শ্বশুরবাড়ির সকলের প্রিয় ‘সাবমিসিভ বউ’

0

সুচিত্রা সরকার:

শিরোনামটা খানিকটা খটমটে লাগলো? ‘সাবমিসিভ বউ’ কী জিনিস? খায় না মাথায় দেয়, বুঝিয়ে বলা শক্ত হলেও, আপনি এরকম বউ দেখেছেন বিস্তর!

পাশের বাড়ির বউটিকে দেখেছেন? যাকে দিন-রাত পেটাচ্ছে বর। উঠিতে আর বসিতে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তে! পেটাচ্ছে আর পেটাচ্ছে। কখনো চড়- থাপ্পড়! কখনও গলাধাক্কা?

আপনি যখন জিজ্ঞেস করবেন, ও বউ, মুখে কালশিটে দাগ কিসের? বউটি কষ্ট লুকিয়ে হাসিমুখে বলবে, ও কিছু না। খাটের কোনায় ব্যাথা পেয়েছিলাম।

শাশুড়ি শুনে বেজায় খুশি! বউ বড় লক্ষী! ধৈর্য্য আছে। ঘরের কথা পাঁচকান করে না।

আসলে বউটি অন্যায় মেয়ে নেয়াকেই জীবনের ব্রত মনে করে!

আবার দেখা গেল, শাশুড়ি ‘প্রেসক্রিপশান’ ধরিয়ে দিচ্ছে। বাড়ির ‘অমুক’ নিয়ম মেনে চলতে হবে (শাশুড়ি য’বে থেকে বউ হয়ে এসেছিলেন, তিনিও এই নিয়ম মেনেছিলেন)! ‘তমুক’ নিয়ম কারো বেলায় না চললেও বউটির বেলায় বহাল অবশ্যকর্তব্য (অন্যায় হইলেও)। নইলে বউকে তিনি পাশ মার্ক দিবেন না।

বউটি জানে, পাশ মার্ক না পেলে সংসারে সে টিকে থাকতে পারবে না। তাই পাশ মার্কের আশায়, ‘বেদবাক্য জ্ঞানে’ মেনে চলে শাশুড়ির নির্দেশ।

এরপর রয়েছে ননদের মুখ ঝামটা, দেবর- ভাসুরের চোখ রাঙানী, আত্মীয়দের আবদার মেটানো- সব শিরোধার্য! সবেতেই মস্তক অবনত!

মোটকথা, শশুরবাড়ির সকল সদস্যদের কথায় বউটি উঠে আর বসে। কোনো কথার ওপড় কথা বলে না। রাগ করে না। ‘নিমরাজি’ বা ‘গররাজি’ বলে কোনো শব্দ বউটির অভিধানে নেই।

দিন- রাত ‘সেবা’ দিয়ে আর গঞ্জনা সয়ে সয়ে বউটি একটা তকমা পায়!

শাশুড়ি গর্বের সঙ্গে বলে- আমার ছেলের বউ ‘সাত চড়ে রা কাড়ে না’! বড় ভাল মেয়ে! বাধ্য!

এই ‘সাত চড়ে রা না কাড়া’ বাধ্য বউটিও আসলে সাবমেসিভ মানুষ!
বাধ্য, অনুগত! নির্ভেজাল! সকলের প্রিয়!

সাহিত্যিক সুকুমার রায় একটি সাবমেসিভ সাপ চেয়েছিলেন কি?

‘যে সাপের চোখ নেই, শিং নেই, নখ নেই! ছোটে না কি, হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না। করে নাকো ফোঁস ফাঁস, মারে নাকো ঢুঁশ ঢাঁশ, নেই কোনো উৎপাত, খায় শুধু দুধ ভাত!’

মেয়েদেরকে (বাড়ির কাজের লোককেও) এমন ‘উৎপাতবিহীন অবলা প্রাণী’ হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করে শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা।

তাতে করে সংসারে জটিলতা হয় না। সংসারের কাজেও লাগে তার কোনো অভিযোগও নেই।

ঝামেলা আর নালিশবিহীন আসবাব একটা!

এরকম বউ ঘরে থাকলে, সে ঘরে বিরাজ করে শান্তি আর শান্তি!

আর গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এই বউয়ের কথা। কোনো অবাধ্য বউকে, বাধ্য করতে চাইলে, এই বউয়ের উদাহরণ টানা হয়।

এদিকে একটা ‘বর্ণ গন্ধহীন’ গুন আছে বলে, বউটি অহংকারবোধ করে। শেষমেষ এই নমনীয় হয়ে থাকাটাই নেশায় পরিণত হয়! তারপর একসময় সে আদর্শ গৃহবধূর ‘আইকনে’ পরিণত হয়!

মেয়ের গর্বে বাপের বাড়ির লোকরাও খুশি। তাই ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে বাবার বাড়িতেই (মায়ের বাড়ি নেই, মেয়েদের নিজেরও কোনো বাড়ি হয় না) মেয়েদের শেখানো হয়, শ্বশুরবাড়িতে তার করণীয় কি! আচরণ কেমন হবে।
কেমন করে চললে, শ্বশুরবাড়িতে সকলের ‘প্রিয়’ হয়ে জীবন পার করে দেয়া যাবে।

ব্যস! এইতো! অতঃপর ‘আইকন’ বউটি অবদমিত হতে হতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়!

আর যে বউটি সাবমেসিভ নয়? তার কি হয়?

সেও জীবন পার করে। সেও তকমা পায়। ঝগড়ুটে, রাগী, অবাধ্য, বেয়াদব, নির্লজ্জ হিসেবে তার খুব নামডাক হয়!
তাতে করে সংসারে (পড়ুন ‘সঙ’সার) চলাটা বড় দায় হয়ে পড়ে। প্রায় একঘরে! ‘উঠিতে বসিতে’ গঞ্জনা শুনতে শুনতে অবাধ্য আর প্রতিবাদী বউটির আয়ু ফুরিয়ে আসে।

তারপর?

তারপর সকলে এই অবাধ্য, বেয়াদব, নির্লজ্জ (ন্যায়শাস্ত্রে যদিও এটা প্রমাণিত হয়নি) বউটিকে উদাহরণ হিসেবে দেখে! সমাজের চোখে এই নেতিবাচক বউ চিরকাল একটি খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকে। শ্বশুরবাড়ির ‘প্রতিবাদী বউটি’ খল নায়িকার মুকুট পরে।

কিন্তু উল্টোটা একটু ভাবুন তো!

কোনো অভিভাবক কি তার ছেলেকে শৈশব থেকেই শিক্ষা দেন, কেমন করে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে? তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে? তাদের কোনো কথায় কখনোই, অন্যায় জানলেও জোর গলায় কথা বলা যাবে না? সব মেনে নিতে হবে? সাত চড়ে রা কাড়া যাবে না?
বাপরে! কল্পনা করতেও কষ্ট হচ্ছে!

ছেলেদের শৈশবের আদর্শ লিপিতে নেই এমন উপদেশবাণী ।

কারণ মানিয়ে নেয়া আর মেনে নেয়ার শর্ত কেবল মেয়েদের!
কারণ মেয়েদেরই জন্মস্থান ছেড়ে যেতে হয়!
কারণ মেয়েদের স্থায়ী কোনো ঘর থাকে না।

তাই এই ‘কচুরিপানা’ শ্রেণি’টি ভেসে ভেসে যে গাঙে ঠাঁই পায়, তার স্রোতের সঙ্গে চলার কৌশল আয়ত্ত করে নেয়। আর যে ‘কচুরিপানা’ এটা আয়ত্তে আনতে পারে না, তার ঠাঁই হয় না কোনো গাঙে!

সেই অবাধ্য আর দুর্বিনীত ‘পানা’টিকেই কখনো সখনো ভাসতে দেখি মাঝগঙ্গায়।

একা। টলমল!

৩.১০.২০১৭
দুপুর ২.৩৫ মিনিট

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 4.8K
  •  
  •  
  • 7
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    4.8K
    Shares

লেখাটি ১৮,৩৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.