ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের মরণফাঁদ

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

কত নিশ্চিন্তেই না আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছি নিত্য নতুন ডিভাইস। সাথে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ। ভালোমন্দ বোঝার যথেষ্ট বয়স হওয়ার আগেই তাদের নামে যোগ হচ্ছে ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, হোয়াটস আপ, ভাইভারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাউন্ট। অথচ সেই যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আমাদের সন্তানেরা কী করছে, বিশেষ করে যারা কিশোর কিশোরী, সেটা পুরোপুরি মনিটরিং বা নজরদারি করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

ইন্টারনেট এমনই এক গোলকধাঁধাঁ যার সবগুলো গলির খবর রাখা সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, আমাদের কিশোর কিশোরী সন্তানেরা অনেকেই না বুঝে পথ হারাচ্ছে সেই বিশাল সাম্রাজ্যে। শিকার হচ্ছে নানা রকম প্রতারণার অথবা জড়িয়ে যাচ্ছে কোন ভয়ঙ্কর খেলায়।

এইতো, গত বৃহস্পতিবার জীবন থেকে হারিয়ে গেলো অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা। হলিক্রস স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। বয়স মাত্র চৌদ্দ। ৫ অক্টোবর ভোরে অপূর্বাকে সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আত্মহত্যার কারণ হিসেবে পরিবার থেকে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে একটি গেইমের কথা বলা হয়েছে। শুনে কেমন খটকা লাগে। একটি গেইম কোন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে? সেটা কেমন করে সম্ভব? একটু ঘাটাঘাটি করে যা পেলাম তা ইন্টারনেট চষে বেড়ানো আমাদের কিশোর কিশোরীদের জন্য বেশ বিপদজনকই বটে।

ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী খেলা। এই খেলাটি ডাউনলোড করা যায় না। মানে এটি কোন সফটওয়ার বা এপ্লিকেশন নয়। এটি একটি সোস্যাল মিডিয়া ফেনোমেনা। আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ এর কথা মনে আছে? সেরকমের একটা সোস্যাল নেটওয়ার্ক ভিত্তিক খেলা বা চলমান ঘটনা। বিভিন্ন গোপন গ্রুপ থেকে এই চ্যালেঞ্জটি কিশোর কিশোরীদের সোস্যাল নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ছে।

রাশিয়ার সোস্যাল নেটওয়ার্ক VKontakte থেকে এই খেলাটির শুরু। টার্গেট গ্রুপ হলো টিন এজার বা কিশোর-কিশোরীরা। এই খেলায় ৫০ দিনে একজন কিশোর বা কিশোরীকে ৫০ টি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয় এবং একজন কিউরেটর সেটা মনিটরিং করে। কিউরেটর প্রতিদিন একটি করে অস্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় খেলোয়ারকে। যেমন, একা একা ভয়ের মুভি দেখা বা ছাদের সরু সিলিং ধরে হেঁটে যাওয়া থেকে শুরু করে নিজেকে আঘাত করা, রক্তাক্ত করার মতো ভয়ঙ্কর সব চ্যালেঞ্জ। এবং পঞ্চাশতম দিনের মাথায় কিউরেটর তাকে আত্মহত্যা করতে বলে।

২০১৬ সালের মে মাসে রাশিয়ান পত্রিকা Novaya Gazeta তে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জের বিষয়টি প্রথম সবার নজরে আসে। নভেম্বরে এই খেলার কিউরেটর ফিলিপ বুডেকিন কে গ্রেফতার করা হয়। ২২ বছর বয়সী ফিলিপ সাইকোলজির প্রাক্তন ছাত্র এবং তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো।

২০১৭ সালের মার্চে রাশিয়া কতৃপক্ষ ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের সাথে সম্পর্কিত প্রায় ১৩০ টির মতো কিশোর কিশোরীর আত্মহত্যার তদন্ত চালায়। মে ২০১৭ তে এই রাশিয়ান তরুন নিজের এই ভয়ঙ্কর উদ্যোগ স্বীকার করে নেন এবং বলেন, আত্মহননকারীরা একেকটা জৈবিক আবর্জনা (Biological waste) এবং এই চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে সে সমাজ পরিস্কারের (cleansing the society) কাজ করছে। এবছরের জুলাইতে সাইবেরিয়ান কোর্ট ফিলিপকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।

ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ সোস্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য দেশেও। ইতিমধ্যেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, চিলি, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইতালি, কেনিয়া, সৌদি আরব, আমেরিকাসহ ১৮টি দেশে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ এর কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। অপূর্বার ঘটনা সত্যি হলে এবার এই তালিকায় বাংলাদেশও যুক্ত হলো।

আমি জানি না সত্যি সত্যি ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জই অপূর্বর আত্মহত্যার কারণ কিনা। আত্মহত্যার মাত্র পাঁচদিন আগে ৩০ সেপ্টেম্বরে অপূর্বার ফেসবুক প্রোফাইল ছবিতে মায়ের শাড়ি পরা আনন্দিত সেলফির দিকে তাকালে এই কথা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে এটুকু জানি, কিশোর কিশোরী সন্তানের হাতে কোন দামি ডিভাইস তুলে দেয়ার আগে, তাদের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার অবাধ করার আগে অভিভাবকদের আরো সাবধান হওয়া দরকার। নইলে শুধু ব্লু হোয়েলের মতো মারাত্মক খেলাই নয়, আরো অনেক কদর্য চোরাবালিতে ডুবে যেতে পারে আমাদের সন্তানেরা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 5.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.5K
    Shares

লেখাটি ১৭,৪৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.