শিশুর মনোদৈহিক বিকাশে উপেক্ষিত থেকে যাওয়া কথা – ২

0

রাবিয়া আনজুম:

উপরের শিরোনামে আগের একটি লেখাতে আমি তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছিলাম। পাঠক প্রতিক্রিয়ায় আমি বেশ অভিভূত। অনেকেই এ ধরনের লেখা আরো লেখার জন্য অনুরোধ করেছেন। কেউ কেউ নির্দ্দিষ্ট কিছু বিষয় উল্লেখ করে সেগুলো নিয়ে লিখতে বলেছেন। যদিও আমি বিশেষজ্ঞ নই, তবুও আরও তিনটি পয়েন্টে কিছু লিখলাম, আশা করছি সম্মানিত পাঠক গ্রহণ করবেন।

৪। বাচ্চার কথা বলা শিখতে দেরি হওয়ার কমন কিছু কারণ

অনেক বাবা-মা’র কাছেই ইদানিং শুনতে পাই যে, তারা বাচ্চার বুদ্ধিমত্তার বিকাশে দারুণ উৎফুল্ল। কারণ তাদের বাচ্চারা মোবাইল চালনায় বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে দু’বছর বয়সেই। টাচ স্ক্রিনে ছোঁয়া দিয়েই বের করে ফেলছে কোথায় ভিডিও আছে, আর কোথায় আছে গেইম। টিভির রিমোটেও কেউ কেউ দক্ষ। কিন্তু পরক্ষণেই বাবা-মা’র অনুযোগ, বাচ্চা ”টেকনোলজি” এতো ভালো বুঝছে, অথচ এখনো কথা বলা বা মনের ভাব প্রকাশ করা শিখছে না সেভাবে।
এ ধরনের অনুযোগ যারা করেন তাদের কাছে জানতে চেয়ে একটি বিষয় আমি প্রায় সবার মাঝেই কমন পেয়েছি, আর তা হলো, বাচ্চাদের স্বভাবসুলভ দুরন্তপনাকে স্পেস না দিয়ে বরং তাকে “শান্ত” রাখার কৌশল হিসাবে বাবা-মা, অথবা গৃহকর্মিরা বেছে নিয়েছেন সহজ উপাদান মোবাইলের গেম, ভিডিও বা টিভি। বাচ্চাকে ট্যাবে বসিয়ে দিয়ে বাবা-মা ব্যস্ত থাকছেন নিজেদেরকে নিয়ে।

দেখুন কথা বলা শেখার ব্যাসিক টেকনিকটা কিন্তু ‍দ্বিমুখী, অর্থাৎ আপনি কিছু বলবেন তাতে শিশু ধীরে ধীরে সাড়া দিবে, অথবা শিশুর ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা আপনি বুঝে নিয়ে সেভাবে সাড়া দিবেন। তখন শিশু বুঝতে শিখবে তার কোন কথায় অন্যরা কিভাবে সাড়া দেয়। এভাবেই সে ধীরে ধীরে বিভিন্ন নতুন নতুন শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। এছাড়া রয়েছে তাকে প্রচুর গল্প বলে শোনানো, যেটা আমাদের সময়ে পরিবারের সদস্যরা করতেন। শিশুর আশে পাশে দ্বিমুখী ভাবে যত বেশি শব্দের ব্যবহার হবে শিশুর শব্দ ভাণ্ডার তত সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

অপরদিকে মোবাইল বা টিভির বিষয়টা একমুখী, এখানে শিশুর রেসপন্সের কোন জায়গা নেই। কমিউনিকেশনটা হয় একমুখী, টিভি বা মোবাইল থেকে ছবি আর শব্দ বের হচ্ছে আর সেটা শিশু গোগ্রাসে গিলছে, তার পার্টিসিপেশনের কোন সুযোগ নেই এখানে। আরেকটা অসুবিধা টিভি বা মোবাইলের বেশির ভাগ কনটেন্ট অন্য ভাষায়। শিশু সারাদিন তার পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনে এক ভাষা, আবার যেটাতে বেশি সময় কাটায় অর্থাৎ টিভি বা মোবাইলে শোনে অন্য ভাষা। সে তখন বুঝে উঠতে পারে না কোনটির কী অর্থ, দ্বিধায় থেকে সে পিক করতে পারে না কোনটিই। ফলে সে হয়ে ওঠে ভাষাহীন অসহায়, নিজের কিছু প্রয়োজন হলে সেটাও বলতে পারে না।

আমরা কেন আমাদের সন্তানদের এই অসহত্বের মুখে ফেলে দিচ্ছি। শুধু একটু সময় দিলেই বাচ্চারা এসব থেকে রেহাই পেত। অথচ গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা কোন শিশুকে যদি দেখেন তাহলেই শহুরে শিশুদের সাথে অন্তত ভাষা শিক্ষার বিষয়ে তফাৎটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আর মাতৃভাষায় দক্ষ যে কারো অন্য যে কোন ভাষায় দক্ষতা অর্জন সময়ের বিষয় মাত্র, এটা অবশ্য ভিন্ন আলোচনা, তাই এ নিয়ে এখানে আর আলোচনা নয়।

তাছাড়া, কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ক্রমাগত ট্যাব আর টিভি দেখাও আজকাল শহুরে বাচ্চাদের একটা বড় অংশের চোখে চশমা ব্যবহারের অন্যতম কারণ। চোখের কাজ কাছের ও দূরের জিনিস দেখা, সেভাবেই চোখের পেশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে ক্রমাগত কাছের জিনিস দেখে অভ্যস্ত চোখে পরবর্তীতে দূরের জিনিস দেখতে যেয়ে বেগ পেতে হয়, আর তখনই প্রয়োজন পড়ে চশমার। এসব কারণে বাচ্চার স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন, তাকে সময় দিন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পেতে একটু গুগল করুন।

৫। ব্লেন্ডেড খাবারের ক্ষতির দিকগুলো

একটি ছোট উদাহরণ দিয়ে শুরু করি। দেখবেন বাচ্চাদের বেশির ভাগ খেলনার প্যাকেটে একটি সতর্কতামূলক পরামর্শ থাকে, আর তা হলো খেলনাটি তিন বছরের নিচের বাচ্চাদের জন্য নয়। এর মূল কারণ তিন বছরের নিচের শিশুদের খাদ্যবস্তু আর জড় বস্তুর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার মতো বুদ্ধির পরিপক্কতা হয়ে ওঠে না। এছাড়া ভুলক্রমে জড় কোন বস্তু মুখে চলে গেলেও সেটা জিহ্বা দিয়ে ঠেলে বাইরে ফেলে দেয়ার দক্ষতা, অর্থাৎ মুখে কিছু প্রবেশ করলে সেটা জিহ্বা দিয়ে নাড়িয়ে চাড়িয়ে গলার ভেতরে প্রবেশ করানো বা মুখের বাইরে ফেলে দেওয়াটাও একটা দক্ষতা, যেটা রপ্ত করতেও প্র্যাকটিস লাগে বৈকি।

কিন্তু আজকাল আমরা অনেকেই কী করছি, বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গিলিয়ে দেয়ার সুবিধার্থে সবকিছু মিশিয়ে ব্লেন্ড করে বাচ্চার মুখে চালান করছি, এতে করে কোনো কিছু চিবিয়ে রসিয়ে খাওয়ার স্বাভাবিক দক্ষতা অর্জন করানো হতে আপনি নিজের অজান্তেই বাচ্চাকে বঞ্চিত করলেন। এছাড়া রসিয়ে খাওয়ার কথা এজন্যই বললাম, কারণ খাদ্য চিবানোর সময় মুখ থেকে যে লালা নিঃসরণ হয় তাতে থাকে প্রয়োজনীয় হজমী উপাদান যা খাদ্যকে সঠিকভাবে হজম করিয়ে তা থেকে পুষ্টিটুকু শরীরে শোষিত হতে সহায়তা করে।

এখন তাহলে আমাদেরকে বুঝতে হবে, শুধু গিলিয়ে দিলেই পুষ্টিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব না। স্বাভাবিকভাবে খাওয়ানোর অভ্যাস করানোই আসল। তবে হ্যাঁ, বাচ্চাদের খাবার অবশ্যই কিছুটা নরম থাকতে হবে (ব্লেন্ডেড বা গলিত নয়)। আর চিবিয়ে খাওয়ানোর অভ্যাস করানো হলে নানা ধরনের খাবারের ভিন্ন ভিন্ন টেক্সচার সম্পর্কেও বাচ্চা ধারণা পাবে, আর খাদ্য গ্রহণে হয়ে উঠবে নিজ থেকেই আগ্রহী। আপনাকে আমাকে বিরিয়ানি ব্লেন্ড করে দিলে যেমন আমরা খাবো না, বাচ্চাদেরও একই রকম পছন্দ-অপছন্দ থাকে, সেটিকেও গুরুত্ব দিন। ‍দেখুন, বাচ্চা একটু বড় হলে বিয়ের দাওয়াতে গেলেন বা দুরে কোথাও বেড়াতে গেলেন, অথচ তার আলাদা খাদ্য প্রস্তুতের জন্য আপনাকে বয়ে নিতে হচ্ছে বাড়তি উপকরণ, এটাও তো ঝামেলার। তাই বাচ্চার বয়স এক পার হলেই তাকে পারিবারিক খাবারে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করুন। আর ছোটদের সুবিধার্থে কিছুটিা নরম বা হাতে চটকে খাবার দিবেন, কিন্তু গলিয়ে নয়।

৬। প্রাথমিক শিক্ষার শুরুটা যেভাবে হওয়া উচিৎ

আমি এই লেখার এক নাম্বার পয়েন্টেই উল্লেখ করেছি শিশুর প্রথম শিক্ষা হবে অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে, কাগজে পেন্সিলে নয়। প্রথমেই কাগজ কলম খাতা পেন্সিল নিয়ে বসলে কিছুই হবে না, শুধু শুধু শিশুকে আতংকগ্রস্ত করে ফেলা হবে। মনে রাখবেন কোনো বিষয়ে শিশু প্রথমেই আতংকগ্রস্ত হয়ে গেলে এর নেতিবাচক ইমপ্যাক্ট থাকতে পারে জীবনভর।
আর তাই শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে হতে হবে অত্যন্ত কৌশলী আর এটা তার কাছে করে তুলতে হবে আনন্দময়। বিদেশে থাকা বেশির ভাগ বাবা-মা আমাকে বলেন, সকালে উঠে তাদের বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয়, আর স্কুল ছুটি থাকলে অনেকে মনও খারাপ করে অপেক্ষায় থাকে কবে ভ্যাকেশন শেষ হবে।

আমাদের দেশে ঠিক এর উল্টা, এমন কেন। কারণ ওদের প্রি-স্কুল বা কিন্ডার গার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে প্রচুর আনন্দের উপাদান আর এ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। আপনি একটা বাচ্চার হাতে একই ধরনের একটা আর দুইটা অবজেক্ট দিয়ে একসাথে করে মোট কয়টা হলো সেটা যত সহজে তাকে বুঝিয়ে শিখিয়ে দিতে পারবেন, ততোটা সহজে আপনি কখনো কাগজে-কলমে একটা বাচ্চাকে শেখাতে পারবেন না যে ২ আর ১ যোগ করলে ৩ হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক স্কুলেই ২ + ১ = ৩ শেখানোর চেষ্টা করিয়ে বাচ্চাগুলোকে অহেতুক আতংগ্রস্ত করে ফেলা হচ্ছে।

অথচ বেশি, কম, ছোট বড় এসব বেসিক লার্নিং কিন্তু অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমেই শেখানো সহজ, আর সেটাই নিয়ম। আর তাই স্কুলের উপর পুরোপুরি ছেড়ে না দিয়ে আপনিও কিছুটা দায়িত্ব নিন আপনার সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষাটাকে আনন্দময় করার।
ধন্যবাদ সকলকে।

উইমেন চ্যাপ্টারে লেখা একই শিরোনামের আগের লেখাটির (পয়েন্ট ১,২ ও ৩) লিংক নিচে দেয়া হলো:

শিশুর মনোদৈহিক বিকাশে উপেক্ষিত থেকে যাওয়া কথা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 214
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    215
    Shares

লেখাটি ১,২১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.