লিঙ্গকর্তন: পক্ষ বা বিপক্ষ নয়, ভাবুন

0

ফাহমি ইলা:

ক্লাস সেভেন বা এইটের ঘটনা, হঠাৎ একদিন জানতে পারি কোন এক স্কুলে কোনো এক সময় তিন শিফটে ক্লাস হত- মর্নিং, ডে এবং নাইট শিফট। নাইট শিফট মানে গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আর শীতকালীন সময়ে সাতটা। আফসোস করে বলেছিলাম- ‘নাইট শিফট এখন বন্ধ করে দিয়েছে কেনো? আমাদের থাকলে কত ভালো হত!’ পরবর্তীতে জানতে পারি তৃতীয় শ্রেণির একটি মেয়েশিশুকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিলো স্কুলের দারোয়ানের বিরুদ্ধে এবং সেই প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে নাইটশিফট বন্ধ করে দেয়া হয়। ঘটনাটি বলবার কারণ হচ্ছে ধর্ষণ কী, সেটা সেইদিন প্রথম জানতে পারি। কিশোরী বয়সের অভিজ্ঞতায় যা হয়, ভয়ে সিটিয়ে গিয়েছিলাম, মাথায় গেঁড়ে বসেছিলো সেই ভয়।

এরপর দেড় যুগ কেটে গেলো, এখন চোখের সামনে ধর্ষণ হয়ে গেছে একটি নিয়মিত ঘটনা এবং বিচারহীনতা একটি ডালভাত শব্দ। মাস দেড়েক আগে রূপার ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি ঢাকা ছেড়েছি চাকুরির উদ্দেশ্যে। তার কিছুদিন পর অফিসের কাজে যশোর থেকে ফিরতে ফিরতে রাত ন’টা বেজে গিয়েছিলো। সেইদিন এক জানা (মোটেও অজানা নয়) ভয় তাড়িত করছিলো বারবার। আমি আমাকে নিয়ে অবাকও হয়েছিলাম যে, আমিও এই রাত ন’টায় ভয় পাচ্ছি? সেইদিনের ঘটনা শেয়ারও করেছিলাম সামাজিক মাধ্যমে।

এখন আবেগতাড়িত হয়ে প্রশ্ন করতেই পারি- ‘একই উৎস থেকে জন্ম নিয়ে বিভিন্ন বাধা উৎরে সমাজে যখন সমানভাবে লড়ে যাচ্ছি তখন কেনো আমার একমাত্র আমার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এতো চিন্তা, ভয় কাজ করবে?’ কিন্তু সেই আবেগতাড়িত প্রশ্নটি করবো না কারণ সেই কেনোর উত্তর আমরা নারীরা জানি, নিজেদের জীবন দিয়েই জানি। ফর্মাল সেক্টরে মিষ্টিভাষায় তত্ত্বকথা বলে বিভিন্নসময় এই নারীর অধিকার বিষয়ে স্টেইকহোল্ডারদের বোঝাতে হয় কিন্তু এত বৈষম্য যখন শুধু আমাকেই মানতে হয় তখন সেই ভাষাটা সবসময় মিষ্টি থাকে না, মাঝেমাঝে এই সিস্টেম ভেঙ্গেচুরে ফেলতে ইচ্ছে হয়, একটা খুনেমগজ চাড়া দিয়ে ওঠে। সেটাও আবেগতাড়িত কথা বৈকি! তবে আমার এই খুনেমগজ যে এই সমাজই তৈরি করে দিয়েছে সেটা বালখিল্য কথা নয়, সত্যি কথা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে ধর্ষনের চেষ্টা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ সবমিলিয়ে শিকার ৭২৪ জন নারী, ধর্ষণের পর মৃত্যু ঘটেছে ৩৭ জন নারীর এবং আত্মহত্যা করেছে ৮ জন নারী। অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, ২০১৬ সালে ১০৫০ জন নারী ও মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করা হয়, যেখানে ১৬৬ জন গণধর্ষণের শিকার হয় এবং ৪৪ জনকে মেরে ফেলা হয়। তারা এও বলছে, পূর্ববর্তী চার বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে নারী নির্যাতনের হার বেশি, ধর্ষণ যার একটা অংশমাত্র। এটুকু তথ্য দিলাম কারণ পরিসংখ্যানিক তথ্য না দিলে বিষয়টা আবার বিশ্বাসযোগ্য হয় না অনেকের কাছে।

তো এই যে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে, কাদের দ্বারা হচ্ছে? বিশেষ করে ধর্ষন? এই প্রশ্ন শোনার পর ‘সকল পুরুষ সমান নয়’ বলে একশ্রেণি যখন চিৎকার দেবেন তখন সাথে সাথে এই চিৎকারও দেয়া জরুরি যে ‘এই দায় পুরুষের কিংবা এই দায় পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার’। এখন যদি আবার চিৎকার শুরু করেন যে নির্যাতন সে যেমন নির্যাতনই হোক সেই দায় নারীর কেননা তার পোশাকের ঠিক নাই, কথার ঠিক নাই, আচরণের ঠিক নাই, চুলের ঠিক নাই, ঘুমের ঠিক নাই, খাওয়ার ঠিক নাই তাহলে এই চিৎকারওয়ালাদের সাথে কথা বলতে আমি অন্তত নারাজ। কেননা আমার ধারণামতে এরা পরোক্ষভাবে এক একজন নির্যাতক!

রচনায় ভূমিকা হতে হয় ছোট, শিশুকালে শিক্ষকরা তাই শিখিয়েছিলেন। আমার হয়ে গেছে বড়। ওপরে যে কয় প্যারা লিখেছি সবটুকুই ছিলো ভূমিকা। আসল কথা শুরু করবো এখন। একদম ছোটবেলায় যাকে আমরা নারীরা মেয়েবেলাও বলতে পারি সেই মেয়েবেলা থেকে শুরু হয় বৈষম্য। কতটুকু খেতে হবে, কতটুকু বলতে হবে, কতটুকু পড়তে বা পরতে হবে, বাড়ি থেকে কতগজ পর্যন্ত আমার দৌড় এমন আরো অনেককিছু।

আমি বুঝি এই বৈষম্য আমাকে কতটা পীড়া দিয়েছে, আমার অপার সামর্থ্য এবং শক্তিকে কতটা ভোঁতা করে দিয়েছে। পথেঘাটে, বাজারে, বাসে যখন আমার পিঠে কোমরে নিতম্বে বুকে পুরুষালী হাত পড়ে তখন আমি বুঝি এর যন্ত্রণা, যখন বাংলায় সবচেয়ে ব্যবহৃত শব্দগুলো যাকে আপনারা গালি বলেন সেগুলো আমার দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয় তখন আমি বুঝি সেই যন্ত্রণা, যখন দেখি আমার ভেতরে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাকে দমিয়ে রাখা হয় তখন আমি বুঝি স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট। আপনি যখন পুরুষ তখন আপনি আমার সেই কষ্টে কষ্ট পেতে পারেন, সহানুভূতি দেখাতে পারেন, নিজেকে উন্নত করে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমার সাথে গলা মিলিয়ে নারী অধিকারের কথাও বলতে পারেন, সেজন্য আপনাকে স্যালুট! কিন্তু আমি বা আমরা যে কষ্ট যে বৈষম্য নিয়ে তিলে তিলে বড় হয়েছি সেই অভিজ্ঞতা কখনোই আপনার পক্ষে পাওয়া সম্ভব না।

লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে, এখনো আসল কথায় আসতে পারিনি। আসল কথায় আসি। নারীর প্রতি বিভিন্ন নির্যাতনের কথা বললাম। ওপরে বলা সকল নির্যাতনের চেয়েও অনেকবেশি শারীরিক মানসিক সামাজিক আঘাত হচ্ছে ধর্ষন। এই ধর্ষনের পর সমাজে সেই নারীর গ্রহণযোগ্যতা গিয়ে দাঁড়ায় শূন্যের কোঠায়। তখন হয় তাকে চেপে যেতে হয়, নয় তাকে চাপিয়ে দেয়া হয়, নয় সে মৃত্যুকে বেছে নেয় বা বেছে নিতে বাধ্য করা হয়। আর যখন এই পরিস্থিতির মুখোমুখি একজন নারী দাঁড়াবে তখন সে কী করবে? ভেবেচিন্তে ধর্ষককে শান্ত করে বুঝিয়ে শুনিয়ে ফুলের গোছা হাতে দিয়ে ফ্রেন্ডশীপ করে তারপর বিষয়টার ফয়সালা করবে? কিংবা ‘এই ছিলো কপালে’ বলে চুপচাপ পুরুষটিকে যা করার করতে দেবে? নাকি সমাজকর্তৃক তৈরিকৃত অধিকতর কম শক্তিমান শরীরটা দিয়েও সে শেষপর্যন্ত লড়ে যাবে? হাতের কাছে ধারালো কিছু পেলে পুরুষের ‘সকল শক্তির উৎস’ লিঙ্গটাকে কেটে ফেলাটা কি অস্বাভাবিক হবে? কিংবা সুযোগ বুঝে ছিঁড়েও ফেলতে পারে!

এই যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নারীটি, তার কথা চিন্তা করে আপনার কি মনে হয় না যে এটাই তার জন্য ঐ সময়টার প্রেক্ষিতে একমাত্র ঠিক পথ? যে ভিক্টিম সে সাইকোলজিক্যালি কি করে সাধারণত? যে অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করা হবে সেই অস্ত্রটাকে সে ভোঁতা করে দিতে চায়। এখন ধর্ষণ করতে আসা পুরুষটি যখন মনে করছে তার পুংলিঙ্গটাই একটা অস্ত্র তখন সেই অস্ত্র ভোঁতা করে দেয়ার চেষ্টাকে অস্বাভাবিক বলবেন কোন যুক্তিতে? মোটেও অস্বাভাবিক না!

গত ক’দিনে দেখলাম কেউ কেউ বলছেন- নারীটি পরবর্তীতে আইনের সাহায্য নেবে! আরে বাহ, দারুণ আপনাদের যুক্তি! সেই সময়ে সে পুরুষটাকে কোনভাবেই প্রতিহত না করে পরে আইনের সাহায্য নেবে? যে আইন কী না দু’বছর ধরে চুপ করে আছে তনুহত্যার ঘটনায় এবং আরো বহু ঘটনায়? যে আইন কী না এই শক্তিশালী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অংশ! এখন আপনারা বলবেন- ‘এই যে লিঙ্গকর্তনের কথা বলছেন এটার অপব্যবহারও তো হতে পারে’। অস্বীকার করবো না। কারণ স্বয়ং ইতিহাস ফিসফিস করে বলছে সকল ভালো উদ্যোগেরও অপব্যবহার হয়েছে, কান পাতুন আপনিও শুনতে পাবেন। আমি অপব্যবহারের পক্ষে না গেলেও এই যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কিছুক্ষণ পরে ধর্ষিত খেতাব পাওয়া সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক নারীটি, আমি তার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পক্ষে, আমি সেই তাৎক্ষণিক লিঙ্গ কর্তনের পক্ষে। শুধু কর্তন না, সুযোগ পেলে সেই ‘সকল শক্তির উৎস’টির মূলোৎপাটনের পক্ষে।

এবার আমার দিকে আঙ্গুল তুলে বলতে পারেন- ‘আপনার এ বক্তব্য সমাধান হতে পারে না! এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, সমাজে একটা আইন আছে না, নিয়ম আছে না!’ যে সমাজে বেড়ে উঠতে উঠতে প্রতিনিয়ত আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে, প্রতিনিয়ত আমাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে ‘THIS IS MANS WORLD AND ALL ARE BY THE MAN, FOR THE MAN, OF THE MAN’ তখন আমাকে আগে সেইরকম সমাজ দিতে হবে যেখানে সহিংসতা, নির্যাতন, অসমতা, বৈষম্য, ধর্ষন, শ্রেণিবৈষম্য সহ এমন অনেক শব্দ উঠে যাবে এবং আমি একজন মানুষ হিসেবে সকল অধিকার পাবো এবং সকল সুযোগের সমান ব্যবহার করতে পারবো তখন ধর্ষণ নিয়ে লিখতে হবে না, লিঙ্গ কর্তনের বিপক্ষেও লিখতে হবে না, আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে।

এইবেলা অনেক হলো! এবার আমার বা আমাদের দিকে তাক করা আঙ্গুলটা নামান, নিজের হাত দিয়ে নিজেকে টেনে আয়নার সামনে দাঁড় করান। তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করুন- আসলেই কি এই শ্রেণি বিভাজিত প্রতিহিংসার সমাজ আমরা চাই? আর এই সমাজে আমার দায়িত্ব কী? শুধুই অন্যের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে রাখা?’ আঙ্গুলের যদি আলাদা প্রাণ থাকতো তাহলে আপনি দেখতে পেতেন আপনার নিজের আঙ্গুল আপনার দিকেই কীভাবে তাক করে আছে!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৬,০২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.