবার অনেকেও বলেছেন যে, ধর্ম যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক চর্চাকেই প্রতিষ্ঠিত করে, তাই সেই পুরুষতন্ত্রকে মাথায় ধারণ (হিজাব) করে নাকি আমি বৈষম্য, অত্যাচার, না পাওয়ার বিরুদ্ধের লেখার যোগ্যতা রাখি না। অথচ অাপনি কিন্তু চাইলেই পারছেন না এই পরিচয় থেকে বের হয়ে আসতে!! নিজের বেলায় সেটা ঢাকা যেমন দেয়া যায়, মানুষের বেলায় সেটা সহজে বলাও যায়!!

অাপনার পরিচিতিতে (নাম) যখন আপনি ‘ধর্মীয়/বংশগত- উপাধি/পদবী=পুরুষতন্ত্র’ (সৈয়দ/চক্রবর্তী/ইসলাম/দাশ) চাইলেই ত্যাগ করতে পারছেন না, তখন অন্যের সমালোচনা করে কি লাভ বলুন? একজন জানালেন যে, তিনি নাকি অনেকদিন আগেই নিজের পদবী বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু জুকারবার্গের কারণে ফেসবুকে পুরো নাম দিতে হয়েছে!! সুধী সমাজ এভাবেই আপনার সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অগনিত জুকারবার্গের মাধ্যমে আপনাকে পরতে পরতে মনে করিয়ে দিবে আপনি কে ও কি…. তবে শুধু আমিই কিভাবে দোষী হলাম?! অথবা আমরা?!

আচ্ছা বলুন তো, এরকম মানুষ আপনার আশেপাশে অসংখ্য খুঁজে পাবেন কিনা যে শুধুমাত্র রোজার মাস আসলেই পরহেজগার হয়ে যান? নামাজ-রোজা শুরু করেন? অথবা যিনি রোজাও রাখেন না, কিন্তু ঈদের নামাজ বাদ দেন না? অথবা কুরবানির সময় বলেন, ’ওহ নো, এটা কেমন ধর্ম, অমানবিক নিয়ম পালন করে?’ আবার খাবার সময় তাদের মাংস না হলেও চলে না? অথবা সারাদিন স্লিভলেস পরে শুধু আজানের সময় সাত তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় টেনে ঢেকে-ঢুকে বসেন এবং অন্যকেও সেই পরামর্শ দেন? অথবা রোজার মাহাত্ম্যকে উৎসবের কাছাকাছি উদযাপনে বহাল করেন বাহারি ইফতারি আয়োজনে? অথবা ৩০ রোজার খবর নেই , কিন্তু ২৭ শে রোজা যেন না রাখলেই নয়!! অথবা নামাজ-রোজার থোরাই কেয়ার, কিন্তু ঘুমাতে হবে পশ্চিমমুখী না হয়ে? অথবা সারাদিন হাতে তজবি হাতে নিয়ে জিকির করে যাচ্ছে, সামনে ক্যাটরিনার রগরগে নাচ, সিরিয়ালের কূটকৌশল আর অন্য ধর্মীয় চর্চায় বৃদ্ধাঙ্গুলি? আফিমের মতোই তো, আমরা হয়তো মুখে বলছি মানি না, কিন্তু কোন এক চেতনায় আমাদের চর্চাতে যেন মিশেই থাকে……

এরকম হাজারটা উদাহরণ দেয়া যাবে যাদেরকে কিনা কোনদিনও কেউ প্রশ্নও করবে না,বলবে না যে আপনি তো ভান করছেন!! কারণ এগুলো আমাদের চোখ সওয়া হয়ে গেছে। যেমন কোন মেয়েকে রোজার দিনে খেতে দেখলেই সবাই ধরেই নেয় যে তার মাসিক হয়েছে, সেইরকম আরকি!!

ধর্ম কিন্তু একটি সাংষ্কৃতিক চর্চাও বটে! আমি বা আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধর্মকে ধারণ করি, নিজেদের অজান্তেই তাকে লালন করি! আমি ছোটবেলায় অনেক প্রশ্ন করতাম ধর্ম নিয়ে; আব্বু বলতেন, ধর্ম নিয়ে নাকি প্রশ্ন করা উচিৎ নয়, এটা বিশ্বাসের বিষয়! তিনি নিজে যে খুব ধার্মিক, তা কিন্তু নয়! তবে কেন বললেন? বা এরকম কথা ছোটবেলায় অনেকেই শুনেছেন, কেন? অামার মা সংস্কুতিমনা একজন, যিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত করেন, তিনি নামাজও পড়েন, কেন? তিনি হিজাব পরেন না, কেন? আমার আকস্মিক হিজাব পরায় তবে তাঁর আপত্তির জায়গাটি কোথায়? অাবার তাঁর সন্তানের সর্বোচ্চ মঙ্গলের জন্য কার কাছে জায়নাজে চোখের পানি ফেলেন? কেন? ঠিক সেই কারনে যে কারণে আমি আকস্মিক একটি কাপড় নিজের শরীরের সাথে জড়িয়েছি। সেই আবেগ থেকেই….. সেই অসহায়ত্ব থেকেই…. কারণ মানুষের হাতে কিছুই নেই, সে চাইলেই অনেক কিছু পারেনা, তাই বিশ্বাস করে ঐশ্বরিক শক্তিতে……… আমি জানি না যে, অামার প্রিয় সন্তান সুস্থ কিভাবে থাকবে; এখন আমি যদি ঐশ্বরিক শক্তিতে বিশ্বাস করে তার সুস্থতা কামনা করি, দোষ কি? জানি অনেক ’আতেল ও সুশীল’ সমাজ আমাকে স্বার্থপর ও ভন্ড বলবেন, তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, মানুষ মাত্রই স্বার্থপর ও মুখোশধারী।

অামাদের এই ’সুশীল’ সমাজ যেমন নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকেন, ঠিক ততটাই ব্যাকুল হয়ে থাকেন ফান্ড পাওয়ার জন্য। তাই নারী নির্যাতন হওয়া বোধকরি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সবাই হারে রে রে বলে ছুটে আসবেন না, সত্য কি সেটা আপনিও জানেন। অামার গবেষণা ও এনজিও সেক্টরে প্রায় আট বছর তো হয়েই গেল। এই ’সুশীল’ সমাজের মানুষের কান্না আমি ভালই চিনি। তারা নিজেরা নিজেদের সরণার্থী বলেন, অাবার দামী দামী জামদানী শাড়িতে মুড়িয়ে থাকেন, দশ পদের খাবার খান, অন্যদিকে পরে থাকে রোহিঙ্গা শরণার্থী, তাদের ট্রমাটাইজ জীবন, বিভীষিকাময় বাস্তবতা। এমনও দেখেছি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত নারী, সুশীল সমাজের সদস্য নিজেই তার নারী কর্মীদের সাথে কী ব্যবহার করেন….। সমস্যা আসলে সমস্যার জায়গাতেই রয়ে যায়, মাঝে আসে কিছু মুখ, মুখোশ, তর্ক, বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা…….. কিছুই পরিবর্তন হয় না!!

সত্যি বলতে কি আমি ধর্ম বুঝি না। জানিও না এর গভীর অর্থ! আমি মার্ক্সবাদীও নয়। ছোটবেলায় আমার বাবা আমাকে রামায়ন দিয়ে শুরু করিয়েছিলেন, তারপর ধীরে ধীরে সবই পড়িয়েছেন। তাই আমার কাছে ঈশ্বর মানে আলো, ঈশ্বর মানে আশ্রয়,আশা…… ঈশ্বর মানে সবচেয়ে ক্ষমতাবান ঐশ্বরিক কেউ, যিনি কিনা চাইলেই আমার সব দুঃখ,না পাওয়াতে হাত বুলিয়ে দিতে পারেন। আমি সত্যিই আমার হা-হুতাশে তাঁর কাছেই আশ্রয় চাইতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। হঠাৎ যখন মনে হয়, আমার হঠাৎ মৃত্যু হলে আমার একমাত্র ছোট্ট ছেলেটার কি হবে? যখন শুধু দু’জনেই থাকি রাতে বাসায়, সেই সময় মৃত্যু হলে ছেলে তো বুঝতেও পারবে না এতো ছোট সে, কী করবে ভেবে অস্থির হয়ে পরি, তখন তাঁর আশ্রয় চাই, বিশ্বাস করতে ভালবাসি যে তিনি হয়তো আমার প্রার্থনা শুনবেন। অন্যের সন্তানের ভয়ঙ্কর অসুস্থতা দেখে যখন নিজের সন্তানের কথা মনে করে অস্থির হই, তখন সেই না দেখা ঈশ্বরই একমাত্র ভরসার জায়গা। এটি প্রতিটি মানুষের কাহিনী। যখন চারিদিকে অস্থিরতা দেখে, তাঁর আশ্রয়ই চায়। অামি জানি না সেই আশ্রয় দেবার জন্য আসলেই কেউ আছেন কিনা, কিন্তু বিশ্বাস করতে ভালবাসি কেউ তো আছেনই। সকলের ঈশ্বরই কিন্তু মঙ্গলের কথাই বলেন…… অতীতেও ঈশ্বর কি মঙ্গলের বার্তাই পাঠানেনি?

ধর্ম বা এই যে বিশ্বাস, অাসলে আমার আপনার দু’চারটা কথায় ঢলে পরার জিনিস নয়। তাই কে কি কিভাবে বিশ্বাস করবে বা চর্চা করবে সেটা নিয়ে অাসলে কথা বললে কথা বাড়বে বৈ কমবে না….. কিন্তু কোন সুরাহা হবে না। তবে অতিরিক্ত সব কিছুই খারাপ, নিজের বিশ্বাস নিজের কাছে রাখাই বাঞ্চনীয়। একেকজনের বিশ্বাস একেক পরিস্থিতিতে তৈরী হয়েছে, ভিন্ন বাস্থবতায় তৈরি হয়েছে। তাই কাউকে অসম্মান করায় কোন বাহাদুরী নেই কিন্তু! অভিজ্ঞ মানুষদের কাছ থেকে অামরা যৌক্তিক আলোচনা, তর্কই আশা করি, ‘ঝগড়া’ বা ‘ত্যাগ করে চলে যাওয়া’ নয়!!

বিশ্বাসী হওয়া প্রকৃতপক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ…… অর্থাৎ অাপনি জেনে-বুঝে সেই মতটি গ্রহণ করেছেন, অবচেতনভাবে ধারণ করেননি। অাপনি আপনার মতে বিশ্বাসী, আরেকজন তার মতে বিশ্বাসী….. দু’জনেই কিন্তু ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্বাসী….. ভিন্ন বাস্তবতায় তাকে ধারন ও লালন করছেন মাত্র। কিন্তু সেই বিশ্বাসে কারও প্রতি অমঙ্গল নিহিত নেই.. অাছে আত্মসংযম…. সেইটাই বড় কথা। আমরা মঙ্গলে বিশ্বাসী হবো, শান্তিতে বিশ্বাসী হবো, প্রতিহিংসায় নয়….ক্রোধে নয় ….।

নৃতত্ত্ববিদ, গবেষক এবং ব্লগার
জার্মানি

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 892
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    896
    Shares

লেখাটি ৩,১৪৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.