আমরা কেবল তামাশাই দেখে যাই

0

সালমা লুনা:

মিথ্যাচারকে উৎসাহিত করতে আমাদের জুড়ি নাই। যদিও আমরা যুধিষ্ঠিরের বংশধর নই। কোনোকালেই যুধিষ্ঠিরের সাথে আমাদের কোনরূপ সংশ্রবও ছিলো না। তাই বলে নীতির প্রশ্নেও নারী নারী বলে ভ্যানতাড়া করতে হবে কেন? নারীর জন্য কি নীতিহীনতা হালাল? এদিকে আবার এক নারীর জন্য নীতিহীনতায় নিমরাজী হলে যদি অন্য নারী বা নারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবে নারী নারী বলে ধুয়া তোলাটাও আর কার্যকর থাকেনা আরকি।

এই নীতিহীনতা এমন ক্ষতিই করে যে, তা হলো নীতিহীনভাবে যেদিন আপনার গলায় কাছা বেঁধে টেনে নিয়ে যাবে, সেদিন আমি আর নীতির কাহন গাইতে পারবো না।
এদেশে নারীর সাথে কোন একটা ঘটনা ঘটলেই ঘটনাটি আর একলাইনে থাকে না। এটি তার ট্র্যাক হারিয়ে চতুর্মুখী হয়ে একেকটা রাক্ষুসে মুখ বাড়িয়ে মূল ঘটনাকেই গিলে নেয়।

প্রতিবাদ যদি করতেই হয় তবে মিথ্যাচারকে উৎসাহিত করতে নয়, মূল ঘটনাটির করা দরকার, যার জন্য মিথ্যা বলতে হলো। এমনকি সেটি করতে হলে যদি অনেক বড় কোনো প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করতে হয়, কোন কেউকেটার সাথে লড়তে হয় তবুও।

জান্নাতুন নাঈম এভ্রিল। বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার আগে যে দেশীয় সুন্দরী প্রতিযোগীতায় বিজয়ী হতে হয় তাতে ফাইনালে ন’জনকে টপকে মিস বাংলাদেশ হয়েছেন।
হাজার হাজার প্রতিযোগীকে হারিয়ে তিনি দশজনের একজন হয়েছিলেন।
সন্দেহ নেই তিনি সুন্দরী।
তিনি যোগ্যই হবেন।

যোগ্যতাহীন তাঁকে বলা যাবে না।
এসবের আগে অবশ্য তাকে প্রতিযোগিতার শর্ত সব মানতে হয়েছে। শর্ত মোতাবেক ফর্ম পূরণ করতে হয়েছে। যেখানে স্পষ্টই বলা আছে কী থাকা চলবে, আর কী থাকা চলবে না।

সেখানে তাঁর ত্বক, দাঁত, শরীরের কোন অংশের কি মাপ বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দিতে হয়েছে। ভার্জিনিটির প্রমাণ না চাইলেও কর্তৃপক্ষের চাহিদা থাকে কন্যা বিবাহিত হবে না। বাচ্চা জন্ম দিয়েছে বা গর্ভধারণ করেছে এমন কন্যাও অনুপযুক্ত এই প্রতিযোগীতায়।

65 বছরের অধিককাল ধরে চলে আসা এই প্রতিযোগিতার চেয়ারপারসন বর্তমানে একজন নারী।
দ্রুত পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে ক্ষণে ক্ষণে সবকিছু বদলালেও
পৃথিবীর সুন্দরী নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতমাকে বাছাইয়ের জন্য করা এই প্রতিযোগীতার সেই নিয়মের কোন ব্যত্যয় হয়নি। এমনকি একজন নারীর ক্ষমতায়নেও না!
সৌন্দর্যের তীক্ষ্ণতা ও সুক্ষ্ণতার পাশাপাশি বৈবাহিক অবস্থা এবং জরায়ুর নিস্ফলা থাকার বিষয়টা একেবারেই প্রাথমিক একটা ধাপ এবং অন্যতম শর্ত।

যেহেতু এটি একটি বিশ্ব স্বীকৃত প্রতিযোগিতা এবং কল্পনাতীত অর্থের ছড়াছড়ি একে ঘিরে, সেহেতু কিছু অনিয়ম থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু কেউ যখন প্রাথমিক অংশগ্রহণের শর্তটিই ভঙ্গ করে, মিথ্যা তথ্য দেয় স্বাভাবিকভাবেই সে ওই প্রতিযোগীতায় যোগ দেয়ার বা অংশ নেয়ার যোগ্যতা হারায়। আবার বিচারকদের ফল টপকে আয়োজকদের ইচ্ছায় বিজয়ী নির্ধারণও অন্যায় অবশ্যই।
এটি হচ্ছে নীতিগত বিষয়।

এজন্য আবার এদিকে অন্য কনটেস্টটেন্টদের সাথেও সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচার হয়না বলেই ধরা হবে। কেননা 18-24 বয়সসীমার বিবাহিত, ডিভোর্সড বা উইডো এমনকি সন্তানের মা হয়েও অনেক কন্যাই প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়ার মতো যথেষ্ট সুন্দরী হয়ে থাকেন। যারা ইচ্ছে করলেও নিয়ম মেনে বা জেনে এই রকম একটি প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকেন নীতিগত প্রশ্নে।

এভ্রিল ঠিক এই অপরাধেই অপরাধী। তার অপরাধ একটিই যা তিনি ইতিমধ্যে স্বীকারও করে নিয়েছেন যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেটি হলো তাকে বাল্যবিবাহের শিকার হতে হয়েছে। এবং মাত্র তিনমাসের মাথায় তিনি ওই অবস্থা থেকে পালিয়ে গেছেন। পালিয়ে গিয়ে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন।
যা অনেকেই পারেনা।

এভ্রিল না পালালে এখন তার কোলে একটি শিশু অবশ্যি থাকতো। কুড়ি বছরেই তার স্বপ্নসাধের সমাধি হতো। শুধু সুন্দরীশ্রেষ্ঠা হওয়া ছাড়াও তার আরো একটি পরিচয় আছে তিনি বাইকার এবং একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ব্রান্ড এম্বাসেডর।
আমি জানিনা এগুলো কোন পরিচয় কিনা তবে তিনি তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তার মনের মতো করে

– এটিই যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। বাকিটা তার ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই থাকা উচিত।
এভ্রিলের অপরাধ কোনো মারাত্মক অপরাধ নয়। এবং এই পুরো প্রতিযোগিতার বিষয়টিতে তার সহযোগী অনেকেই আছেন।
বরং তারাই মারাত্মক অপরাধ করেছেন।
এভ্রিলের তথ্য গোপনের চেয়েও মারাত্মক সেসব। এবং দণ্ডদানের মতো অপরাধ।
এভ্রিলকে নিয়ে মুখরোচক আলোচনার সুযোগে সেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

আসল অপরাধী আয়োজক প্রতিষ্ঠান। কর্পোরেট বাণিজ্যের ধারক ও বাহকরা কি পরিমান অন্যায় আর সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারেন এবং টাকা ও পেশীশক্তির জোরে রাতকে দিন দিনকে রাত বানান এই ছোট্ট ঘটনাই তার প্রমাণ বহন করে। শোবিজকে কেন্দ্র করে তলে তলে আসলে কি ঘটে সেটিও প্রকাশ্য হলো কিছুটা।
আর আমাদের নমস্য মানুষগুলি! যারা বিচারকের আসনে বসে দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন তারাও কি এই অপরাধে সামিল নন?

তাদের চোখের সামনেই যখন তাদের এতদিনের কষ্টের ফলাফল বদলে যায় তখন তারা চুপ থাকেন কোন স্বার্থে? বিচারকদের আসনে তো নারীর আধিক্যই বেশী ছিলো ! এবং তাদের প্রত্যেককেই তো আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নক্ষত্র বলে জানি আমরা। নারী হয়েও নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায় বসে বসে কি করে দেখতে পারলেন তারা?
তাহলে দেখা যাচ্ছে, যুধিষ্ঠির না হলেও গান্ধারী হবার সুযোগ পেলে- কেউ ছাড়ে না। দ্যূতসভার আনন্দে সামিল হয়েই যায়!

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল বিভাময়ী যে নারী তার নিজের দেয়া রায় পাল্টে গেছে আয়োজকদের ইশারায় – এটি জেনেশুনে মঞ্চে উঠে ভুল বিজয়ীকে মুকূট পরান, তিনি কি নিজেকে শুদ্ধ বলার অধিকার রাখেন? যিনি জীবনের বেশীরভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন এই দেশের সংস্কৃতিকে ভালোবেসে- তাঁর এই পতন কি মানা যায়?
এই ঘটনার অপরাধী তারা কোন যুক্তিতে হবেন না?

অপরাধী ঘোষকও, যিনি নিজেও একজন নারী এবং তথ্য গোপনকারী। মঞ্চে দণ্ডায়মান সন্ত্রস্ত, আবেগে কম্পিত দশটি নারীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তিনিও।
আজ বিকেলে এই প্রতিযোগিতায় জান্নাতুন নাঈম এভ্রিলের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। কর্পোরেট সাইক্লপসরা যখন ভাগ্য লিখতে বসে তখন আশা নিরাশা কিছুই থাকেনা। থাকে শুধু তামাশা।
একটি তামাশা দেখার অপেক্ষায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 300
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    300
    Shares

লেখাটি ১,২১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.