হৃদয়ের দু-কূল ভেসে যায়

provati das
প্রভাতী দাস

প্রভাতী দাস: ১৫ দিন পরে ফিরে এলাম। ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের ঝামেলা চুকিয়ে এয়ারপোর্টের গেটে পা দিতেই আমার ছয় বছরের পুতুলটা হাতে অনেকগুলো গোলাপ নিয়ে লাফিয়ে এলো, ‘মামি, ইউ আর ব্যাক, আই মিসড ইয় সো মাচ, লাভ ইউ মাম’। আনন্দে কান্না চলে এলো চোখে, আসলেই ওকে ছেড়ে এতো দীর্ঘদিন থাকিনি এর আগে কখনও। বুকে তুলে নিতে নিতে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম, ওজন কতটা কমেছে, কোঁকড়ানো লম্বা চুলগুলোয় কতোটা জট বেঁধেছে। না, সব ঠিকঠাক আছে বলেই মনে হল, পাশে থেকে এবারে মেয়েদের বাবার হাসিখুশি মুখ নজরে এলো। অবশেষে দীর্ঘ যাত্রা শেষে গন্তব্যে পৌঁছাবার স্বস্তির নিঃশ্বাসটা ফেলে বেরিয়ে এলাম। নীলা কথা বলেই যাচ্ছে, ১৫ দিনের জমানো কথা ধারা বর্ণনার মতো চলতে থাকবে এখন কয়েকদিন অবিরাম।
বাড়ির ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢুকতেই বাগানের দিকে দৃষ্টি দিলাম, বেশ ফুল ফুটেছে গাছগুলোতে। যাবার আগে আগে এমিশ চাষিদের থেকে শেখা টোটকা বাগানে প্রয়োগ করে গিয়েছিলাম, মনে হয় বেশ কাজে দিয়েছে। বরকে জিজ্ঞেস করাতে সেও জানালো, হরিণের উপদ্রব কমেছে বেশ কিছুটা। গাড়ি কাছাকাছি এলে বাগানে গজিয়ে ওঠা ঘাস আর আগাছা চোখ এড়াল না। আমার চাহনি দেখেই মেয়েদের বাবা বলে উঠল, “আগাছাগুলো তোমার জন্য যত্ন করে রেখে দেয়া হয়েছে। তোমার বাগান বলে কথা।” হেসে না ফেলে উপায় কি, এক হাতে আর কত করতে পারত ও! বাড়ির ভেতর পরিপাটি করে রাখা, যাবার সময়ে তাড়াহুড়োয় তৈরি হওয়া সব জঞ্জাল বাবা-মেয়েরা মিলে বেশ ভাল করে গুছিয়ে নিয়েছে। আমার জন্য বানানো “ওয়েলকাম হোম ” ভিডিও আর কার্ড দেখা শেষ করতে করতেই কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। লাঞ্চ শেষ করে অবশেষে যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি তখন তিনটে বেজে গেছে। নেশাগ্রস্তের মতো ঘুম জড়িয়ে এলো দুচোখে, জেট ল্যাগের ঘুম। ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে মনে হলো, নিজের বিছানার মত আরামের স্থান পৃথিবীতে আর একটিও নেই। আরও মনে হলও, “ইটস গ্রেট টু বি ব্যাক হোম, হোম, সুইট হোম!”
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি মনে নেই, ঘুমের মাঝেই দুই মেয়ে এসে অনেকবার অনেক কিছু বলে গেছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই ওদের সাথে কথা বলেছি, কি বলেছি কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে আমাকে বার বার জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টায় নীলার হতাশা, ‘উইল ইউ বি স্লিপিং ফর এভার’! ওদের বাবা ওদের ডিনার খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছে কখন তাও টের পাইনি। অবশেষে ঘুম ভাঙল একটু আগে, মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সবাই ঘুমোচ্ছে, আমি নির্ঘুম জেগে। গত ১৫ দিনের কথা ভাবছি, অনেক ঘটনা বহুল দিনকয়টা কাটিয়ে এলাম। কত সব প্রিয় মুখের সাথে ফিরে দেখা হলো। ছুঁয়ে দেখা হল ফেলে আসা গাঁও, নাও, মেঠো পথ, নদীর জল, খেজুর-তাল-নারিকেল সারি, ঝিঙে-কুমড়োর মাচা। কত না স্নেহ, মমতা, ভালোলাগা, ভালবাসা, বিস্ময়, বিষাদ, অভিমান, আনন্দ, উচ্ছ্বাস এ আপ্লুত হয়েছিল এ হৃদয়। সব আবার ছেড়ে এলাম…………,
আবার ফিরে যাব আমার উৎসে কোন একদিন এই স্বপ্ন নিয়ে। সেই একদিন যে কোন সুদূরে জানা নেই। শুধু জানি, ফিরে যাব, ফিরে যেতে হবে।। কাঁদতে পারলে ভাল হতো, কিন্তু ভিতরটা একদম পাষাণ হয়ে আছে।
ঘুমের মাঝে বিড়বিড়িয়ে বকা নীলার অভ্যেস, মাঝে মাঝে বেশ জোর গলায় কেঁদে বা কথা বলেও উঠে। আজ হঠাৎ কেঁদে উঠল, আমি পাশ ফিরবার আগেই ও আমাকে জড়িয়ে ঘুমের মাঝেই বলে উঠল, “আই লাভ ইউ মামি, আই এম সো হ্যাপি ইউ আর উইথ মি”; এতক্ষণের পাথর চোখে এবার জল নামলো অঝোরে ………………।
হৃদয়ের জোড়া অলিন্দ আর নিলয় যখন সমপরিমাণ আনন্দ আর বেদনার অধিকারে, যখন জীবনের খাতায় পাওয়া আর হারানো পরিমাপে হয় সমান সমান, তখনকার অনুভূতি কি করে প্রকাশ করতে হয় আমার জানা নেই………।
আমি আবার দ্বারস্থ আমার প্রাণের ঠাকুরের…………,
“হৃদয় আপনি উদাস, মরমে কিসের হুতাশ–
জানি না কী বাসনা, কী বেদনা গো–
কেমনে আপনা নিবারি। …
যেদিকে চেয়ে দেখি ওগো সখী,
কিছু আর চিনিতে না পারি।
পরানে পড়িয়াছে টান, ভরা নদীতে আসে বান,
আজিকে কী ঘোর তুফান সজনি গো,
বাঁধ আর বাঁধিতে নারি। …
হৃদয়ের এ কূল, ও কূল, দু কূল ভেসে যায়, হায় সজনি,
উথলে নয়নবারি ।”

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.