আতঙ্ক নয়, বিষয়টি সচেতনতার

0

সালমা লুনা:

ব্লু হোয়েল গেইম নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। রাশিয়ার গেইমার দুই কিশোরী আত্মহত্যা করার খবর ফেসবুকে কিছু নিউজ থেকে প্রথম জানলেও পাত্তা দেই নাই। এরপর অনেকের লেখালেখি অনলাইন পোর্টালে বা নিউজফিডে দেখলেও ভেবেছি এগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া না করাই ভালো। আলোচনা হলে আবার আমাদের কিশোর কিশোরী তরুণ প্রজন্ম হুমড়ি খেয়ে পড়বে।
কিন্তু সেই প্রবাদ যাবে কোথায়?
সেই যে চক্ষু বন্ধ করলেই প্রলয় থেমে থাকে না !
ঠিকই , চক্ষু বন্ধ করে প্রলয় বন্ধ করা যায় না, যায়নি কখনোই !

তাই আমাদের ইচ্ছা না থাকলেও আমরা মাতামাতি না করলেও ওই গেইমের ভয়ানক ঢেউ আমাদের দেশেও এসে লেগেছে। ইতিমধ্যে একজন আত্মহত্যা করেছে। ঢাকারই ক্লাশ এইটের এক কিশোরীর আত্মহত্যার পর এটি এখন সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে। যদিও এই আত্মহত্যা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

কেউ কেউ অবশ্য এসব আলোচনা তুলতেই মানা করছেন। বুঝি, এসবই শংকা থেকে করছেন তারা যেন কেউ কোনভাবেই এই গেইমটির প্রতি আকৃষ্ট না হয়।

কিন্তু এই আলোচনাটা না করাই বোধহয় ভুল হবে ! আমি নিজেও ভুল করেছি। আমিও এইরকম একজন তরুণ এবং কিশোরী সন্তানের মা। আমি ব্যাপারটা জেনেও মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম আমার সন্তানরা এটির খবর জানেনা। ভেবেছি খামোখা জানাতে যাই কেন!
বিদেশি কিছু পত্রিকার সংবাদ পড়ে জানলাম তাদের ছোট বাচ্চারাও এটি জানে কোন না কোনভাবে। এবং ঢাকার ওই কিশোরীর সংবাদ জানার পর পরই একটু ভয় আর কৌতুহল নিয়ে ছেলেমেয়ে দুজনকেই ডেকে এনে বসালাম। তাদের বাবাসহ আলোচনার ভঙ্গীতে কথা তুললাম।

দেখলাম তারা জানে সব।

গেইমের বিষয়ে, আত্মহত্যার কথা, গেইমের ধাপগুলো কেমন, কি কি করতে হয় এবং শেষ পরিণতি পর্যন্ত! ছেলে নেট ঘেঁটে দেখেছে। বোনকে জানিয়েছে। তারা আলোচনা করেছে।
আমি রাগ করিনি। জিজ্ঞেস করলাম আমাকে না বলার কারণ।
তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করেই বললো, এটা জানানোর মতো কি বিষয়! ফালতু গেইম। যা খেললে অন্যের সব কথা শুনতে হবে, হাত ব্লেড দিয়ে কাটতে হবে এবং নিজেকে ছাদ থেকে ফেলে থেঁতলে মেরে ফেলতে হবে এইটা কোন গেইম হলো!
আমি খুব একটা আশ্বস্ত হলাম না। প্রশ্ন করেই যাই-
তোমরা কেন জানলা ? তোমাদের এত আগ্রহ কেন?

ছেলেকে একটু হতভম্ব দেখালো। আম্মু আমাদের কেউ জানার বাদ নাই। সবাই জানে। কেউ যদি বলে জানিনা তাইলে তার প্রবলেম।
মেয়েও তাল দিলো, ভাইয়া তো জানবেই ! আমাদেরি সবাই জানে!

সমস্যাটা হচ্ছে এখানেই !
আমাদের বাচ্চারা সব জানে!

অথচ আমরা ভাব দেখাই তারা ছোট, তারা কিছু জানে না। আমাদের বাচ্চারা যে সব জানে, এটা আমরা অভিভাবকরাই অনেক সময়ই মানতেও চাইনা। আমরা কেন জানি চাই আমাদের বাচ্চারা সারাজীবন অবুঝ বাচ্চা থাকুক। বিশেষ করে বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মা চান তার ছেলেমেয়ে খোকাখুকু হয়েই থাকুক এবং সগর্বেই অনেক সময় বলেনও ও বড় হয়েছে কিন্তু কিছু বোঝে না। এদিকে ছেলেমেয়ে কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের সকল রহস্য জেনে বসে আছে!
এই যে সন্তানের জানার জগত সম্পর্কে অজ্ঞতা বা অজ্ঞতার ভান- এইটি আমাদের দেশের বাচ্চাগুলোর জন্য খুবই অনিরাপদ। এই শিশু বানিয়ে রাখার প্রবনতা সন্তানকে মাদক, পর্ণ বা গেইমে আসক্ত করে তুললেও মা জননী ভাবেন নাহ্, আমার সন্তান তো ছোট তাছাড়া ও এসবের কিছুই বোঝে না।

ব্যস্ততায় ভরা এই জীবনে আমরা বাচ্চাদের সাথে বা বাচ্চারা আমাদের সাথে কতটুকু সময় কাটাতে পারে? কৈশোর থেকে তারুণ্যে যাবার এই দীর্ঘ সময়ে তারা তাদের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চমক আর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।
এই সময়টায় আমাদের সাথে এই চমকপ্রদ পরিবর্তন গুলোর কতটাই বা তারা শেয়ার করতে পারে ? সেই পরিবেশ বা সময়টুকু কি পিতামাতা হিসেবে আমরা তাদের দিই?

প্রশ্নগুলো নিজেদের করলে এই অবস্থায় করণীয় কি হবে তাও অনায়াসেই বোঝা যাবে বলে আমি মনে করি।

আর একটা কমন সমস্যা হলো আমাদের নিজেদের জীবনাচরণ। আমরা নিজেরা যদি বাচ্চাদের সত্যবাদীতা, মানবতা, ধর্মাচরণ, উচিত অনুচিত শেখানোর আগে নিজে শিখতে বা এর চর্চা করতে না পারি তাহলে অবশ্য এই প্রক্রিয়াতে নিঃসন্দেহে আমরা পিছিয়েই পড়বো।
আমরা জানিইনা হয়তো আমাদের কারো গেইম আসক্ত সন্তানটি ইতিমধ্যেই এটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে কীনা। কিংবা খোঁজখবর নিচ্ছে কীনা কীভাবে এই খেলায় অংশ নেয়া যায়।

যারা এই ভয়ঙ্কর খেলাটি খেলবে তারা কেউই তাদের অভিভাবককে জানিয়ে খেলবে না। কিন্তু প্রতিটি অভিভাবকের উচিত বিশেষ করে যাদের সন্তান অনলাইন গেইমে আসক্ত বা খেলতে ভালোবাসে অথবা তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা খেলে তাদের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

গেইমে আসক্ত না হলেও কেউ অতিরিক্ত আগ্রহ থেকে বা লেখাপড়া ও ভালো ফলাফলের চাপ কিংবা পারিবারিক অশান্তির কারণে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়েও এতে উৎসাহী হতে পারে।

তেমন কিছু ধরা পড়লে অভিভাবককে আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে খুব সাবধানে ব্যাপারটি নিজের আয়ত্তে নেয়ার চেষ্টা করা উচিত।
একজন বাবা বা মায়ের চেয়ে আর কেউ ভালো জানে না নিজ সন্তানের মনস্তত্ত্ব। প্রত্যেকেই ভিন্ন মানুষ, তাই একেকজনের সাথে একেক ব্যবহার।
নিজের অভিজ্ঞতাই বলি,
কদিন আগেই দেখি ছেলে খালি ফোন টিপছে তো টিপেই যাচ্ছে। ভাবলাম কারো সাথে চ্যাট করছে। উঁকিঝুকি দেই- বোঝার চেষ্টা করি।
সে লুডু খেলছে !
কদিন চললো অবিরাম।
দেখেশুনে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে বললাম, একেবারে বখাটেদের মতো লাগছে।
এবং সাথে কিছু বকাঝকা ।
তাও থামে না। শেষে বললাম, আমার সবরকম রাইট আছে তোমার হাত থেকে ওই ফোনটা নিয়ে নেয়ার। কিন্তু আমি চাই তুমি ফোন কেড়ে নেয়ার আগেই এই বিশ্রী জিনিস থামাবে।

এরপরেও দুদিন খেলে সে ফোন বন্ধ করে আমার হাতে দিয়ে বললো, থামতে পারছি না। এটা তুমি তোমার কাছে রাখো।
দুদিন পর ফোন নিয়ে গেলো। এরই মাঝে খেলার তাণ্ডবও কমে গেলো।

এই গেইম বিষয়ে ছেলেমেয়েদের বললাম তোমরা কি জানো এই গেইম যে বানিয়েছে তার ক্রিয়েটর ধরা পড়েছে।
তারা জানে ।
তার মাত্র তিনবছরের জেল হয়েছে, জানো?
জানে না।
সে কেন এটা করেছে জানো?
জানে।
সে এটা করেছে কারণ যারা এই গেইম খেলে তারা এই পৃথিবীর গার্বেজ । সে এই গার্বেজ ক্লিন করতে চাচ্ছে। এবং আমাদের কারো এই গার্বেজ হওয়ার ইচ্ছা নাই। ডোন্ট ওরি। – বলে ছেলেমেয়ে রাতের মুভিতে মনোনিবেশ করলো।
অস্বস্তি কি তবুও যায়!

এখন এই ব্লু হোয়েল প্রসঙ্গে আমরা আশা করতেই পারি আমাদের সরকার এই অনলাইনভিত্তিক প্রাণবিধ্বংশী গেইমটির ব্যাপারে কিছু নিশ্চয়ই করবেন। অনেক দেশই করেছে। ইউকে সহ অনেক দেশেই সরকারিভাবে সচেতন করা শুরু করেছে স্কুল এবং অভিভাবকদের। তারা ইমারাজেন্সী ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছে। পত্রিকাগুলো নিউজ করছে সতর্ক করতে। ইনস্টাগ্রাম নাকি ইতিমধ্যেই তাদের ইউজারদের যারা এই গেইম সার্চ করছে তাদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
সুতরাং আমাদের আর এটা ভেবে বসে থাকা উচিত হবে না যে আলোচনা করলেই এটি আরো জেঁকে বসবে।

আতঙ্ক না ছড়িয়ে বরং নিজে সচেতন হয়ে অন্যকেও সচেতন করার কাজটি এখনই শুরু করা উচিত। আরো কেউ আক্রান্ত হওয়া বা আত্মহত্যা করার আগেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ২,২৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.