আত্মকথন ও কিছু মনুষ্যসদৃশের বৈপরীত্য

0

পারভীন সাঁকো:

২০০৫ সাল! ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের তিন তারিখ। এর আগপর্যন্ত সবকিছুই চলছিলো ঠিকঠাক মতো। ঘটনার সূত্রপাত আমার প্রেগনেন্সির শুরুতেই! খবরটা দেয়ার জন্য শাশুড়িকে ফোন করা হলে, ফোনের মধ্যেই লংকা কাণ্ড বাঁধিয়ে দিলেন তিনি। কারণ তার তিরিশ বছরের ধাড়ি ছেলের নাকি তখনো বাবা হওয়ার উপযুক্ত বয়স হয়নি।
এবং তারপর থেকেই শুরু হলো আমার উপর অমানুষিক অত্যাচার! মাতৃত্বকালীন প্রতিটি মেয়ের অনেক স্বপ্ন থাকে অনাগত সন্তানকে ঘিরে, আমারও ছিলো!! আমার স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগেই হত্যা করা হলো নির্মম নিষ্ঠুরতায়।

প্রযুক্তিগত কারণে এখন সবকিছুই আগেভাগে নির্নয় করা সম্ভব হয় বলেই, আমরা জেনে গিয়েছিলাম আমার গর্ভে কন্যা সন্তানের ভ্রুণ! এবং বিয়ের পর সেদিন-ই প্রথম আবিস্কার করলাম মানুষ ভেবে যার গলায় বরমাল্য পরিয়েছিলাম, তিনি আসলে মানুষের মতো দেখতে, ভিতরে তার আস্ত একটা দানব বাস করে।

একটি মেয়ে যখন প্রেগন্যান্ট হয়, তখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সেই মেয়ের স্বামীটির। অথচ সেই সময় আমিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিলাম তার কাছে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, কী নিদারুণ যন্ত্রণার বিষে নীল হয়েছি আমি আর আমার অনাগত সন্তান, তার খোঁজ কেউ রাখেনি!

শুধু অবজ্ঞা আর অবহেলা করেই সে ক্ষান্ত হয়নি। মেয়ের জন্মের তের দিনের মাথায় জানতে পেলাম, আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবির প্রেমে মগ্ন হয়ে আরেকটা নতুন সংসারের স্বপ্নে বিভোর সে!
মাতৃত্বকালীন কোন মধুর স্মৃতি আমার ঝুলিতে নেই। প্রতিবছর এই দিনটিতে অন্ধকার হাতড়ে যখনি কোন সুখ স্বপ্নের সন্ধান করি, প্রতিবার রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হয়ে ফিরে আসি।

গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মেয়ের শারীরিক পরিবর্তনের কারণে চেহারাতেও কিছু পরিবর্তন আসে, এবং এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সেই সময়ের কিছু জটিলতার জন্য ডাক্তার আমাকে দুইবেলা হাঁটতে বলেছিলেন দুইঘন্টা করে।
একা একা হাঁটতে ভালো লাগতো না বলে তাকে বললাম আমার সাথে যাওয়ার জন্য, প্রতিবার-ই কোন না কোন বাহানায় তার অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়ে তার দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে যেতো। এমনি করে কেটে যায় বেশ কিছুদিন। একদিন শাশুড়িকে বললাম, মা আপনার ছেলেকে বলেন আমাকে নিয়ে একটু হাঁটতে যেতে। তার উত্তরে শাশুড়ি বলেছিলেন, প্রেগনেন্সির কারণে আমার চেহারার পরিবর্তনের জন্য আমি তার পুত্রের পাশে বড়ই বেমানান! আমাকে নাকি তার ছেলের তুলনায় বড় দেখায়, তাই আমাকে সাথে নিয়ে বের হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়! সুতারং হাঁটতে হয় একাই হাঁটো!

আসল ঘটনা কিন্তু অন্যখানে। শাশুড়িমাতা আগেই জানতেন, তার ছেলের পরকিয়ার ব্যাপারটা বরং তার তাতে সায় ছিলো, সেই মেয়ে ছিলো ধনীর দুলালী। এরপর আস্তে আস্তে আমার বাসায় আসা বন্ধ করে দিলেন ফ্যামিলির সবাই মিলে, আমার মতো দিনমজুর পুত্র বধুর প্রয়োজন তখন তাদের ফুরিয়েছে। রাজকন্যাসহ রাজত্ব পাবে সেই আশায়।
এমনি করে আটমাস অতিক্রম করেছি। সেই আটমাসের দুর্বিষহ যন্ত্রণাক্লিষ্ট সময়ের সাক্ষী আমার ঘরের চার দেয়াল, আর বিছানা বালিশ!

আমি যেই ডাক্তারকে দেখাতাম, তিনি আমার ডেলিভারির ডেইট দিয়েছিলেন ত্রিশ তারিখ! অথচ আমার অপেরেশন করতে হয়েছিলো চার তারিখ। গর্ভকালীন অনেক বেশি ডিপ্রেশনের কারণে ফ্লুয়িড (পেটের পানি) শুকিয়ে গিয়েছিলো!
সেদিন ছিলো অক্টোবরের তিন তারিখ, সময়টা ছিলো মাগরিবের আগে। সেই সময়টায় কী মনে করে আল্লাহ্‌কে বললাম, হে আল্লাহ্‌ আমি আর সহ্য করতে পারছি না, তুমি আমার বাচ্চাটা সুস্থভাবে আমার কোলে পাঠাও! এই কথা বলে, নামাজ আদায় করে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বেরিয়েছি। তখন জাপান গার্ডেন সিটির কাজ কেবল শুরু হয়েছে। সুতরাং এইদিকটায় বেশ নিরিবিলি থাকায় বেশিরভাগ সময় সেদিকেই হাঁটতে যেতাম!

কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার, আমি সেদিন অবচেতন মনে কলেজ গেটের দিকে চলে গেছি! যেতে যেতে সামনে ঢাকা ল্যাব দেখে থমকে দাঁড়িয়ে কিছু না ভেবেই ডঃ সাইদা আক্তারের চেম্বারে ঢুকে সিরিয়াল দিয়ে বসে আছি। সাইদা আপা আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। সবশেষে আমার ডাক পড়লো! আপা আমার নামটা দেখেই ভীষণ রেগে গেলেন! কারণ আমার প্রেগনেন্সির দুইমাসের সময় তাকেই প্রথম দেখিয়েছিলাম। এরপর আমার শ্বশুরবাড়ির কথামতো তাদের ডাক্তারের কাছেই যেতে হতো।

সেই কারণেই সাইদা আপা রেগেছিলেন। একপর্যায় আপা রেগে গিয়ে বললেন, এতোদিন অন্য ডাক্তার দেখিয়ে এখন কম টাকায় অপারেশন করার জন্যই তার দ্বারস্থ হয়েছি! সেদিন খুব অপমানজনক কথা বললেও কেনো জানি না আমি এতোটুকু অপমানিত বোধ করিনি। হয়তো আমার মেয়েটা এই পৃথিবীর আলো দেখবে বলে!
যাইহোক চেম্বারে ঢোকার পারমিশন পেলাম।
বেডে শুইয়ে পেটে হাত দিতেই আপার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো! তাৎক্ষণিক আল্ট্রাসনোগ্রামের ডাক্তার কল করলেন।সনোগ্রাম করে দেখা গেলো বাচ্চা শুকনায় পড়ে আছে। সেই রাতে অথবা পরের দিন খুব ভোরে অপারেশন না করালে বাচ্চাকে বাঁচানো যাবে না।
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না! কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো, এরা বোধয় টাকার জন্য আগেই অপারেশন করতে চাচ্ছে।

ওখান থেকে বেরিয়ে প্রথমেই ঐ অমানুষটাকে ফোন করলাম, তার ফুরসত মেলেনি আমার ফোন রিসিভ করার! মনকে শক্ত করলাম, ডাক্তারের কথা ভুল প্রমাণিত করার জন্য চেম্বার থেকে বেরিয়ে আটমাসের পেট নিয়ে রাত নয়টার সময় একা একাই ছুটলাম মেডিনোভায়।
ততক্ষণে আমি বুঝে গিয়েছিলাম লড়াইটা আমার একার। এতোটা কষ্ট সহ্য করেও যে বাচ্চাকে নষ্ট করার চিন্তাও করিনি, সেই বাচ্চাটা বাঁচবে না?

মেডিনোভার ডাক্তার আল্ট্রাসনোগ্রাম করে একই কথা জানালেন! আবার সেখান থেকে ডঃ সাইদা আপার চেম্বারে। ওখানে এলে একটা ইনজেকশন আর কিছু ঔষধ দিয়ে বাসায় চলে যেতে বললো।
ততদিনে আশেপাশের সকল মানুষের প্রতি একটা ক্ষোভ আর অভিমান তৈরি হয়েছিলো। তাই সবসময় নিজেকে খুশি রাখার জন্য শপিংয়ে চলে যেতাম! এবং ঘুরে ঘুরে আমার মেয়ের সমস্ত জিনিস কিনে নিয়ে আসতাম। যেনো কেউ আমাকে করুণা না দেখাতে পারে।

যাইহোক বাসায় ফিরে আবার সেই নম্বরে ফোন অনেকক্ষণ রিং বাজার পরে তিনি ফোন রিসিভ করলেন। আমি শুধু বললাম, সকালে অপারেশন না করালে আমাদের বেবিটা বাঁচবে না, তুমি কি সকালে আসতে পারবে? তার উত্তরে সে বলেছিলো, আমার অপরেশন হবে তাতে তার কিছু যায় আসে না।

২০০৫ সালের অক্টোবরের তিন তারিখের রাতটা ছিলো আমার জীবনের দীর্ঘতম রাত! সেই রাতে মুখোশের আড়ালের কিছু মুখ চিনতে পেরেছিলাম। সেই রাতটা পার করেছিলাম মেয়ের জন্য কিনে রাখা জিনিসগুলোকে আঁকড়ে ধরে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায়।

একসময় আমার দুঃস্বপ্নের রাত্রির অবসান ঘটিয়ে ভোরের আলোর দেখা মিললো। নামাজ পড়ে মেয়ের সমস্ত কিছু নিয়ে রওনা হলাম একা, একদম একা!
হসপিটালে যাওয়ার সাথে সাথেই স্যালাইন আর ইনজেকশন পুশ করলো। ডাক্তার আসলেন নয়টায়। এসে ওষুধের লিস্টের সাথে বন্ড সইয়ের পেপারস ধরিয়ে দিলেন। সেদিন ওষুধ আনার মানুষ পেলেও বন্ড সইটা নিজেকেই করতে হয়েছিলো।

দুইটার দিকে অপরেশন থিয়েটারে যখন নিয়ে যায়, সেদিন কেউ ছিলো না অন্তত এইটুকুন বলার জন্য, একটুও ভয় করিস না, তোর পাশে আমি বা আমরা আছি।
অপরেশন শুরুর আগে ডাক্তারকে বললাম, আমি একটা ফোন করতে চাই, আমার কথায় ডাক্তার ভীষণ বিরক্ত হলেন! তারপর কী ভেবে তার ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আবার সেই নম্বর আবার তীব্র এক যন্ত্রণার কষাঘাত! তার ফোন বন্ধ!

ইতিমধ্যে ডাক্তার পেট কাটতে শুরু করেছে! কিছুক্ষণ পরেই তুলার বলের মতো সাদা ধবধবে একটা পুতুল আমার কোলে দিলেন! রক্ত পানিতে মাখামাখি পুতুলটার কপালে যখন আমার ঠোঁট স্পর্শ করলো, মুহুর্তেই পুঞ্জীভূত যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া আত্মাটা শীতল হয়ে উঠলো। ঘড়ির কাটা তখন ৩:২০ এর ঘরে।।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 480
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    484
    Shares

লেখাটি ১,৮৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.