সাংসারিক দায়িত্বের তো কোনো জেন্ডার নেই

0

নাসরিন আজিম মুনমুন:

সমাজে দায়িত্বের কেন জেন্ডার থাকবে? দায়িত্ব থাকবে সবার সমান, স্নেহের কেন জেন্ডার থাকবে? যেমন ছেলের আদর একটু বেশি, এটা কেন? প্রত্যেক সন্তান দুনিয়ায় আসতে তার মা একই কষ্ট পায়, সন্তান মানুষ করতেও সমান শ্রম, একটি ছেলেকে বড় করতে মা-বাবা যে কষ্ট করে, একটি মেয়েকে বড় করতেও আমার মনে হয় সমান কষ্টই হয়, বরং একটু বেশি হয়, তাহলে ছেলেরা মা বাবার সব করবে, কারণ তাদের দায়িত্ব, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে কেন নয়, এটা সমাজের কেমন নিয়ম?

ছেলেটি তার দায়িত্ব পালন করার জন্য মরিয়া, মায়ের অসুখ, বাবার উপর থেকে বোঝা কমানোর, বোনের বিয়ে, ভাইকে পড়ানো, কারণ সে পরিবারের ছেলে, এগুলো তার দায়িত্ব।
মেয়েটি ভাবে, এক সময় তো সে মেয়ে ছিল, অনেক স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু আজ সে বৌ।

মেয়েকে স্কুলে দিয়ে সব অভিভাবক মায়েদের সাথে আমিও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি..সেই সুবাদে অনেকের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে। বেশিরভাগ মায়েরা মাস্টার্স করা, খুব কমই আছে এইচএসসি, কিংবা বিএ পড়া..। আমি খুব অবাক হলাম মফস্বলে এখন কিন্তু মেয়েরা পড়ালেখায় ভালোই এগিয়েছে।

যাক..আমি এখানে ভিন্ন প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাচ্ছি-এই সব মায়েরা বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে কেউ গাছের নিচে, কেউ বেঞ্চে বসে, কেউ হেঁটে সময় কাটান, কয়েকজন মিলে ছোট ছোট গ্রুপে করে গল্প করেন..।

আগে এই ধরনের গ্রুপ দেখলে মনে হতো এদের কী খেয়ে দেয়ে কাজ নেই! কিন্তু না অনেকেই আছেন, এদের মধ্যে যারা বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাবেন বলেই ঘর থেকে বের হতে পারেন। স্কুলে কাটানো দুই-তিন ঘন্টা যেনো অবাধ স্বাধীনতা তাদের কাছে। যে যার মতো করে গল্প করছে, খিলখিল করে হাসছে যেনো ১৪-১৫বছর বয়সে কিশোরীরা যেমন প্রাণ খোলা হাসি হাসে তেমন।

আমার খুব কষ্ট হয় যখন শুনি, কোনো নারী বলে, ভাবী প্রতিদিন শ্যাম্পু করতে পারি না, কারণ শ্যাম্পু করলে সময় বেশি লাগে..বাসার সবাই বিরক্ত হয়।

কী অদ্ভুত! অন্যকে খুশি করার তাগিদে এরা যেনো নিজের যত্ন করতে ভুলে গেছে। সংসারের সব কাজের ফাঁকে স্কুলে কাটানো সময় যেনো একটু অবসর। আর প্রাণ খুলে কথা বলার সময় দেখি কারো কোনো অভিযোগ নেই। বেশিরভাগই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কিছু করে না, কারণ বাচ্চাটাকে রাখার কেউ নেই, কিংবা সংসারের সবকিছু তাঁকে একা করতে হয়। যদিও সংসারে সদস্য সংখ্যা ২৪ জন, যৌথ সংসার। তার মাঝেও যেনো সব দায়িত্ব বাড়ির বউ এর।
তাই স্কুলে আসার পর এই সময়টুকু যেনো সম্পূর্ণ তাঁর নিজের, অথচ এর মাঝেও বুঝে নিচ্ছে বাচ্চাকে কীভাবে আরেকটু ভালো করে পড়ানো যায়! ভাবতে অবাক লাগে যে, আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে তো আমার মাও আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত। কত স্বপ্ন বুনতো আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে!

কিন্তু আজ আমিও একই কাজ করি। বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাই, তাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনি।
কিন্তু আমার সন্তান কি আমার স্বপ্ন পূরণ করবে? নাকি সেও তার সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে?
এভাবে কত যে সুন্দর ফুল আমাদের অজান্তে ঝরে পড়ে, আমরা টেরও পাই না।

আমি চাই না আমার সন্তান তার জীবনটা পার করুক এই কঠিন রূঢ় পরিবেশে..
তাকে যেনো অপেক্ষা করতে না হয়, বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে স্বাধীনতা ভোগ করার আনন্দের।

কত প্রতিভা যে চাপা পড়ে সংসারের কাজের নিচে, কত শিক্ষিত মায়েরা যে ত্যাগ করে নিজের ক্যারিয়ার ভাবনা।
ফুটন্ত ফুলের সুন্দর গোলাপ গাছগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে রেখে দেওয়া হয়েছে।
গাছ আছে, তবে অবহেলা আর অযত্নে কেমন জানি নিস্তেজ হয়ে গেছে। অথচ একটু যত্ন করলেই এই গাছ হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে।
কিন্তু সবাই অনেক ব্যস্ত।! কে নেবে কার যত্ন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,২৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.