ইভটিজার বনাম আমি ও আমরা

0

সানজিতা শারমিন:

তখন আমি পোস্ট বেসিক বিএসসি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, পাশাপাশি সিলেট শহর থেকে ৪০ কিঃমি দূরের এক উপজেলায় সেইভ দ্য চিল্ড্রেনের একটা প্রজেক্টে জব করি।
যেহেতু জব আর পড়াশোনা পাশাপাশি করতাম, সেজন্য সারাদিন আমার বাসার বাইরে কাটতো। সকাল আটটায় বের হয়ে রাত ৯টায় বাসায় ফিরতাম দীর্ঘ জার্নি করে।
বিকেল সিফটে ক্লাস করতাম বলে সবসময় রাতের বাসে ফিরতে হতো। ওই সময় গাড়িতে খুব কমই মেয়ে থাকে, বেশিরভাগ সময় আমি একাই থাকতাম।

একদিনের ঘটনা বলি…
সেদিনও আমি অন্যান্য দিনের মত ক্লাস শেষে বাসায় ফিরছিলাম। আমার সাথে আরো দুজন মহিলা ছিলেন। আমাদের সিট ছিল ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিনের কাছের সিট। কয়েকজন ছেলেও বসেছে ইঞ্জিনের উপর।
কিছুদূর চলার পর হঠাৎ খেয়াল করলাম পাশে বসা মেয়েটা উশখুশ করছে। আমি বললাম, কী হয়েছে আপু? তিনি বললেন, কিছু না, ইঞ্জিনের গরম লাগছে পায়ে। আমি আর কিছু না বলে চুপ করে বসে মোবাইল চাপছি।

আবার কিছুক্ষণ পর দেখলাম পাশের জনও সেইম বিহেইভ করছে। কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে উনিও অস্বস্তিতে আছে। আমি খেয়াল করলেও উনাকে কিছু বলিনি। বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে আমি আমার পায়ে কারোর হাতের স্পর্শ পেলাম। ভাবলাম অনেকজন গাদাগাদি করে বসেছি তাই হয়তো। এবার দেখি সে হাত বা পা সরাচ্ছে না। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখি, আমার সামনে দেখতে খুব হ্যান্ডসাম একটা ছেলে এই কাজ করছে। তখনই বুঝতে বাকি নেই কেন আপুরা এমন করছিল।
ভাবলাম এখন যদি কিছু বলি পরিস্থিতি আমার পক্ষে থাকবে না, কারণ আমরা মাত্র তিনজন মেয়ে, বাকিরা পুরুষ(!)। সবাই বলবে, মানুষ বেশি হওয়ায় লেগে গেছে, কিছুতেই হয়তো কাউকে বোঝাতে পারতাম না। আর মেয়েগুলো হেল্প করতো বলেও মনে হলো না।

তাই ভেবে এক বুদ্ধি বের করলাম।
তখন রেগুলার স্কার্ফ পড়তাম বিচিত্র সব শার্প আলপিন দিয়ে। লুকিয়ে একটা পিন বের করে হাতে নিয়ে এমনভাবে সেট করেছি যে সে আবার হাত দেওয়া মাত্রই আঁচড়ে দিব। যেই ভাবা সেই কাজ, যখনি আমি ফিল করলাম সে আবার এই কাজ করছে, চোখ বন্ধ করে সজোরে পিনটা ওর হাতে লাগিয়ে টান মারলাম। সেও ‘বাবা গো’ বলে তড়িৎ গতিতে লাফিয়ে উঠলো। সাথে সাথে পেসেঞ্জার সবাই বলে উঠলো, কী হয়েছে ভাই! সে বললো, আরে বইলেন না, ইঞ্জিন যা গরম, বসা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি বুঝে সে বললো, এই কন্ডাক্টর আমাকে নামিয়ে দাও, আমি এখানেই নামবো।

আরেকদিনের ঘটনা:

বাড়ি যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটো রিকশায় উঠেছি। পেছনে আমিসহ আরো দুজন ভদ্র(!)লোক ছিলাম। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার কিছু সময় পর থেকেই লক্ষ্য করলাম আমার পাশের ব্যক্তি ধীরে ধীরে আমার দিকে চেপে আসতেছে। প্রথমে ভাবলাম ঝাঁকুনিতে হয়তো। কিছু সময় পর বুঝেছি এটা ইচ্ছাকৃত।

চুপ থেকে ভাবলাম এখন আমি যদি কিছু মুখ ফুটে বলি তবে গাড়িতে বসা অন্যরা বলবে, তোমার বাবার বয়সী লোকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনতে পারলে! এতো প্রবলেম যখন তখন নিজের প্রাইভেট গাড়িতে চড়ো (যা আমাদের প্রায়ই প্রতিবাদ করার কারণে শুনতে হয়)। আর এমন কিছু হলে তা আব্বু জেনে যাবেন, কারণ গাড়ির ড্রাইভার আমার পরিচিত ছিল।

যেহেতু কিছু বলতে পারছি না তাই বুদ্ধি করে মাথার স্কার্ফ খুলে ভলিয়ম লেয়ার দেয়া ছোট চুলগুলো ছেড়ে দিলাম। এতে বেশ কাজে দিল। হাওরের বাতাসে আমার চুলগুলোর টালমাটাল অবস্থা। বার বার চুলের ঝটকা ভদ্রলোকের(!) মুখে লাগছিল। তিনি তো এদিক-সেদিক মুখ ঘুরাচ্ছেন, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। এরপর একটু সরে বসলেন, তাতেও লাভ হলো না। বদমাশ চুলগুলো উনাকে হেস্তন্যস্ত করেই ছাড়লো।

শেষ পর্যন্ত তিনি বাধ্য হয়ে বললেন, আপনার চুলগুলো আমাকে বিরক্ত করছে। আমি বললাম, চাচা আপনি যে এতোক্ষণ আমাকে বিরক্ত করলেন, তার কী হবে?
তিনি ততক্ষণে বুঝে গেলেন, আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এই কাজ করেছি। গাড়ি থেকে নামার আগ মুহূর্তে তিনি বললেন, আমি সরি। আর কখনো এমন করবো না।

এরকম ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। অনেক ঝগড়া হয়েছে রাস্তা ঘাটে। জীবনের বাকি অনেক বছর হয়তো তাই ঘটতে থাকবে। তাই নিজের সম্মান বজায় রেখে নিজের আত্মরক্ষার কৌশল নিজেকেই জানতে হবে। যদিও রিয়েল সিচুয়্যেশনে এটা খুব অল্প শাস্তি, তবু কিছু না করে মুখ বুঁজে সহ্য করার চেয়ে এটা বেস্ট। শুধুমাত্র এই কারণে যাতে এই বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষগুলো দ্বিতীয়বার এই কাজ করতে আরেকবার ভাবে।

একটু একটু করে আমরা যদি মুখ বুঁজে সহ্য না করে এসবের প্রতিবাদ করি, তবে নিশ্চয় এরা ভয় পাবে। অসৎ ব্যক্তিরা ভীতু হয়, তারা ভয় পেতে বাধ্য।

বিঃদ্রঃ কিছুদিন আগে ঢাকায় এক আপু টিউশনি পড়াতে যাওয়ার সময় এক ইভটিজারকে চোখে মুখে পিপার স্প্রে মারার কারণে তাকে পাবলিক ছিনতাইকারী ভেবে গণধোলাই দিয়ে একদিন হাজতবাস করায়। মেয়েটার বক্তব্য কেউ শুনেনি। না শুনেই তাকে মেরে সারা শরীরে আঘাতের পর আঘাত করেছে।
এই হচ্ছে আমার দেশ আর দেশের কিছু নপুংসক।
তবুও প্রতিবাদ করতেই হবে যত বাধাই আসুক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৩৩৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.