সিঙ্গেল মা এবং কেনিয়ার নারী জীবন

0

উপমা মাহবুব:

আমার সামনে এই মুহূর্তে সবুজ গাছ-গাছালি, তাতে ফুটে আছে রঙ-বেরঙের জানা-অজানা ফুল। অনেকগুলো কৃত্রিম ঝর্ণা দিয়ে অবিরাম ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। এটা নাইরোবির ফেয়ারভিউ হোটেলের সামনের খোলা লবি। অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ ঘেরা এই হোটেলটি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কর্মজীবী মানুষে ভরপুর। কেউ প্রকৃতির মধ্যে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে অফিসের কাজ করছেন, অনেকেই চা-বৈঠক করছেন। কেউ কেউ ভিনদেশে অবস্থানরত সহকর্মীর সঙ্গে স্কাইপ কল করছেন।

ঠিক এই মুহূর্তে আমারও অফিসের কাজই করার কথা। গত দুই দিন আমি ঘুরে বেড়িয়েছি কেনিয়ার প্রত্যন্ত কিটউই কাউন্টির প্রত্যন্ততর গ্রামে। আমি কেনিয়ায় এসেছি একটি সংস্থার বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তুর্ভুক্ত হওয়া অতিদরিদ্র মানুষের জীবনের গল্প লিপিবদ্ধ করতে।

আমার অফিস ব্র্যাক এই সংস্থাটিকে কেনিয়ায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। অনেক গল্প সংগ্রহ হয়েছে, সবই এই মুহুর্তে প্রবল দারিদ্রের সঙ্গে তারা যে সংগ্রাম করে চলেছেন সেই সংক্রান্ত, কিন্তু এই পরিবারগুলো যেহেতু একটি ভালো কর্মসূচির আওতায় এসেছে অতএব আশা করা যায় সামনের দিনগুলোতে তাদের কষ্টের জীবনে ভালো কিছু পরিবর্তন আসবে।

এই গল্পগুলোকে আজ আমার সুন্দর হোটেলের নৈসর্গিক পরিবেশে বসে গুছিয়ে ফাইলিং করার কথা, যেন যেকোনো সময় যেকোনো সহকর্মী তাদের কাজের প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে এক ১৩ বছরের কিশোরীর কাছে। কথা বলা গভীর দুটো কালো চোখের অধিকারী সেই কিশোরী, অদ্ভুত নিষ্পাপ তার মুখমণ্ডল। সেই কিশোরীটি ৬ মাস বয়সী একটি কন্যা শিশুর মা।

কিটউই-এর বৃষ্টির অপেক্ষায় খাঁ খাঁ করতে থাকা রুক্ষ প্রকৃতি, রোদে জ্বলে যাওয়া গাছের সারি আর পানিশূন্য নদীর উপর দিয়ে, লাল মাটির উঁচু-নিচু সরু রাস্তায় রোলার কোস্টারের মতো ঝাঁকি খেতে খেতে আমি গিয়েছিলাম সেই কিশোরীর খালা জেন মালি মুনুভে-র জীবনের গল্প শুনতে। সাত সন্তান, এক বোন ও তার ছয় সন্তান, এক নাতনি এবং বয়স্ক মা, এই নিয়ে জেনের ১৭জনের পরিবার! জেন, তার বোন এবং জেনের ১৮ বছর বয়সী বড় ছেলের অনিয়মিত শ্রমবিক্রির উপার্জনে খেয়ে-না খেয়ে কোনমতে পেরিয়ে যাচ্ছে জীবন।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় তাদের এই বিশাল পরিবারে কোন কর্মক্ষম বয়সী পুরুষ সদস্য নেই। জেন এবং তার বোন দুজনেই অবিবাহিত, জেনের বোনের ১৩ বছর বয়সী কন্যা যে এক কন্যা সন্তানের জননী সেও অবিবাহিত। ভালবাসার সঙ্গিরা শুধু ভালোইবেসেছে, ভালোবাসার ফসলের দায়িত্ব কেউ নেয়নি!

নাহ! আজকে আর কোনভাবেই কোন কাজ করা হবে না। আজ আমার মন পড়ে আছে আমারজিনার কাছে। এই মেয়েটির বয়স ২২/২৩-এর বেশি হবে না। সেও অবিবাহিত এবং দুই বছর বয়সী কন্যা সন্তানের জননী। আমারজিনা আমি যে গেস্ট হাউজে ছিলাম সেটার কেয়ারটেকার। সন্তান থাকে তার মায়ের কাছে। জীবিকার তাগিদে আমারজিনা এখানে আছে। সপ্তাহে একদিন সন্তানকে দেখতে বাড়ি যায়। ঘর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে অতিথিদের কাছ থেকে বিল সংগ্রহ পর্যন্ত গেস্ট হাউজের সকল কাজ সে একাই করে। তার দিন শুরু হয় সকাল ৫টায় আর শেষ হয় রাত একটায়। যে যৎসামান্য বেতন পায় তা দিয়ে কিভাবে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে সেই নিয়ে আমারজিনার চিন্তার শেষ নেই। সুন্দর ব্যবহারের মৃদুভাষী মেয়েটি গল্প করতে করতে একসময় আমাকে করুণ গলায় বলে আমি যে সংস্থার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে কেনিয়ায় এসেছি সেখানে যেন তার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেই। তার অনুরোধ আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন মানুষে পরিণত করে।

একটি গবেষণা অনুযায়ি কেনিয়ায় প্রতি ১০জন নারীর মধ্যে তিনজন ১৮ বছর হওয়ার আগেই সন্তান ধারণ করে, আর প্রতি ১০জন নারীর মধ্যে ছয়জন তাদের ৪৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সিঙ্গেল মায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। নারীদের সিঙ্গেল মা হওয়ার হার সারা আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে কেনিয়ায় সর্বাধিক। আবার ধর্মীয় দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণকে খারাপ চোখে দেখা হয় বলে সন্তান জন্মদানের হারও অনেক বেশি। এখানকার দরিদ্র নারীদের তাই দাঁতে দাঁত চেপে যেভাবে সন্তানের ভরনপোষণ করতে দেখলাম তা সত্যিই বেদনাদায়ক।

অথচ কেনিয়ার সংস্কৃতিতে মেয়েদের অবিবাহিত থাকাকে মোটেও ভাল চোখে দেখা হয় না, আর অনিয়মিত শ্রমবিক্রিকারী কোন নারীর জন্য পুরুষ সঙ্গী ছাড়া পরিবার চালানো অত্যন্ত কঠিন কাজও বটে। জেন আর আমারজিনার কাছে আমার জানতে ইচ্ছা করছিল তাদের সন্তানদের পিতার কথা, তারা কি একজন নাকি অধিক? তারা কি ভালবাসার কথা বলে অথবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে যায়, নাকি পুরুষসঙ্গী থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো? না, এসব অতিব্যক্তিগত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠে না। মনে মনে ভাবি হয়তো এভাবেই তারা ভালো আছেন।

তারপরও, অনেক কিছুই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসহায়ত্ব বলে মেনে নেয়া যায়, কিন্তু ১৩ বছরের কিশোরী মেয়ে আর তার কোলের ছোট্ট কন্যা শিশুর কথা ভেবে মন বার বার হু হু করে উঠছে। কে এই নিষ্পাপ মেয়েটার এতো বড় ক্ষতি করল। সন্তান গর্ভে আসার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে স্কুলে যেতে নিষেধ করে দিয়েছে। পিতৃপরিচয়হীন সন্তানকে নিয়ে অসীম অভাবের দীর্ঘজীবন সে কিভাবে পাড়ি দেবে? তার মা এবং খালা যেমন কোন পুরুষ সঙ্গী ছাড়া অনেক সন্তানের ভার বহন করে চলেছে, তারও কি সেই একই ভাগ্য হবে? আর তার এই ছোট্ট কন্যা শিশুটি সেও কি একদিন সঙ্গিহীন কিন্তু সন্তানের দয়িত্বভারে জর্জরিত একজন অসহায় নারী হবে?

উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করি বলেই আমি জানি জেন এবং তার পরিবার অতিদরিদ্র কর্মসূচি নামক যে উন্নয়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেখান থেকে সামনে তাদের জীবনে একটা ভালো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশে এই কর্মসূচি থেকে অনেক অতিদরিদ্র নারী এবং তাদের পরিবার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছেন। তাছাড়া বিশ্বের অনেক দেশে একটি অবিবাহিত কিশোরী মেয়ে সন্তানের জন্ম দিলে সেই মেয়েটির পুরো জীবন একটি দুর্বিসহ নরকে পরিণত হয়। সেই হিসেবে জেনের ভাগ্নি অনেক ভাগ্যবতী।

সে আমাকে কথা দিয়েছে তার সন্তান একটু বড় হলেই সে আবার পড়াশোনা শুরু করবে। জেন এবং আমারজিনার মতো অসংখ্য তরুণী কেনিয়াতে কোন পুরুষসঙ্গীর সাহায্য ছাড়াই সন্তানদের নিয়ে জীবন সংগ্রাম করে চলেছে সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু তারপরও যে নারীকে অসংখ্য সন্তানের দায়িত্ব একাই পালন করতে হয়, যে বার বার পুরুষের প্রলোভন বা ভোগের শিকার হয়, তার যে মনোসামাজিক ক্ষতি হয়, সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে করতে যে জীবনীশক্তির ক্ষয় হয়, পৃথিবীর কোন শক্তিই নেই যা সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারার। তারপরও এই মেয়েগুলো এগিয়ে চলেছে, থেমে যায়নি, এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। কেনিয়ার এই সিঙ্গেল মায়েদের জন্য তাই অনেক ভালোবাসা আর শুভকামনা।

উপমা মাহবুব
উন্নয়ন কর্মী এবং কলাম লেখক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৪,৪৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.