নিজের শরীর থেকে শ্রেণিবৈষম্য ও পুরুষতন্ত্রের দুর্গন্ধটা দূর করুন

0

জিনাত হাসিবা:

শ্রেণীবৈষম্য এবং পুরুষতন্ত্র দুটো বিষয়ই দুর্গন্ধযুক্ত। যেহেতু আমরা এই দুটোর সঙ্গেই বসবাস করি, সুতরাং আমাদের সবার গায়েই এর গন্ধ কম বেশি লেগে আছে। (সবার বলতে সবার, এমনকি আমিও এর ঊর্ধ্বে নই। নিজের গায়ের ঘামের গন্ধ যেমন কালে ভদ্রে পাই, এই গন্ধটাও হাল্কার উপর ঝাপসা নিজের গায়েও পাই আমি। নিজেই নিজেকে শুধরে নেই। এটা অনেকেই করেন, গোসল দেওয়ার মতোন একরকম। কেউ কেউ অবশ্য সুগন্ধী মেখে ঢেকেও রাখার চেষ্টা করেন!

যেহেতু নিজের দোষগুলিও দেখতে পাই, তাই সাধারণত অন্যের গায়ের গন্ধ নিয়ে কাউকে পচাইতে যাই না। শুধু নিজের সাধ্যমতোন কিছু কিছু চর্চা মেইন্টেইন করি, আর টুকটাক লিখি, যাতে এই গন্ধ অন্তত কিছু মানুষের গা থেকে দূর করা যায় (হতে পারে অকারণ স্বস্তি বা আত্মতৃপ্তি, হোক। তাই সই)। সমস্ত ভালো-মন্দ দিক দেখার চেষ্টা করে মানুষগুলো অবস্থান আর বক্তব্যকে বুঝার চেষ্টা করে, তাই অনেক সময় চুপ থাকি, কাউকে আক্রমণ করি না। তবু মাঝে মাঝে কারো কারো ভাষ্যে এই দুর্গন্ধ এতো অসহনীয় ঠেকে যে নাক চাপা দিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে, দম বন্ধ রেখেও সামাল দেওয়া যায় না।

ব্যবসায়িক ইন্টারেস্ট যেখানে আছে সেখানে আমাদের মিডিয়া ক্রমাগত ‘ত্যানা প্যাঁচাবে’ এবং তাদের ‘বলিষ্ঠ’ কন্ঠস্বর তুলে ধরবে, এটা এখন জানা কথা। তারা তাদের এজেন্ডায় থাকছে কারণ তাদের নীতি এখন ব্যবসা। ‘সুন্দরী প্রতিযোগিতা’য় যাদের বিনিয়োগ আছে, তারা মিলে রেজাল্ট নিয়ে পলিটিক্সে নেমেছে, নামবেই। ঐ রেজাল্ট হোক, না হোক, গোল্লায় যায়, পাল্টাক, কী বাতিল হোক, তার খোঁজে আমার কাজ নেই।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না এই তথাকথিত সৌন্দর্য্যের কন্সেপ্ট আর নিম্নমার্গের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সম্বলিত উদ্যোগে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে কেউ দেশের জন্য বিরাট গৌরব বয়ে আনছে। কিন্তু অনেকেই ভাবছেন এটা বিরাট গৌরব বয়ে আনে এবং বাংলাদেশের ‘প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন’ (এটা বলতে উনারা একজন ঘষে মেজে পলিশ করে বানিয়ে নেওয়া কৃত্রিম মানুষ বোঝান, গ্রামের বা দরিদ্র পরিবারের ‘ভুল উচ্চারণে কথা বলা’ মানুষকে তারা বাংলাদেশের ‘সঠিক’ কিংবা ‘যোগ্য’ প্রতিনিধি মনে করেন না)। এই ভাবনাতে তারা সীমাবদ্ধ থাকছেন না। তারা এই মেয়েটির সমস্ত নিউজ পড়ে এবং ভিডিও দেখে যতোভাবে সম্ভব মেয়েটিকে ‘খারাপ’, ‘নষ্ট’, আর ‘দোষী’ সাব্যস্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। এমনকি নারী অধিকার রক্ষা আর প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য এবং প্রকাশভঙ্গিতে এমনতর আচরণের চরম দুর্গন্ধে নিজেকে দুর্দশাগ্রস্ত বলে বোধ হচ্ছে।

তাদের ভাষ্যটা হলো এমন, “সুন্দরী প্রতিযোগিতার আমি বিপক্ষে। কিন্তু মেয়েটা যখন সুন্দরী প্রতিযোগিতায় এসেছে, এর নিয়ম কানুন ওর অবশ্যই মানা উচিত ছিলো। ও বিয়ে মানে কী মানে না সেটা বিষয় নয়। বিষয় হলো ও তথ্য গোপন করে অন্যায় করেছে। ওর শাস্তি হওয়া উচিত।”

এই ভাষ্যটার সাথে এই কথাটার কোনো অমিল পাই না আমি- “পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আমি বিপক্ষে। কিন্তু মেয়েগুলো তো জন্মেছে এই সমাজেই। এই সমাজের সকল সুবিধা গ্রহণ করেই সে বেড়ে উঠছে। সমাজ যেহেতু সে ত্যাগ করছে না, এর নিয়মগুলো তাদের অবশ্যই তাদের মেনে চলা উচিত। নিয়ম ভেঙে আবার সেই সাথে এই সমাজে নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করে এই মেয়েরা খুবই অন্যায় করছে। ওদের শাস্তি হওয়া উচিত”।

কথা তো একই, তাইনা? কী জাদুতে নারী অধিকারে সোচ্চার মানুষ হঠাৎ করে এরকম কট্টরমৌলবাদী ও চরম পুরুষতান্ত্রিক ভূমিকায় মেতে উঠতে পারেন?! এই যদি হয় অবস্থা, কাঁহাঁতক নাক চেপে রাখা যায়?
রীতিমতোন লেখালেখি করেন এমন একজন বলেছেন (নাম জানাতে চাই না), “বিয়ে মানে বিয়ে। নিয়ম পালটানো না পর্যন্ত আপনি চান আর না চান সেটা নিয়মই। আবেগের কোনো স্থান নেই। ১৬ বছর বয়সে একজন নারী সবকিছুই বুঝে। সে আট বছরের বাচ্চা ছিলো না যে তার অমতে জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছে বললেই সেটা সত্যি হবে। ছোটবেলা থেকেই নাকি সাহসী ছিলো। শেখ হাসিনার দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাইলে বিয়ের আগে পালায় নাই কেন?”

এটা একজন নারী অধিকারে সোচ্চার মানুষের ভাষা? “১৬ বছরের একজন ‘নারী'(!) সবকিছুই বোঝে”? সে ‘৮ বছরের বাচ্চা নয়’ বলে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে বললে সেটায় কান দেওয়ার দরকার নেই? তাহলে এই এতো দিন ধরে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ’ আইনে ১৬ বছরের মেয়ের বিয়ের যে বৈধতা দেওয়ার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হলো, তার মানেটা কী রইলো? ইনি নাকি আবার ‘বাল্যবিবাহ’ বিষয়েও ‘লিখেছেন’ এবং সেটা নাকি আলাদা বিষয়! তিনি আরো বলেছেন, “পালিয়ে এসে সে কেমন করে প্রতিষ্ঠা পেলো? চেহারা সাইজ দেখেই বুঝা যায় সে সার্জারি করেছে। এতো টাকা কোথায় পেলো? কার আশ্রয়ে ছিলো? অস্বাভাবিক শুনালেও প্রশ্নগুলো করতে বাধ্য হলাম।”

কী উৎকট দুর্গন্ধ! ঐ পরিবারে থেকে সে কোন দেশ উদ্ধার করতো যে তার না পালিয়ে আর দশটা মেয়ের মতোন মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা উচিত ছিলো বলে মনে করছেন? এ সমাজে পরিবার সবচেয়ে বেশি বাঁধে মেয়েদের, পরিবারই এগিয়ে দিতে সহায়ক হয়। এটা কি দুর্বোধ্য? আর ‘চেহারা সাইজ’ শব্দটা উচ্চারণ করলেন?! আপনিই তো এসব প্রতিযোগিতার

‘যোগ্য’ দর্শক! কেন বলছেন আপনি এর বিপক্ষে?
পরের আক্রমণ, “এতো টাকা কোথায় পেলো”? ইয়ামাহার ব্র‍্যান্ড এম্বাসাডর এর গ্রুমিং এর টাকার অভাব? কেন আপনি ‘বাধ্য’ হয়ে এসব কথা বললেন ভেবে দেখেছেন? চরম পুরুষতান্ত্রিক অস্ত্র ‘চরিত্র হননে’ কেন নামলেন নিজের মনেই একজনকে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করে? কেন মেয়েটা ‘শুয়ে বেড়িয়ে’ কাউকে কনভিন্স করেছে বলে ভাবছেন?

এভ্রিল মেয়েটা আর দশটা মেয়ের চেয়ে ভিন্ন একটা দক্ষতার বলে ইয়ামাহার মতোন একটা কোম্পানির ব্র‍্যান্ড এম্বাসাডর হয়েছে। এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ওকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তার পথ তৈরিতে বিনিয়োগ করবে। এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলি কোনো ধোয়া তুলসী পাতা নয়, তারা তাদের লাভের জন্য এভ্রিলের জয় কিনে নিতেই পারে। কেন ধরেই নিচ্ছেন ওর বিচারের গরমিল কারো সাথে শুয়ে-বসে করে নিয়েছে? তফাৎ কী রইলো আপনার সাথে মৌলবাদী কিংবা ঈর্ষাকাতর পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রের?

এবার শ্রেণীবৈষম্য (বুঝে বা না বুঝে, এ বিষয়ক ধারণা উচ্চ কিংবা শূণ্য যে পর্যায়েরই হোক) থেকে উচ্চারিত কিছু অভিযোগের প্রতিউত্তর উচ্চারণ করি।

অভিযোগ ১. গ্রামের মেয়ে….হাহাহা:
-“গ্রামের মেয়ে ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতায় আসবে কেন?! বন্যেরা বনে সুন্দর। এইখানে শহুরেদের সাথে সে কেন পাল্লা দিবে?!” তাই তো?? কেন ভাই/আপা? গায়ে লাগে কেন? উত্তর নিষ্প্রয়োজন। চোখে সয় না। আত্মায়ও না।

অভিযোগ ২. ক্ষ্যাত:

– মানে ‘মাপ মতোন’ কথা বলতে পারে না, নির্দিষ্ট ঢঙে চলতে পারে না, ‘সঠিক/ট্রেন্ডি উচ্চারণে কথা বলতে পারে না, চট করে সঠিক সময় জায়গামতোন ‘সঠিক/বুদ্ধিদীপ্ত’ (পড়ুন প্রত্যাশিত) রেস্পন্সটা দিতে পারে না- ইত্যাদি?? বেশ বেশ। তাই তো! এ যুগে এমন হলে চলে? উচ্চারণ ঠিক করা কি যার তার কাজ?? সাধনা করেও আয়ত্ত্ব করা যায়না! আর ‘মাপ মতোন’ কথা বলতে পারেনা এইসব আন্সমার্টদের জায়গার কি অভাব? আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কেন আসবে সে?

অভিযোগ ৩. ঠিকমতো বাংলাও বলতে পারে না:

-যারা ইংলিশ বলে অভ্যস্ত বলে বাংলা উচ্চারণ করতে পারে না, তাদের ব্যাপারটা আলাদা। তারা আর যা-ই হোক, আন্সমার্ট না। কিন্তু যে আঞ্চলিক ভাষায় অভ্যস্ত বলে বাংলা উচ্চারণ করতে পারে না, সে অবশ্যই আন্সমার্ট। ওর কেন জায়গা হবে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে? দূর দূর!

অভিযোগ ৪: ও তো অবিবাহিত না, বিবাহিত। তথ্য গোপন করেছে।

-ভুল বলছেন। ও বিবাহিতও না। যেসব সোর্স থেকে আপনারা কথা বলছেন সেসব সোর্স মতেই সে ডিভোর্স করেছে অনেক আগেই। ও কেন লিখবে ‘বিবাহিত’? কী বলেন? ‘ডিভোর্সি’ লেখা উচিত ছিলো, তাই না?

অভিযোগ ৫: বাল্যবিয়ে তো কী হইসে? বিয়ে যে হইসে সে তো লুকাইসে।
– যে নিজের কাছেই স্বীকার করে না তার বিয়ে হয়েছে, যে জানে তার বিয়েটা আইনসিদ্ধ নয়, সে কেন বলবে যে তার বিয়ে হয়েছে?

অভিযোগ ৬: দরিদ্র‍ পরিবার থেকে আসছে সেইটা লুকাইলো ক্যান? ঝামেলা তো আছেই। সৎ সাহস নাই নিজের অবস্থা বলার।
-এইটা বলারই বা কী আছে? হ্যাঁ বলতে পারতো, বললে আপনারা এখন যেমন বলছেন তেমনটাই বলতেন ‘পাব্লিক সেন্টিমেন্ট’কে পুঁজি করছে।

এভ্রিল মেয়েটাকে আমি চিনি না। তার বিয়ে হয়েছে কী হয়নি, ১৬ তে হয়েছে না ২৩শে, নাকি বিয়ে করে বা না করে যোনীতে কারো প্রবেশাধিকার দিয়েছে, তাতে আমার কিছু এসে যায় না। সে সৎ কী অসৎ সেই বিচার করার আমার এখতিয়ার নাই। দুইদিন বাদে এই ইস্যু হাওয়ায় উড়ে যাবে। এভ্রিল হয় অন্য অনেক সুন্দরী প্রতিযোগীর মতোন হারায়ে যাবে, নয় নিজের পরিশ্রম আর সাধনায় অনেক দূর ছড়িয়ে যাবে। কিন্তু আমি এইসব বিভিন্ন আয়োজন আর নিয়মনীতির ছুতোয় নারীকে মিস, মিসেস, শাঁখা (শাঁখা আমার পছন্দ, কিন্তু বিবাহিত বা হিন্দুত্ব বোঝাতে এর ব্যবহারের আমি বিরোধী), সিঁদূর, নাকফুল ইত্যাদির মাধ্যমে বিবাহিত/অবিবাহিত সিল মেরে রাখার সুযোগ জিইয়ে রাখার বিরোধী। যে মাপকাঠিতে এখানে সৌন্দর্য্যের বিচার হয় তার বিপক্ষে আমার অবস্থান। তবু এই।

মেয়েটাকে ঘিরে এইসব বিচ্ছিরি কথার বিপরীতে আমার এই এতোগুলি কথা বলা জরুরি ছিলো। কারণ যে চেহারাগুলি আমি দেখলাম এবং দমবন্ধ করে বাঁচার চেষ্টা করলাম, তাদের গা থেকে শ্রেণীবৈষম্য আর পুরুষতান্ত্রিকতার গন্ধ দূর করার জন্য একটা ভালো রকম গোসলের সনির্বন্ধ অনুরোধ আমি রাখতে চাই।
বিনীত অনুরোধ, গন্ধটা দূর করুন।

৪ অক্টোবর ২০১৭

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 346
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    348
    Shares

লেখাটি ৭১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.