একটি রাতের অপেক্ষায়, কিন্তু কত দেবে ওরা?

0

মোজাফ্ফর হোসেন:

রাত ১টা। চারিদিকের কোলাহল রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে গেছে। মাঝে মাঝে গাড়ির হর্ন আর নিজের হার্টবিট ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না সফেলা। টানা ছয় ঘণ্টা গাড়িতে থাকার দরুন গাড়ির শব্দটি খুবই সাধারণ ঠেকছে, অথচ এই শব্দকে একদিন মোটেও সহ্য করতে পারতো না সফেলা।

স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে পাশের বাড়ির সবদার শেখের মেয়ের বিয়ের কথা। সেবার দু’দুটো বাস এসে সফেলার উদোম উঠোনে এসে থামলো, শব্দে তো প্রায় জানটার যায় যায় অবস্থা! সফেলা সেদিন সবদার শেখকে প্রাণভরে গালি দিয়েছিল। গালিটাই যে তার একমাত্র সম্বল! সবদার সাহেবদের কাছে যেমন সফেলা অতি তুচ্ছ, সফেলার গালির কাছে তাদের দশাও তেমনি—সফেলাকে যারা চেনে এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোন দ্বিমত ঘটবে না। তাই তো সফেলা সুযোগ পেলেই তার এই অস্ত্রটা কৃতিত্বের সাথে কাজে লাগায়।

বাসটি তেল পাম্পে এসে ভিড়লো। সফেলার ডান পাশের লোকটি প্রস্রাব করার জন্য তড়িঘড়ি করে নেমে পড়ে, বাম দিকের লোকটি নড়েচড়ে বসে—এতোক্ষণ সে সফেলার ঝুলে যাওয়া বাম স্তনটি মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছিল। এদের দু’জনার সহায়তায় আজ সফেলা অন্ধকারকে গ্রাস করে চলেছে দেহখাদক একদল পিশাচের ক্যাম্পে। ওরা ইচ্ছেমতো ভোগ করবে তাকে—উল্টে-পাল্টে, খাবলে-খুবলে খাবে তার কাকের ঠ্যাংয়ের মতো রসকষহীন শুকনো শরীর। প্রয়োজনে থাকতেও হতে পারে কয়েক রাত—বিনিময়ে টাকা; কিন্তু কত দেবে ওরা?

দেহের ওপর অনেক ধকল যাবে ভাবতেই মুখখানা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় সফেলার। সে ধকল না হয় সইবে, কিন্তু কত দেবে ওরা—মনে মনে ভাবে সফেলা। তাকে যা দেয়া হবে তার দুই ভাগ আবার যাবে এই দালালদের পকেটে। প্রতিটা কারবারে মধ্যস্থকারীরা সব থেকে বেশি সুফল ভোগ করে, এই বেশ্যা বাজারেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। দালালদের সহায়তা ছাড়া যে সফেলার পক্ষে আর কোনো পার্টি ধরা সম্ভব না!

বেশ্যা বাজারে তার দাম পড়ে গেছে। একটা সময় ছিল যখন আগে থেকেই দরদাম হাঁকিয়ে পা বাড়ানো যেতো। কিন্তু এখন আর তার আগের সেই টসটসে মিনসে ভোলানো গতর নেই। ফুলে রস না থাকলে মৌমাছি বসবে কেন! তাই দামাদামি করতে গেলে হটিয়ে দেয় সকলে। সফেলা নীরবে মেনে নেয় সব। দশ বছর পূর্বেকার কথা মনে পড়তেই তার মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটে ওঠে। এক সাহেব গোছের মানুষ—সফেলার বয়স তখন বাইশ কি তেইশ—ভরাট যৌবন দেখে সাহেব তো একেবারে পাগলপ্রায়!

সাহেব হলে কী হবে—লোকটি পাজি-নচ্ছাড়, বৌ-বাচ্চা রেখে চলে আসে সফেলার কাছে—সফেলাও কারবার বোঝে, চেয়ে বসে এক হাজার টাকা! ভদ্রলোক এক কথাতেই রাজি। সফেলা টানা নিঃশ্বাস ছাড়ে নিজের অজান্তেই। এ সমাজটাই হচ্ছে নচ্ছাড়। সমাজের প্রতিটি লোক বেশ্যা, অথচ ভারটা বইতে হয় সফেলার মতো গুটিকতক অসহায় নারীকে। রাত হলে সমাজের কতো হর্তা-কর্তা লালা ফেলতে ফেলতে মাগী বাড়ির সন্ধান করে সফেলার তা ভালো করেই জানা। ওরাই বড় বেশ্যা, অথচ সকাল হবার সাথে সাথে যেনো এক একজন ধোয়া তুলসী পাতা।

গাড়ির শব্দ ভোঁতা হয়ে আসছে ক্রমশ। ভিতরের বাতিগুলো এখন বন্ধ। সকলে বোধ হয় তন্দ্রাচ্ছন্ন। বামের সিটে বসে থাকা দালালটির হাত আর নড়ছে না। রাস্তায় হালকা আলো-ছায়া সফেলাকে ভেংচি কেটে সরে পড়ছে দ্রুত। রাতের নীরব আত্মা তাকে শাসিয়ে যাচ্ছে ঘনঘন। দিনের আলো সফেলার গায়ে কাঁটাতারের মতন বিঁধে—অপমানে, লজ্জায় কুঁকড়ে যায় তার সর্বাঙ্গ, অথচ রাতের পৃথিবীতে সে পানির মধ্যে মাছের মতোন খুবই স্বাভাবিক। দিনের আলোয় যারা ভালো মানুষের মুখোশ পরে সভ্যতার নকশা তৈরি করে, রাতে তাদের নগ্ন চেহারা দেখে সফেলার খুব করুণা হয়।

সফেলা তো এই সমাজেরই একজন, সমাজের প্রতিটি মানুষের সাথে পাল্লা দিয়ে সেও বেঁচে থাকতে চাইছে। কোন জগতটা তবে সত্যি—রাতের নাকি দিনের? যদি রাতের হয় তবে সফেলা তো অন্যায় কিছু করছে না। বেঁচে থাকার জন্যেই আর পাঁচটা ব্যবসায়ের মতন দেহব্যবসা করছে, পুরুষ বা ভদ্রঘরের নারীদের মতো দৈহিক তাড়না কিংবা ভোগ বিলাসিতার জন্য কিছু করছে না, সে যা করছে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্যেই; এক্ষেত্রে দেহ তার ব্যবসায়ের মূলধন মাত্র; কিন্তু সমাজের সভ্য পুরুষগুলো তো তার কাছে আসে দেহের গন্ধে, মাংসাশী প্রাণীর মতন খাবলে-খুবলে খায়, সুখের নেশায় মাতাল হয়ে আঁচড় কেটে দেয় তার ভেতরে ও বাইরে। বেশ্যা শব্দটা যদি এতটাই ঘৃণার হবে তবে আসল বেশ্যা তো ওরা যারা ঘণ্টায় ঘণ্টায় মুখোশ পাল্টায়, রাজত্ব করে ভণ্ড সভ্যতার!

এতোসব বোঝে না সফেলা। এতো বোঝবার জ্ঞান তার নেই। সমাজের শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা তার কাছে জ্ঞান দিতে যায় না, যায় তাদের পাশবিক চেতনাকে উগরে দিতে। এদেরকে অজ্ঞ করে না রাখলে যে বড় ক্ষতিটা তাদেরই হবে! অন্ধকারে থাকে বলেই সফেলা জানে মানুষের অন্ধকারের খবরটা।

গাড়িটা মেইন রোডের এক কোণায় থামলো—দশ মিনিটের বিরতি। দুয়েকটি দোকান এখনো খোলা। বাম পাশের লোকটি বিড়ি কিনতে নেমে যায়, সফেলা বুকের কাপড়টা ঠিক করে আলোতে মুখটা আলগে ধরে, চোখ পড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চকচক করতে থাকা ব্রিগেড সিনেমার পোস্টারের দিকে। অর্ধ-উলঙ্গ নায়িকাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে। সমাজের এই উঁচু শ্রেণির বেশ্যাদের দেখে হিংসে হয় তার। সমাজে এদের বেশ কদর আছে, টাকাও পায় ঢের বেশি।

‘আইচ্ছা, ইরা কী সুখ পায়, নাকি আমার মতো বিদনায় কুঁকড়ি যায় পুরা শরীর?’—ছবির ওপরে দণ্ডায়মান ল্যাম্প-পোস্টটিকে প্রশ্ন করে সে। প্রচণ্ড সুখে যখন খদ্দেরদের মরে যেতে ইচ্ছে করে, তখন আহত সফেলা খুব কষ্ট করে জানটাকে ধরে রাখে। পঁচিশ বছরের বেশ্যা-জীবনে মাসিকের সময় যে শান্তিটুকু পেয়েছে সে, এছাড়া আর অবসর মেলেনি জীবনে। প্রথম যেবার মাসিক হয়, কী গালিটাই না দিয়েছিল মাসিককে! কী ভয়ানক রক্ত দলা বেঁধে শরীর থেকে নেমে আসে, ব্যথায় কুঁকড়ে যায় তলপেট, নারী জীবনে এর থেকে অভিশপ্ত আর কিইবা হতে পারে! তখন কি আর জানতো সে—এই বীভৎস ঘটনাটাই তার জীবনে সব থেকে কাঙ্ক্ষিত হয়ে দাঁড়াবে!

রাত ২টা। সফেলার মনে হচ্ছে গাড়িটা অন্ধকারকে আঁকড়ে তরতর করে বয়ে চলেছে অজানা এক শঙ্কার দিকে। বাড়িতে তার আট ও দশ বছরের মেয়ে দুটো একা। ছেলেটা ছ’ মাস ধরে জেলে। ছাড়াতে অনেক টাকা লাগবে। পুলিশের মন ভরানোর মতো বয়স ও টাকা কোনটাই তার নেই। ছেলেটা গেছে, এখনও সময় আছে মেয়ে দুটোকে রক্ষা করার। সফেলা অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজকের রাতটিই হবে তার বেশ্যাজীবনের শেষ রাত; ওরা যে ক’টা টাকা দেবে তা নিয়েই মেয়ে দুটোকে সংগে করে এ সমাজের কোন এক গর্তে ঘাপটি মেরে পড়ে রইবে। টাকার কথা মনে হতেই হার্টবিটটা বেড়ে যায়। বুক থেকে দালালের হাতটি হটিয়ে নিজের হাতটি শক্ত করে চেপে ধরে, সেখান থেকে জানটা যেনো বেরিয়ে না যায়!

আচ্ছা, কতো দেবে ওরা, নাকি খালি হাতেই ফিরতে হবে!—এই সংশয়টি তার সকল সংশয়কে পিছনে ফেলে পথ ভোঁতা করে দাঁড়ায়। একটা সময় ছিল যখন ওরা রূপের ঝলক দেখে দু’হাত ভরে দিত। তাইতো বেশ্যাবাজারে সকলে হিংসে করতো তাকে। এমনকি সতী-সাধ্বী নারীরাও আড়ালে-আবডালে সফেলার মতো দেহ চাইতো। অথচ আজ ঝুলন্ত আর ঢিলে-ঢোলা গতর দেখে সকলে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এ ব্যবসায়ে কচি দেহ বিকোয় বেশি। তাইতো সফেলার মেয়েদুটোর ওপর চোখ এখন ওদের। অথচ সফেলা যখন পেট বাঁধিয়েছে তখন কতদিক থেকে চাপ আসে গর্ভপাতের। ব্যবসা যখন তুঙ্গে তখনই গর্ভে আসে ছেলেটা। সফেলা জেদ করে টিকিয়ে রাখে। ছেলে সন্তান শুনে কেউই সেদিন খুশি হয়নি।

বেশ্যার ছেলে হলে সমাজের কী লাভ? সফেলাও ছেলের বাড়ন্ত শরীর দেখে ভেবেছে, এও কি তবে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে কোনো বেশ্যালয়ের সন্ধান করবে? রাতের অন্ধকারে মাতাল হয়ে ঘর ভুল করে মায়ের ঘরেই কোনোদিন চলে আসবে না-তো? যদি সফেলা সেদিন সত্যি সত্যি ছোকড়া খদ্দের ভেবে গ্রহণ করে ফেলে? ছেলে বড় হয় আর সফেলার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। ছেলেকে অন্যপুরুষ ভেবে নিজের ঔরসকে ধিক্কার দেয় সে। এরপর যখন পরপর মেয়ে দুটো হলো, রাতের খদ্দেররা কাজ সারার পর মেয়ে দুটোর ঘুমন্ত গালে চুমু দিয়ে বলেছে, তারাতাড়ি বড় হ! একটু একটু করে তারা বেড়ে উঠেছে আর খদ্দেররা হাত-পা টিপে টিপে পরখ করে গেছে। মায়ের নাম করে মেয়ে দুটোর বুকে-পাছায় হাত দিতে ওরা আসে এখন—সফেলাকে বুঝেও না বোঝার ভান করতে হয়। সেই তেজ আর ওর নেই। বাঁধা দিলেই বিল না মিটিয়ে উঠে যায়। সফেলাকে সইতে হয় নীরবে—এ প্রতারণার যে কোনো বিচার নেই, আইন-আদালত নেই, আর থাকলেই বা কী এমন লাভ হতো! এদের ‘করুণাতেই’ যে সফেলারা বেঁচে থাকে! আর জীবন? টানা নিঃশ্বাস ছাড়ে সফেলা।

গাড়ি এসে থামলো গন্তব্যে। দালাল দু’জনের পিছন পিছন সফেলাও নেমে পড়লো হিড়হিড় করে। আচ্ছা কত দেবে ওরা—ফিসফিস করে বললো নিজেকে। আঁচলের গিঁট্টু থেকে একটা বড়ি বের করে গুঁজে দিল মুখে, দেহ অবশ করার এই কায়দাটা ওর সাথেই থাকে। বেশ কয়েক কদম হাঁটার পর পৌঁছালো পিশাচদের ক্যাম্পে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, বিশ্রী রকমের গরম পড়েছে আজ। মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়েই মেঘের মধ্যে লুকিয়ে পড়ছে চাঁদ।
‘সখী, তোর যৌবন ধার একটু ধার দিবি আমাকে?’

সফেলা কতবার বলেছে এ কথা! আজ তার মেজাজটা আছে বিগড়ে। ‘খানকি, ছিনালিপনা করিস আমার সাথে? হাতের কাছে পেলি তোর মাথার চুল ধরি স্যাটায় ধান ভাংতাম!’ সফেলা মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করে বলে। দালালের একজন এগিয়ে যায় দরজার দিকে। অন্যজন সফেলার হাত দুয়েক দূরে দাঁড়িয়ে চচ্চড় করে পেশাব করতে থাকে। কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে একটা ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো, ‘কে? কোন হ্যালায় রে এই অসময় দরজা হেটকায়?’ সফেলার বাম পাশের লোকটি একটু বিনয়ের সুরে বললো, ‘আমরা সাব, মাল লইয়া আইছি’।

ভেতর থেকে আর কোনো সাড়া শব্দ আসে না। সফেলা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে জানতে চায়, ‘কত দেবে ওরা?’ ডান দিকের লোকটা আন্ডারওয়ার-এর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে খিঁচুনি দিয়ে বলে উঠলো, ‘চুপ কর শালী, এত্তো ঠাপ খেয়েও কামড় মেটেনি!’ ততক্ষণে ভেতর থেকে একটা তৃপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘আজ আর লাগবো না; আমরা কমবয়সী এক ছুড়ি পাইছি। অন্যদিন নিয়া আসিস’।

সফেলাকে হটিয়ে দালাল দু’জন পিছন দিকে পা বাড়ায়। সফেলা মাথা ধরে বসে পড়ে—আরও একটি নষ্ট রাত, আরও একটি স্বপ্নের প্রতীক্ষায়। কিন্তু কত দেবে ওরা?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 546
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    546
    Shares

লেখাটি ৩,৬৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.