পুরুষ যখন ভিকটিম – পর্ব (১)

প্রমা ইসরাত:

আমি রাশেদ, ছোটবেলায় যখন আমার তিন বছর বয়স, পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম, আমি অনেক ব্যথা পেয়েছিলাম, আমি চিৎকার করে কাঁদছিলাম। আমার মা আমাকে কোলে তুলে নিয়ে কোথায় ব্যথা পেয়েছি দেখতে চাইলেন, আর বললেন, “আরে বাবা, তুমি তো ছেলে মানুষ, পুরুষ মানুষ, পুরুষ মানুষ কি কাঁদে কখনও?” তবুও আমি কাঁদছিলাম। আমার কান্না শুনে আমার বাবা এগিয়ে এলেন, এবং একটু জোরেই বললেন যে, আরে এই ব্যথা কিছু না, অমিতাভ বচ্চনের সিনেমাতে কী বলছে, জানো না? “মার্দ কো দার্দ নেহি হোতা”। তুমি তো আমাদের “হিরো”, তুমি পুরুষ। পুরুষ মানুষ কি কাঁদে? আমি আর কাঁদলাম না।

আমার বয়স তখন পাঁচ, আমাকে স্কুলে ভর্তি করা হলো, আমি মাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছিলাম না, আমার ভয় করছিল অজানা একটা জায়গায় যেতে, ক্লাসে বসে আমি কাঁদছিলাম, আমার টিচার আমাকে বললেন, ‘আরে বাবু কেঁদো না, তুমি তো ছেলে মানুষ, ছেলে মানুষদের কাঁদতে আছে’?

আমার বয়স তখন সাত, আমার মুসলমানি করাবে বলে আমাকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। আমার খুব ভয় লেগেছিল, আমি এটা করতে চাই নাই। আমি খুব কাঁদছিলাম, আমি চাচ্ছিলাম আমার মা আমার সাথে থাকুক। আমার দাদী বললেন, মা মা করবি না আর, তুই এখন পুরুষ মানুষ। আমার বাবা আমার সাথে ছিল, কিন্তু বাবা বললো, ‘পুরুষ মানুষদের এতো ভয় পেলে চলে না, কান্নাকাটি করলে চলে না। সবাই এটা করে, আমার বাবার, দাদার, চাচার সবার হয়েছে। এইগুলো খুব খুব সামান্য বিষয়’।
আমি অনেক কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করার চেষ্টা করলাম। ডাক্তার আংকেল আসলেন, ডাক্তার আংকেল আমাকে দেখে বললেন, “কী হিরো! এতো ভয় কিসের, বাপকা ব্যাটা না তুমি? তুমি তো পুরুষ মানুষ, পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই”।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, ক্লাসের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আমি খুব খারাপ রেজাল্ট করলাম। আমার বাবা আমাকে মারলেন, মা বকলেন, মা বললেন, তুই আমাদের ছেলে, তুই যদি পড়ালেখা না করিস, তাহলে বড় হয়ে কিছুই করতে পারবি না, ভালো জায়গায় পড়তে পারবি না, ভালো চাকরি পাবি না, আর চাকরি ভালো না পেলে বউকে খাওয়াবি কী? আমাদেরই বা দেখবি কীভাবে? তোর কতো দায়িত্ব, তুই জানিস?

আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, আমার প্রথম স্বপ্নদোষ হলো, আমার শরীর পরিবর্তন হওয়া শুরু করলো। আমার মুখের আদল কেমন যেন বদলে গেল, মুখে ব্রণ হলো, হালকা গোঁফ গজালো, শরীরের নানান জায়গায় লোম গজাতে লাগলো। আমার কেন জানি মেয়েদের দেখতে ইচ্ছে করতে লাগলো। সিনেমার নায়িকাদের দেখলে খুব ভাল লাগতো। আমি লুকিয়ে খারাপ খারাপ ছবি দেখেছিলাম। প্রথম দিন ভয়ে-আতংকে, লজ্জায় আমার জ্বর এসে গিয়েছিল। আমার স্কুলের সিনিয়র আর ক্লাসের এক বন্ধু ছবিগুলো নিয়ে এসেছিল, আমার জ্বর এসেছে শুনে আমাকে নিয়ে হাসলো। বললো, “তুই কি মাইগ্যা নাকি! আরে ব্যাটা পুরুষ মানুষ না তুই”?

কিন্তু আমার খুব একা লাগতো, আমার মনে হতো এই সমস্ত কারণে আমাকে আর কেউ ভালবাসবে না। নিজেকে মনে হতো চোর, অপরাধী। কিন্তু কী করেছি আমি? আমার কেন এমন হচ্ছে? আমি মাকে বলতে চাইলাম, মা আমাকে বললেন বাবার কাছে যেতে, আমি বাবাকে ভয় পাই, আমি বড় ভাইকে বললাম, বড় ভাই বললেন, “আরে ব্যাটা, তুই পুরুষ মানুষ, এইসব তো হবেই, ম্যান ম্যান করে চলবি না, পুরুষ মানুষ বুক চিতায়া চলবি”।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি, সামনের গার্লস স্কুলের মেয়েদের বাথরুমে উঁকি-ঝুঁকি মারার একটা চ্যালেঞ্জ আমাকে দেয়া হয়। আমাদের স্কুলের সিনিয়র ভাই বলে, “পুরুষ মানুষ হইতে হলে মাইয়া মানুষ বাজায়া দেখা লাগে। সিগারেট টিগারেট খা, একটু পার্টে থাক, মাইয়া পটানি, খায়া ছেড়ে দেয়া এইসব করা হইতেছে বাদশাহী মেজাজ। আসল পুরুষ হইতে হইলে এইসব খেলা জানতে হয়”।

আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছি, বুয়েটে আমি এক এর জন্য চান্স পাই নাই। চরম হতাশার সেই সময় আমার নিজেকে এতো তুচ্ছ মনে হলো, মনে হলো আমি ব্যর্থ, চরম ব্যর্থ একজন মানুষ। আমি কীসের জন্য বেঁচে থাকবো! আমাকে কেউ সান্ত্বনা দিতে এলো না। আমার বুয়েটে চান্স না পাওয়া নিয়ে সবাই আমার দিকে, করুণার চোখে, একটা তামাশার চোখে তাকাতে লাগলো। বাবা-মায়ের চোখে আমি নিচে নেমে গেলাম। তারা আফসোস করতে থাকলো।
আমার অন্য বন্ধুরা চান্স পেল, এবং আমার মনে হলো, তাদের ক্যারিয়ারের তুলনায় আমার ক্যারিয়ার ছোট হয়ে গেল। আমি ওদের চেয়ে পিছিয়ে গেলাম।
আমি কাঁদতে চাইলাম, আমি শুধু মন ভরে একটু কাঁদতে চাইলাম, চাইলাম একটা প্রিয় হাত আমার কাঁধে হাত রাখুক। আমাকে কেউ জড়িয়ে ধরুক, আমার কষ্টের কেউ ভাগীদার হোক। আমি লজ্জায় কাঁদতে পারলাম না, এমনকি একলা রুমেও আমি কাঁদতে পারলাম না। আমি একজন পুরুষ মানুষ, পরাজয়ে ডরে না বীর, আমি এই পরাজয়ে কাঁদবো কেন? আমাকে শক্ত হতে হবে, আমি কাঁদবো না, পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই।

আমার নাম রাশেদ, আমি বিয়ে করেছি, আমার চার বছরের একটি ছেলে আছে। আমার স্ত্রী বর্তমানে তার বাবার বাড়িতে আছে। আমার বাচ্চাটাকে সাথে করে নিয়ে গেছে। আমার স্ত্রীর অনেক ডিমান্ড। আমি যতো টাকাই ইনকাম করি না কেন, তার ডিমান্ড কুলানো যায় না। বিয়ের আগে থেকে দেখতেছি। বিয়ের সময় ওয়েডিং প্ল্যানার দিয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিয়ে করেছি, তার ডিমান্ড ছিল এটা যে সে এই রকম বিয়ে করতে চায়। তার বাড়ি লাগবে, তার গাড়ি লাগবে, তার এতো এতো ড্রেস লাগবে। আমি তাকে চাকরি করতে দিচ্ছিলাম না, কারণ কেউ যদি শোনে যে আমি আমার স্ত্রীকে চাকরি করতে দেই, তাহলে ভাববে আমি কোনো পুরুষই না, বউ পালার মুরোদ আমার নাই। আমার স্ত্রী কথায় কথায় আমাকে খোঁটা দেয়, বিয়ের সময় কতো জিনিস আর টাকা ওর বাবার বাড়ি থেকে দেয়া হয়েছিল, সেইসব নিয়ে আমাকে কথা শোনায়।

আরে কী আজব, আমি পুরুষ মানুষ, ওদের মেয়ে বিয়ে করেছি, আমাকে তারা জিনিস দিবে না? আমার বাবা-মা আমাকে কষ্ট করে পড়িয়েছে, আমি জানি আমি কত কষ্ট করে পড়ালেখা করেছি, আমি কী পরিমাণ মানসিক চাপে থেকে থেকে আমার ছাত্রজীবন শেষ করেছি, আমার ছোট বোনের বিয়ের চিন্তা, বাবা-মায়ের ওষুধ, আমার সরকারি চাকরির পরীক্ষা। কতো কষ্ট করে আমার দিন গিয়েছে। আমি জানি, শুধু আমি।
আর আজ আমি চাকরি করছি, বউ পালার মুরোদ আমার হয়েছে, কিন্তু তবুও আমি শান্তি পাবো না? আমাকে দিনের পর দিন শুধু মানুষের ডিমান্ড পূরণ করে যেতে হবে? তার উপর, মা আর বউ এর দ্বন্দ্ব। আমার বউ এর জন্য কিছু কিনলে মা মন খারাপ করে, আর মায়ের জন্য কিছু কিনলে বউ বলে, খালি মা মা কর কেন? দেনমোহরের টাকাও চড়া, চেয়েছে। আমি রোজ রোজ ঘ্যান ঘ্যান সহ্য করতে করতে ক্লান্ত।

কোনো কিছু না দিলেই বউ আমার সাথে শুইতে অস্বীকার করে। শালার মেয়ে মানুষের জাত খারাপ, মেয়ে মানুষ সব বিছানায় এসে শোধ তোলে। বিছানাতেই নাকি পুরুষকে বাগে আনা যায়। শয়তান মেয়ে মানুষ, আসলেই এরা নরকের দরজা। আমি তাই সেদিন আমার বউকে ধরে মারলাম। স্ত্রীকে প্রয়োজনে মারা যায়, শাসন করা যায়। বউকে রাখতে হয় গদামের উপর।
এইভাবে অনেকদিন ভালোই চলছিল, বউ চুপ ছিল। কিন্তু সেইদিন বউ মুখে মুখে আবার তর্ক করছিল, বেশ মারলাম, আমার ছেলেটাকেও দুটো চড় দিয়েছি, মা ন্যাওটা হয়েছে, এই স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ এর সব দায়িত্ব আমার। অথচ আমার কষ্ট এরা বোঝে না। আমি আমার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। আমি আমার স্ত্রীকে বলেছি, ডিভোর্স দিবো, ডিভোর্স দিয়ে আরেকটা বিয়ে করবো। আমি পুরুষ মানুষ, পুরুষ মানুষ সোনা, আর সোনার চামচ বাঁকা হলেও সোনা। আমার ছেলেটাকেও আমার কাছে এনে রাখবো, আমি আমার বউকে একটা উচিৎ শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো। শালার মেয়ে মানুষ, মেয়ে মানুষের এতো বাড় বাড়তে নেই।

কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছে, আমার সংসারের জন্য মন কাঁদছে, আমি তো এইরকম কিছুই করতে চাই নাই। আমি আমার বাচ্চাটাকে খুব মিস করছি। বাচ্চাটা যখন পৃথিবীতে এসেছিল, নার্স আমার কোলে তাকে তুলে দিলো। আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছা করেছিল, আবেগে। আমার সন্তান, এটা আমার সন্তান। কিন্তু আমি কাঁদলে কি চলবে? পুরুষ মানুষের আবেগ দেখাতে আছে? আমার কতো দায়িত্ব, আমার দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। এই সন্তানের ভবিষ্যৎ, সন্তানের স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সারাজীবনের দায়িত্ব! কত খরচ এখন সংসারের! আমাকে আরও টাকা উপার্জন করতে হবে, আমাকে আরও খাটতে হবে।

আমার ছেলেকে আমি আমার মতই শক্ত বানাবো, এই তো সেদিন ছেলেটা পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল, কাঁদছিল, আমি শক্তভাবে বললাম, ‘বাবা কাঁদবে না, পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই’।

আমি শক্ত মানুষ হতে পারি নাই, পুরুষ মানুষ হতে পারি নাই। এখন আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আমি কাঁদতে পারছি না। পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.