কৌতুক যেখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে

0

গোলাম কিবরিয়া:

একটি পুরোনো কৌতুক।
বুশ তখন ক্ষমতায়। ডিক চেনি আর জর্জ বুশ দ্য সেকেন্ড বসে ফিসফিস করছিলেন। এসময় সেদিকে যাচ্ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বুশকে দেখে বললেন, ‘তোমরা কী নিয়ে আলাপ করছো?’
জর্জ বুশ বললেন,‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ইরাকে এক লক্ষ লোক আর একজন সাইকেল মেকানিককে হত্যা করবো।’
হিলারী অবাক হয়ে বললেন, ‘সাইকেল মেকানিক! ও আবার কী করলো?’
বুশ একগাল হেসে ডিক চেনির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখেছো, বলেছিলাম না যে এক লক্ষ ইরাকি নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাবে না!’

বাংলাদেশ এমনই এক অঘটন ঘটনার দেশ, যেখানে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের, যে কোনো বিষয়ের কৌতুক প্রাসঙ্গিকতা পায়। সম্প্রতি তুলকালাম বেঁধে যাওয়া ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা’ প্রসঙ্গে এই কৌতুকটি মনে পড়লো।

সুন্দরী প্রতিযোগিতাটি বিতর্কের মুখে পড়েছে সেই মুহূর্ত থেকেই, যখন উপস্থাপিকাকে ডিঙ্গিয়ে সানগ্লাসধারী আয়োজক স্বয়ং এসে বিজয়ী পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন। এই কাজটি উপস্থাপিকার মাধ্যমেও হতে পারতো। আমার বিবেচনায় সেটিই যথাযথ ছিলো, কিন্তু আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়তো কোনো ‘রিস্ক’ নিতে চাননি।
বিজয়ী পরিবর্তনের অভিনব ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর এ নিয়ে শোরগোল কম হয়নি।

সংবাদ মাধ্যমে বিচারকদের কেউ কেউ সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই তাদের হাতে নামের চিরকুট ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এই চিরকুটের নামগুলোই যেন বিজয়ী ঘোষিত হয়, সেই চাপও ছিলো বিচারকদের উপর। সেই চাপ উপেক্ষা করেই বিচারকরা নিজেদের বিবেচনাতে বিজয়ীদের তালিকা প্রস্তুত করেছেন, এমনটিই দাবি বিচারকদের। আর সেই তালিকায় শীর্ষ তিনজনের মধ্যে জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের নাম ছিলো না।

বিচারকদের মধ্যে অন্যতম শম্পা রেজা, সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি সরাসরি সামনে এনছেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে তাকে সুন্দরী প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক প্রতিষ্ঠান অন্তর শোবিজের চেয়ারম্যান স্বপন চৌধুরীর মুখোমুখি করা হয়। সেখানে স্বপন চৌধুরী বিজয়ী পরিবর্তনের বিষয়ে বলেন, ‘একটি ছোট বিষয়কে বড় করে দেখা হচ্ছে।’

শম্পা রেজা সরাসরি সম্প্রচারিত সেই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে স্বপন ভাই নিজেই জানেন, উনি এসে আমাদের কাছে বলেছিলেন জান্নাতুল নাঈমকেই দিতে হবে। কারণ মিস ওয়ার্ল্ড কমিটি থেকে এই কয়েকটি নাম পাঠানো হয়েছে। আমি শুনেছি এটা ওনার কাছ থেকে, কিন্তু আমি যখন আমার মার্কস অ্যাড করছিলাম তখন এনাউনন্সমেন্ট হয়ে গেল…জান্নাতুল সুমাইয়া…..এবং পরবর্তীতে জান্নাতুল নাঈমও ঘোষণা হলো।’

উপস্থাপিকার প্রশ্ন: ‘তার মানে আপনি মার্কস দেয়ার আগেই ঘোষণা হয়ে গেছে? আপনি কী জানেন, অন্য সবার (বিচারক) ক্ষেত্রেও কী একই ঘটনা ঘটেছে?’ উত্তরে শম্পা রেজা বলেন, ‘আমরা তো (বিচারকরা) সবাই এক সাথেই বসে ছিলাম….।’

বিস্তারিত বিবরণে আর না যাই, যারা আগ্রহী এই ইউটিউব লিঙ্কে গিয়ে বাকিটুকু দেখে নিতে পারেন (https://www.youtube.com/watch?v=X9cbUDNmcHo) ।

একজন সংবাদ কর্মী হিসেবে আমি মনে করি আয়োজক প্রতিষ্ঠান অন্তর শোবিজের বিরুদ্ধে শম্পা রেজা (এবং আরো কয়েকজন বিচারক) যে অভিযোগ তুলেছেন, তা গুরুতর। এ অভিযোগ সত্যি হয়ে থাকলে এটি রীতিমতো প্রতারণা এবং দুর্নীতি।

এখানে কমপক্ষে দুটি অপরাধ হয়েছে। এক, যোগ্য প্রতিযোগীকে বাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে অপর একজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। দুই, স্বনামধ্য ব্যক্তিদের বিচারকের আসনে বসিয়ে তাদের মতামত উপেক্ষা করে ফলাফল চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিচারকদের নাম ভাঙ্গিয়ে, তাদের সামনে রেখে, তাদের কাধে বন্দুক রেখে নিজের পছন্দের টার্গেটে গুলি চালিয়েছেন স্বপন চৌধুরী।

এতো বড় একটি অভিযোগ বা ঘটনার পর আমরা সবই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের উপর। তার আগে বিয়ে হয়েছিলো, তথ্য গোপন করেছে—এ ধরনের আপাত: নিরীহ অভিযোগের পাশাপাশি চট্টগ্রামের হোটেল রেইডে তিনি ধরা পড়েছিলেন (যদিও এই বক্তব্যের পক্ষে একজনও কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, তারপরেও এতো নোংড়া একটি অভিযোগ অনায়াসে আমরা তুলেছি), তার চরিত্র ভালো না কিংবা বাবা-মায়ের কাছ থেকে কেন আলাদা থাকতো—ইত্যাতি বিষয়ে ফেসবুক উত্তপ্ত করে ফেলছি।

স্বপন চৌধুরীকে কখনোই আমরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো না, কারণ এই বিষয়টিতে নিষিদ্ধ আনন্দ নেই। বরং আলোচনা বা গালি দেয়ার জন্য আমরা বেছে নেই সুন্দরী জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলকে। ইস্যু হিসেবে আমাদের কাছে এটি অনেক বেশি উপাদেয়।

বহুবার শোনা মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটি গল্প দিয়ে শেষ করছি,
এক প্রতিবেশি দেখলেন মোল্লা নাসিরুদ্দিন বাগানে আতিপাতি করে কিছু একটা খুঁজছেন।
‘কী খুঁজছো হোজ্জা?’
‘ভাই আমার আংটিটা কাল হারিয়েছি, কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না।’
‘তাই নাকি? দাড়াও আমিও খুঁজছি তোমার সাথে।’
দুজন মিলে বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর প্রতিবেশি জানতে চায়, ‘আচ্ছা হোজ্জা বলতো, ঠিক কোথায় আংটিটা হারিয়েছে?’
‘কাল ঘরের ভেতর হঠাৎ করেই হারিয়ে ফেললাম আংটিটা।’
‘ঘরের ভেতর? তাহলে বাগানে খুঁজছো কেন?’
‘আরে, ঘরে কী আলো আছে? যেখানে আলো আছে সেখানেইতো খুঁজবো নাকি?’ হোজ্জার সাফ জবাব।

আমরা সবাই সম্ভবত হোজ্জার যুক্তিতেই চলি। খামোখা স্বপন চৌধুরীকে নিয়ে সময় নষ্ট করবো কেন? সেখানে কি কোনো মজা আছে? সেটি নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করলে মজা পাবো সেটি নিয়েইতো আলোচনা হবে, নাকি!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 434
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    434
    Shares

লেখাটি ২,০০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.