বিশুদ্ধতা আসলে কী?

0

তানিয়া কামরুন নাহার:

ফেবু সয়লাব হয়ে গেল ভার্জিনিটি, সুন্দরী প্রতিযোগিতা আর এভ্রিল বিতর্কে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বারবার ভার্জিনিটি প্রসংগ ঘুরে ফিরে আসছে। মজার ব্যাপার, কাকতালীয়ই হবে হয়তো, এরকম একটি সময়ে আমি একটি ঝরণা ঘুরে এসেছি, যার নাম কুমারী ঝরণা। কেন এই নামকরণ কিংবা কোনো মিথ আছে কি না, তা জানা হয়ে উঠেনি আমার। ঝরণার কাছেই একটি ছোট্ট গোছানো পাথরের মঞ্চ রয়েছে।

বেয়ার গ্রিলস বলেছেন, “প্রকৃতির মধ্যে যখনই আপনি কোন বিশৃঙ্খল দেখতে পাবেন, বুঝে নেবেন আশেপাশে মানুষের বসতি আছে।” এরকম বন্য জায়গায় কুমারী ঝরণার পাশে কৃত্রিম মঞ্চ দেখলেই বোঝা যায় যে, এখানে কুমারী পুজা হয়ে থাকে। 🙂

এই তো কিছুদিন আগেই হিন্দু ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দূর্গাপুজা হয়ে গেল। এ পুজার একটি অংশ হলো কুমারী পুজা। এ পুজায় তাও আবার যেকোনো কুমারীকে পুজা করা হয় না। আরও কিছু বিশেষ গুণাবলী (যেমন, কখনো দেহ থেকে কোনরকমভাবে রক্তপাত হয়নি) সম্পন্ন কুমারীকে পুজা করা হয়। কিন্তু কেন এই পুজার প্রচলন?

পাশ্চাত্য, মধ্যপ্রাচ্য, উপমহাদেশ অর্থাৎ পুরো পৃথিবী জুড়েই ভার্জিনিটির এক রকম পুজা চলে আসছে। ভার্জিনিটি মানেই বিশুদ্ধতা। কিন্তু এ বিশুদ্ধতা শুধুমাত্র নারীর জন্য বাধ্যতামূলক। ইংরেজি ভার্জিন শব্দটি স্ত্রীবাচক, এর কোনো লিংগান্তর হয় না। এই পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবী নারীর জন্য ভার্জিনিটি নামক একটি শেকল তৈরি করেছে। আরবে একটি মেয়ের বিয়ের রাতে স্বামী সাদা রুমাল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে এবং রুমালটি রক্তাক্ত হলে নববধূর পিতা বা ভাই গর্বের সাথে সেই রুমাল সবাইকে উড়িয়ে উড়িয়ে দেখায়। এখনো এ দেশে বিয়ের পর নবদম্পত্তিদের বিছানায় রক্তের দাগ খোঁজা হয়। আর সে দাগ যদি খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে তো প্রলয়কাণ্ড!

যদিও আফ্রিকার কোনো কোনো নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ভার্জিনিটিকে ভালো চোখে দেখা হয় না।সেখানে মেয়েদের বিয়ের আগে উৎসব করে পেশাদার একজন পুরুষের মাধ্যমে ভার্জিনিটি নষ্ট (কিংবা দূষিত রক্ত/আত্না দূর) করা হয়। এরপর মেয়েটি বিয়ের উপযুক্ত হয়। এটিও পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই একটি নিয়ম। নারীর ভার্জিনিটি থাকবে কি থাকবে না, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে পুরুষতন্ত্র।

নারীর এই ভার্জিনিটি নামক বিশুদ্ধতা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আরাধ্য। কিন্তু আবার ভার্জিন নারীর ভার্জিনিটি ধবংস করতে এ সমাজ সদা প্রস্তত। মেয়েদের ইনবক্সে নানারকম অশ্লীল প্রস্তাব, ভাইটাল স্ট্যাট জানতে চাওয়ার পাশাপশি কত অসংখ্যবার যে একটি মেয়েকে শুনতে হয়েছে এই প্রশ্ন, আর য়ু ভার্জিন?

কোনো মেয়ের যৌন অভিজ্ঞতা না থাকাকে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বিশুদ্ধতা নামে অভিহিত করেছে। এই বিশুদ্ধতার পুজা করেছে। কিন্তু নারীকে যুগ যুগ ধরে অরক্ষিত রেখেছে ধর্ষণ থেকে। ধর্ষিতা নারী হারিয়ে ফেলে তথাকথিত বিশুদ্ধতার ট্যাগ। বিকৃত, অসুস্থ যৌন সন্ত্রাস বা নির্যাতনের শিকার কোন নারীর বড়জোর হাইম্যান ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে,
তার ভার্জিনিটি বা বিশুদ্ধতার কোন ক্ষতি হয় না।

যৌন অভিজ্ঞতা না থাকাই যদি বিশুদ্ধতা হয়ে থাকে, তবে কি আমাদের প্রত্যেকের জন্ম ঘটেছে চরম অশুদ্ধতা থেকে? ট্যাবু ভেংগে আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার। সুস্থ সুন্দর যৌনচর্চাই আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ রাখতে পারে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,২২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.