নারীর সমালোচনা মানেই শরীর !

0

আসমা খুশবু:

পৃথিবীব্যাপী নারী স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণে অগ্রগতির বহু হিসাব-নিকেশই হচ্ছে। হিসেব করলে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়তো দেখা যাবে। কোথাও কোথাও রাষ্ট্রীয় আইনকানুন এবং নানা অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজে পরিবর্তন হয়তো এসেছে। কিন্তু ‘নারী’ এবং ‘পুরুষ’কে ভিন্ন দাড়িপাল্লায় মাপার সামাজিক মানদণ্ড কতটা পাল্টেছে তা ভেবে দেখার মতো?

কোনো কোনো দেশে একটু ব্যতিক্রম থাকলেও পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এখনো একই কাজের জন্য বা একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য নারীকে পুরুষের চেয়ে কঠোর সমালোচনার শিকার হতে হয়।

নারী, গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে বসে আছেন, কীভাবে অতো বড় পোস্টে আছেন আমরা কি কিছু জানি না ভেবেছেন! হুম! সব জানি। শরীর আর চেহারা দেখিয়ে কুপোকাত করেছেন বসকে, বিভাগীয় প্রধানকে, না হলে অত বড় পদ? প্রমোশন? ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট? অসম্ভব! মেধা বলতে কিছু আছে নাকি মেয়েদের? শুধুই চেহারা, শরীর আর মেয়ে হয়ে জন্মানোর সুযোগ নেয় তাঁরা।

বাদ যাবে না কোন নারী। সবার অবস্থানই এক এক করে প্রকাশ করা হবে। সামিয়া রহমান, উপাচার্যের সোফার হাতলে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বাগিয়েছেন, কাজেই তাকে ভার্চুয়ালি রেপ করা হোক, এই অধিকার দেশের মানুষের আছে এবং এই উপর্যুপরি বাক্যবাণের সাথে ‘প্ল্যাজারিজম’ নামক বিষয়ের কোন সম্পর্ক আছে কিনা তা অন্তত আমার জানা নেই। অবশ্য এইসব আলোচনা, সমালোচনা এবং ব্যক্তি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের কাউকে প্রকৃত সমালোচক মনে হয়নি, তাদেরকে নারী বিদ্বেষী ছাড়া আর কিছু বলা যায় কিনা আমার অন্তত জানা নেই।

এরপরের আক্রমনের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বাল্যবিবাহের শিকার, ডিভোর্সি মেয়ে জান্নাতুল নাঈম এভরিল। তথ্য আড়াল করে সে যে ভুলটি করেছে, সেই ভুল নিয়ে আলোচনায় তার অসততার সমালোচনা না করে, তার চেহারা, শরীর, তার অতীত, তার পরিবার কাউকে ছাড়িনি আমরা। একটি ভুল নিয়ে কথা বলা যেত, তা না করে তাকে যেভাবে ভার্চুয়াল আক্রমণ করা হলো তাতে মেয়েটা যে আত্মহত্যা করেনি এজন্য প্রশংসার দাবিদার। সমালোচনাটা হতে পারতো তার তথ্য গোপন নিয়ে, এমনকি আয়োজকদের অনিয়ম নিয়ে, কিন্তু সেসব না করে মেয়েটির ব্যক্তিগত জীবনসহ তার চেহারা, শরীর কিছুই বাদ যায়নি। একজন নারীবাদী দেখলাম তার চেহারায় নাকি প্লাস্টিক সার্জারি করা এবং এই টাকার উৎস নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই নারী বিদ্বেষমূলক সমালোচনায় নারী, পুরুষ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত কেউ পিছিয়ে নেই।

এরপরের আক্রমণের শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। পুজোর সময় নিজের একটি সিনেমার অভিনয়ের সিঁদুর পরা কিছু ছবি পোস্ট করে সম্প্রীতির আহবান জানিয়েছিলেন তিনি। আর এইখানে শুরু হয়েছে তাকে গালাগালি। কেন এক ধর্মের হয়ে ভিন্ন ধর্মের সাজে সেজেছেন? নিজের দেশে কিছু করতে না পেরে ইন্ডিয়াতে গিয়ে পরিচালকদের শরীর দেখিয়ে কাজ পাচ্ছেন। কী অসাধারণ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ! প্রচণ্ড মেধাবী এই অভিনেত্রী যদিও এসব কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁর এই গাটসকে সন্মান না জানিয়ে পারা যায় না।

আলোচনা, সমালোচনা করার অধিকার সবারই আছে, সেটা পুরুষ আর নারীভেদে ভিন্ন কেন? নারীর একটি ভুল ধরা পরলে সেই ভুল নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে কিভাবে যেন আমরা তার শরীরে চলে যাই। কই, একজন সেলিব্রেটি পুরুষের সমালোচনা করতে গিয়ে তো কোন অপ্রাসঙ্গিক সমালোচনা হয় না! পুরুষতান্ত্রিক
সমাজের নারী – পুরুষ নির্বিশেষে একই মানসিকতা পোষণ করে আর তার শিকার হয় শুধুমাত্র নারী। আর কত শত বছর পরে এর পরিবর্তন আসবে কে জানে! ভার্চুয়ালি শরীর আক্রমণের শিকার পরবর্তীতে কোন নারী হতে যাচ্ছেন এই অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কি আর কিচ্ছু করার নেই!!

এই সমালোচনা কি নারী – পুরুষের জৈবিক ভিন্নতার কারণে, নাকি সমাজব্যবস্থা এই মানসিকতা আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীকে কখনই মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। নারী + পুরুষ = মানুষ, এই বিবেচনাবোধ মানুষের মধ্যে তৈরি হলে হয়তো সেই সুদিন আসবে কখনো, সেই অপেক্ষায়।।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 479
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    480
    Shares

লেখাটি ৯৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.