দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া : আমার আশাপূর্ণা স্মরণ

0

যশোধরা রায় চৌধুরী:

না। ঘুমিয়ে থাকতে চাইলেই কে আর থাকতে দিচ্ছে আপনাকে? পুনঃ পুনঃ খুঁচিয়ে তুলবে, উশকে দেবে, আপনার মুখ থেকে কথা বের করেই ছাড়বে। কোনও ঘটনা ঘটার, লেখা বেরুনোর, ছায়াছবি রিলিজ করার ঠিক সাড়ে সাত মিনিট থেকে সাড়ে সাত দিনের মধ্যে যদি আপনি সেটির বিষয়ে একটি “রাজনৈতিক ভাবে সঠিক” অবস্থান না নিতে পারেন, তাহলে তামাদি, প্রতিক্রিয়াশীল নন-এন্টিটি হয়ে গেলেন। আজকাল তাই আমরা ঘুমোই না, দেখি, শুনি, জানি এবং তা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই। বন্ধুবান্ধব পুষ্যিদের বলি তার ওপর কমেন্ট ছাড়তে, লাইক দিতে।

এখানেই থেমে যাওয়া নেই আবার। চাপানের ওপর উতোর দিয়ে আরো আরো স্ট্যাটাস পোস্ট যারা দিলেন, আমার বুদ্ধি বিবেচনা এমনকি কলেজের ডিগ্রির ওপরেও কটাক্ষ করে গালি দিলেন, অথবা আমাকে নতুন কোনভাবে পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট প্রমাণ করে ফেললেন, সেগুলো পড়ে, সেগুলোর ওপর আবার আবার, নতুন নতুন স্ট্যাটাস দিই।

আর, ‘বিদ্বজ্জনেরা’ এই গোটা জিনিশটাকে দেখেন, আর বলেন, “আমরা একটা ডিসকোর্সে আছি”।
আপাতত আমরা এরকম একটি ডিসকোর্সের মধ্যে আছি, বিষয়টি আমাদের চারপাশের, কেননা, মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষের সমস্যা, সুতরাং গুরুত্বের। (এই গুরুত্ব নাকি আবার আপেক্ষিক! কী জ্বালা) সাম্প্রতিক একটি ছায়াছবিতে প্রাক্তন স্বামী স্ত্রীর আবার দেখা হওয়ার গল্প বলা হয়েছে। আমরা জানতাম বিষয়টা জতুগৃহ, ইজাজত ইত্যাদি বহু চলচ্চিত্র-ঘৃষ্ট-পিষ্ট।

কিন্তু তা থেকে যে ডিসকোর্সটা এলো, সেটা কীরকম? সেও বহু কাহিনিতে সন্নিবিষ্ট, যে সব গল্পের বয়স ৫০ বছরের ওপর। নরেন্দ্র মিত্রের অবতরণিকা, অথবা দেহমন? আরো সহজে বললে, সত্যজিৎ রায় কৃত ‘মহানগর’ ছবিতে যে ইস্যুগুলো এসেছিল? ( নরেন্দ্র মিত্রের অবতরণিকাই যে মহানগরের বেসিস, সেটা আশা করি বলে দিতে হবে না!) … সেই, মেয়েদের চাকরি করা বনাম সংসার করা নিয়ে একটি বিতর্ক। সোস্যাল মিডিয়া তোলপাড় করা সে বিতর্কে পক্ষ আপনাকে নিতেই হবে। তুমি কি মলি হতে চাও, না সুদীপা?

এই যে একটি চাকুরিহীন স্ত্রী হবার “সাফল্য” এবং চাকরি করে “অসফল” স্ত্রী হবার তীব্র পোলারাইজড স্টিরিওটাইপ, এমন অসেতুসম্ভব পজিটিভ-নেগেটিভ দ্বৈততাই তাহলে এতো বছর ধরে অর্জন আমাদের? মধ্যে থেকে গেল কত শত চাকরি করা মেয়ে, কত বছর ধরে সংসার ও চাকরি দুইয়ের ব্যালান্স করতে করতে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া মেয়ে। আবার ছায়াছবির কথাই উঠে আসে, ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতার ফাটা চপ্পলে কাজে যাওয়া শুরু, সেই কবে, রুজি-রুটির জন্য, তার বয়স তো এই বাংলাভাগ হওয়ার, পার্টিশনেরই বয়স্ক!

তার ঊনসত্তর বছর পর, এমন একটি বিষয়ও আমাদের ডিসকোর্সের জন্য পড়ে ছিল, শস্যশ্যামলা সুজলা সুফলা অধিগ্রহণযোগ্য ল্যান্ডব্যাঙ্ক এর মতো! সমাজ মেয়েদের চাকরি আর সংসারকে দুটো মেরুতে সেঁটে দিয়ে বলবে, এ দুটোকে মেলানো যায় না। এই কথোপকথন, এই ডিসকোর্স কি আজকের ছিল? এতো লড়াই, এতো পরিশ্রম, ক্ষুরধার একটা রাস্তায় এতো সন্তর্পণ পথচলার পরও আবার নতুন করে শুরু করতে হবে এই কথাগুলো? এতো পথ হেঁটে, এতো জল ঘেঁটে, কী তবে পেলাম!

তাহলে কি এটা একটা রিভার্স প্রসেস? আমরা কি আবার পেছনদিকে হেঁটে যাচ্ছি? নাকি, এটা অবিষয়? যার ফলে পাশাপাশি ঘটে যাওয়া অনেক ধর্ষণ, অ্যাসিড ছুঁড়ে দেওয়া, ইত্যাদির মতো জরুরি বিষয় জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে?

ধরা যাক, আশাপূর্ণা দেবীর লেখাগুলো। আজও কি সেগুলো তাৎপর্যপূর্ণ? গৃহলক্ষ্মী থেকে কুলকলঙ্কিনী হয়ে যাওয়া কত সহজ, একাধিক গল্পে যে কথা তিনি বলতেন? আ ছি ছি বলে সমাজ কীভাবে একটি মেয়েকে দেগে দেয় কুলটার ছাপ্পায়? নাঃ, বলতে পারলে খুশিই হতাম, এসব সে কোন যুগের গপ্পো! এখন আর হয় না, বলতে পারলাম কি? এখনো কি দেখিনি ডিভোর্সি শুনে একটি মেয়ের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া বাড়িভাড়া চাইতে গেলে? দেখিনি অন্য পুরুষের প্রতি সামান্যতম প্রশ্রয় দেখলে পাড়াশুদ্ধ অফিসশুদ্ধ এমনকি পরিবারের ভেতরেও বাঁকা হাসি অথবা প্রচণ্ড ব্ল্যাকমেলিং এর চাপ?

একশো সাত বছর আগে জন্ম তাঁর, সারাজীবন বাংলা পড়েছেন, ইংরিজি উপন্যাস পড়েননি কখনো, জন্ম ইশতক থেকেছেন চার দেওয়ালের ভেতরেই, যেভাবে একটি মেয়ে থাকতো, সেই সময়ের আটপৌরে বাঙালি হিন্দুর বাড়িতে। শহর গ্রাম মফস্বল নির্বিশেষে একটাই সমাজে, ৯০ শতাংশ মানুষ তখন যেভাবে ভাবে, বাঁচে, অন্যদের, থুড়ি মেয়েদের বাঁচতে বাধ্য করে, সেই মাপা চাপা বন্ধ কুয়োটায় (মতান্তরে স্বর্গটায়) বসে তিনি যে লেখাগুলি লিখে চলেছেন তা সেই জগতটারই কথা। ডকুমেন্টেশন। নিপুণ হাতে শুধু লিখে রাখা, কতটা নরক হয়ে যেতে পারে, গৃহলক্ষ্মীদের স্বর্গটা।

১৯৭৬ সালে জ্ঞানপীঠ পাবার আগে, অথবা সেই বছরই পদ্মশ্রী পাবার সময়েও, যখন আশাপূর্ণার বয়স ৬৭ অতিক্রান্ত, আমাদের নজরে সেদিন পর্যন্তই তিনি জনপ্রিয়, কিন্তু একপেশে একটা খুপরির লেখক। কেননা, তিনি ‘মেয়েদের জন্য, মেয়েদের লেখক’। তখন থেকেই চাপা বদ্ধ সংকীর্ণ এক পৃথিবীর গল্পবলিয়ে। কেননা তিনি ঘোষিতভাবেই এক স্ত্রী ও গৃহিণী। কেননা তিনি লেখেন কেবলই মেয়েদের সমস্যা নিয়ে, মেয়েদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। কী বোরিং, তাই না!

আমরা যখন বড় হয়ে উঠছি তখন মা-দিদা-কাকিমা-জ্যেঠিমাদের যে পৃথিবীটা আমাদের আশেপাশে বয়ে যাচ্ছে নদীর মতো, সেই স্রোত এর ভেতরেই যেন আশাপূর্ণার লেখা। যাঁর বইগুলো পাড়ার লাইব্রেরি থেকে এনে পড়েন উপরিউক্ত সেই সব মেয়েমানুষেরাই, যাঁদের গল্প বলছেন আশাপূর্ণা। তাঁরাই মূল স্রোত, আর তাঁদেরই আশা পূর্ণ করছেন তিনি।

আর কে না জানে, এই নদীর স্রোত থেকেই উদ্ধার পাবো বলে আমরা যারা চেষ্টা করে যাচ্ছি মাথা তুলে শ্বাস নেবার, বিদেশি সাহিত্যে, ইংরিজি ফরাসি জার্মান অনুবাদে স্নাত হতে চাইছি নিজেদের মূল স্রোত থেকে “অন্যরকম” প্রমাণ করার চেষ্টায়, সেই মূলস্রোতেরই একজন বলে আশাপূর্ণাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছি খুব। আমরা সেই ছোট বয়সের ছোট চোখ দিয়ে বুঝিনি তো, কেন এক ঝুড়ি মাছের পাশে শুয়ে থাকা মেছুনি রজনীগন্ধার গন্ধ নিয়ে গল্প বলবেন না কেন, জেলখানার কয়েদি তার সলিটারি সেলের ভিজে ভিজে নোংরা দেওয়ালের গল্পই লিখবেন কেন।

অনেক উপরে, নীলাভ জানালার খুপরিটা ছাড়া যার কাছে বড় আকাশ নেই কোন, তার নীহারিকা পুঞ্জ নিয়ে কথা বলা কতটা হাস্যকর হতো।

তখন হয়তো বা, একজন নবনীতা দেবসেন দরকার ছিল, চিনে নিতে। লড়াই করতে। পুরস্কার কমিটিতে তর্ক করে প্রতিষ্ঠা দিতে, যে, আশাপূর্ণা আসলে যে লেখাগুলো লেখেন সেগুলো চাপা লড়াইয়ের গল্প, সেগুলো সাবভার্শান। পরিস্থিতির দলিল তৈরি করে তিনি আসলে বলছেন একটা চূড়ান্ত বাস্তবতার কথা। বাস্তবতা থেকে উদ্ধারের স্বপ্ন বলছেন না সব সময়ে। বরং চাপা গলায় বলছেন, অনুদ্ধারটা এসে দেখে যাও তোমরা। বাস্তবতার ভেতরের অলিগলি, গুপ্তঘাত, নানা রকমের বিপজ্জনক শুঁড়িপথ উন্মোচন করছেন, আপাতদৃষ্টিতে গোলগাল গল্পগুলো বলবার ছলেই। স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়ের শুদ্ধ বৈধব্য যাপন, বনাম, এক রাত্রে স্বামীর সঙ্গেই দেখা হওয়া। স্বামী চলে যান। পরদিন সকালে কুলকলঙ্কিনী বলে দেগে দেওয়া হয় তাকে।

এই ভয়াবহ স্ববিরোধ… এসব গল্পকে তুলে এনেছেন তিনি কী সাবলীলভাবে।
এই গোটা কাজটাকে যারা সেদিন বুঝতে পারিনি, অসংখ্য পেটে-ছুরি-মারা ছোট গল্পে সনাতন বাঙালি হিন্দু সমাজের নানা বিপ্রতীপতা, স্ববিরোধকে তুলে আনার দিকটা পাশে সরিয়ে, ভেবেছি, একটিই ট্রিলজি, “প্রথম প্রতিশ্রুতি-সুবর্ণলতা-বকুলকথা”তেই তিনি শুরু ও শেষ, তাদের যতদিনে বোধোদয় হয়, ততদিনে পরের প্রজন্মের সম্ভাব্য পাঠকদের এক দল পাড়ার লাইব্রেরিগুলোতে তালা লাগিয়ে চলে গেছেন দুপুরের সিরিয়ালের দিকে, আর অন্যদল নিজেদের চাকরি-ক্যারিয়ার আর অসংখ্য অন্যান্য লড়াইয়ের পাশাপাশি শুধু ক্লান্তিহরণ করেন ইংরেজি উপন্যাসে বা সিনেমায়, কখনো বা হিন্দি-ছবিতেও, যেগুলো ভারতে তৈরি, কিন্তু অন্তঃসারে আন্তর্জাতিক।

এর ভেতরে সম্পূর্ণ অপঠিত অনালোচিত হতে থাকবেন আশাপূর্ণা। যিনি নিছক ছোটদের গল্পেও বুনে দিতেন বড়দের কথা, বড়দের ঝগড়া বা হিংসাঘৃণার বিষ কীভাবে চারিয়ে যেতে থাকে শিশুদের জগতেও, সে কথা আনুবীক্ষণিক সূক্ষ্মতায় তুলে আনতেন।

৭০ বা ৮০ দশকের নানা ঢেউ, লড়াইয়ের মুখ আমরা পেরিয়ে এসেছি। সেই সময়ের কতিপয়ের অস্বীকার তবু যদি বা আশাপূর্ণার মতো লেখকের গায়ে লাগলো না তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারটুকু ছিল বলেই, মা-মাসীদের দুপুরের ভাতঘুমের বিকল্প ওই গল্পবইগুলো আর পাড়ার লাইব্রেরিরা ছিল বলেই … চাকুরে মেয়েদেরও ট্রেনে বা বাসে বই পড়ার অভ্যাসটুকুও তখন উল কাঁটা বার করে সোয়েটার বানানোর পাশাপাশিই রমরমে ছিল বলে (এখন আমেরিকা ইউরোপের মেট্রোরেলগুলোতে উঠেই মেয়েরা বই বা ট্যাব খুলে যে পড়তে লেগে যান এ দৃশ্যটা দেখলে ৭০-৮০ দশকের মনকেমন কীভাবে যেন ছেয়ে ফেলে! কোথায় গেল আমাদের বইপড়ার সেই ঝোঁক!) তিনি উপেক্ষিতা হোন এবার সংখ্যাগুরুর দ্বারাই?

এটাই হয়তো রিভার্স প্রক্রিয়া, ব্যাকল্যাশ। ভাবতে ভালো লাগতো যদি বলতাম, না মেয়েদের সমস্যাগুলোই আর আশাপূর্ণার সময়ের মতো নেই। ডিসকোর্সটাই পালটে গেছে। শুধু সমাজের বিনোদন উৎপাদন প্রক্রিয়াটাই না, পাল্টেছে ইস্যুও। অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে সংসার থেকে গৃহলক্ষ্মী খসে পড়ে যাওয়ার বিষয়গুলো। কারণ সে গৃহও নেই, সে লক্ষ্মীর প্রোটোটাইপও নেই।

কিন্তু সত্যিই কি ডিসকোর্স পালটালো, আদৌ? আজও যখন নতুন করে আলোচিত হয় আবার, চাকরি করলে মেয়েদের সংসার জলাঞ্জলি যায় কিনা, তখনই কি নয়, আশাপূর্ণার মতো লেখকের লেখাগুলো নামিয়ে পড়ার সময়? একটি ছোট গল্পে যিনি লিখেছিলেন, এক বধূর স্বামীর মৃতদেহ বাড়িতে আসার পর, স্ত্রী, শোক করবার বদলে, স্বামীর কাছে কে গোপন চিঠি লিখতো, সেটা জানার জন্য মৃতের পকেট থেকে বাড়ির ডাকবাক্সের চাবি খুঁজছে, এমন এক সংঘাতময়, বীভৎস নিষ্ঠুর সত্যের গল্প। সেই আশাপূর্ণা তীক্ষ্ণতায় বিদ্ধ করবেন না এই সামাজিক মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 234
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    237
    Shares

লেখাটি ৬২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.