একাকি – ৩

0

তামান্না ইসলাম:

ভোরের দিকে বোধহয় চোখ দুটো লেগে এসেছিল নিতুর। ছাড়া ছাড়া স্বপ্ন দেখলো। ক্লাস নিচ্ছে রহমান স্যার, পাশে বসে তমাল হা হা করে হাসছে। নিতুর খুব ভয় লাগছে। কিছুক্ষণ পর দেখে একটা খোলা আকাশের নিচে ও দাঁড়িয়ে আছে, দূর থেকে তমাল ওকে ডাকছে। নিতু যেতে চাইছে, কিন্তু পা নড়ছে না। কীসে যেন আটকে গেছে ও। টানাটানি করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

এখনো পুরোপুরি আঁধার কাটেনি। ঘুমের মধ্যে কখন যেন শাড়ির আঁচলটা সরে গেছে। পাশে ঘুমন্ত সোহেল। সে কেমন করে যেন গড়িয়ে এসে পড়েছে সেই আঁচলের উপরে। স্বপ্নের মাঝে ওটাকেই বোধহয় টানতে চেষ্টা করছিল নিতু। এখন কী করা? মৃদু স্বরে কয়েকবার ডাকলো, কাজ হচ্ছে না। ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লাগছে একটু। এভাবে চলে গেল মিনিট দশেক। একটু পরেই বাড়ির সবাই জেগে যাবে। নিতু আর থাকতে না পেরে একটু ইতস্তত করে আস্তে আস্তে সোহেলের বাহুতে ধাক্কা দেয়, সাথে সাথে চমকে ওঠে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ওর। নিতুর ধাক্কাতে চোখ মেলে তাকায় সোহেল, চোখ দুটো টকটকে লাল। চোখ খুলেই প্রথম যে কথাটা বললো, সেটা হলো ‘এক গ্লাস পানি খাবো।’

নিতু চোখের ইশারায় শাড়ির আঁচলটা দেখিয়ে দিতেই মনে হয় একটু অস্বস্তিতে পড়ে সোহেল। তাড়াহুড়ো করে আঁচলটা ছাড়িয়ে দিতেই চোখ পড়ে নিতুর দিকে, ওর সুডৌল বুকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ আটকে যায়। নিতু ভীষণ লজ্জা পায়। সোহেলও চোখ সরিয়ে নেয় দ্রুত। তবে নিতুর গালের লাল আভাটা দৃষ্টি এড়ায় না ওর। হয়তো জ্বরের জন্যই, এই মুহূর্তে মেয়েটিকে বুকে টেনে নিতে খুব ইচ্ছে করছে।

পানি এনে সোহেলের হাতে দিতেই আঙ্গুলে আঙ্গুলে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়। একটু বুঝি বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে যায় আঙ্গুল থেকে আঙ্গুলে। নিতু একটা থার্মোমিটারও সঙ্গে নিয়ে এসেছে। জ্বর দেখে চোখ কপালে উঠে যায়, ১০৩। কী করবে ভেবে পায় না। স্পঞ্জ করা দরকার। কিন্তু বড্ড সঙ্কোচ হয়। জ্বরের ওষুধ দিতে হবে। ওষুধ দেওয়ার আগে কিছু খাওয়াতে হবে। খালি পেটে ওষুধ দেওয়া যাবে না। তার অস্থির লাগছে খুব। বাড়ির কাউকে জানাতে ইচ্ছে করছে না।

‘আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।’ বলেই এক দৌড়ে চলে যায় নিতু।
নিতুর এই অস্থিরতাটুকু সোহেলের ভালো লাগে।

এক কাপ চা, দুটো টোস্ট আর ওষুধ নিয়ে ঘরে ঢুকে নিতু। কিন্তু লোকটা তো ঘুমুচ্ছে। গভীর ঘুম। নিতু খুব একটা সেবাযত্নে পারদর্শি না। কী করবে বুঝতে না পেরে সমস্ত সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে একটা ছোট তোয়ালে আর পানি এনে জলপট্টি দিতে শুরু করে মাথায়। মাকে দেখেছে জ্বর হলে এভাবে জলপট্টি দিতে। ঠাণ্ডা তোয়ালের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে সোহেল। ওর ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো দুষ্টু হাসি, যেন জ্বর হওয়ায় সে বেশ মজা পেয়েছে।

হাসিটা ভালো লাগে নিতুর। বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন মনে হলো, কপালটা একটু ঠাণ্ডা হয়েছে, নিতু উঠে টোস্ট আর ওষুধটা আনতে যায়। ওঠার সাথে সাথে আঁচলে টান লাগে, সোহেল ওর আঁচল ধরে আছে। নিতু ঘুরে দাঁড়াতেই ওর হাত দুটো ধরে ওকে কাছে টেনে আনে সোহেল। নিতুর ঠোঁট দুটো ওর জ্বর তপ্ত ঠোঁটের উপরে টেনে নেয়। নিতুকে নিজের বুকের মধ্যে পিষে ফেলছে ও। ওর সমস্ত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে নিতুর শরীরে। কয়েকটি মুহূর্ত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করেই আবার নিতুকে ছেড়ে দেয় সোহেল। কিছুটা সময় নিয়েই নিজেকে গোছায় নিতু। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিল ওষুধের কথা। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে দেয় ওষুধ, পানি। ওর সারা শরীর তখনো অবশ লাগছে। এক অচেনা ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে শরীর।

অসুস্থ মেয়ের জামাইকে ছাড়লেন না নিতুর মা, বাবা। এক রাতের অতিথি থেকে গেলো টানা চারদিন। প্রথম দুদিন জ্বর কমছিল না একদমই। আধো ঘুম আধো জাগরণে কেটে গেছে দুটো দিন। নিতু ছিল সারাক্ষণই ওর পাশে। ও নিজেই জানে না কেন। এটা কী কর্তব্যবোধ, নাকি মনের গভীরে কোথাও একটু একটু করে দানা বাঁধছে এক ধরনের ভালো লাগা।

প্রতি মুহূর্তে একটা চাপা ভয়ও কাজ করছে। যদি তমাল এসে হাজির হয়। সে আসেনি। তবে একটু একটু করে কাছে এসেছে সোহেল। নিতু টের পেত, মাঝে মাঝেই সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে। কথা বলেছে অল্প, বেশিরভাগ সময়ই নিতুর সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। ওর ভালো লাগা, খারাপ লাগা এসব নিয়ে। নিজের সম্পর্কে তার যেন বিশেষ কিছুই বলার নেই। একদিন জ্বরের ঘোরে নিতুর হাত ধরে শুয়েছিল অনেকক্ষণ, নিতু হাত সরিয়ে নিতে পারেনি।

তিন দিনের দিন যেদিন জ্বর ছাড়লো, সেদিন রুমেই ওর জন্য ভাত পাঠিয়ে দিয়েছিল মা। সদ্য স্নান করা শাড়ি পরা নিতুকে দেখাচ্ছিল দেবীর মত। সোহেল খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে। সে চোখ ফেরাতে পারছে না এক মুহূর্তের জন্যও।
প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে নিতু বলে, ‘নিন যতটুকু পারেন ভাত খেয়ে নিন, মা বলেছে খেতে, নাহলে পরশু ফ্লাইট ধরবেন কিভাবে? ‘
সোহেল মিটিমিটি হাসছে, তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করছে। ‘নিজে খেতে পারবো না, খুব দুর্বল লাগছে। কেউ যদি খাইয়ে দেয়, তাহলে চেষ্টা করতে পারি। এখনো বমি বমি লাগছে।’ বলেই একরাশ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে নিতুর দিকে।

নিতু যদি এখন ‘পারবে না’ বলে, তবে কি সেটা খুব নিষ্ঠুর শোনাবে? কিন্তু কেমন যেন লাগছে। অস্বস্তি আর বিরক্তি। নিজেকে শাসন করলো নিতু, এই সম্পর্কটাকে শুরুতেই ভেঙ্গে দেওয়া যাবে না। বিরক্তিটুকু চেপে রেখেই এগিয়ে গেলো নিতু। সোহেল অসম্ভব খুশি হয়েছে, আর সেটা চেপে রাখারও কোন চেষ্টা করছে না। প্রায় পুরোটাই খেয়ে ফেলে নিতুর হাত দুটো ধরে বলতে থাকে ‘অনেক ধন্যবাদ নিতু, তোমার জন্য একটা বিশেষ পুরস্কার জমা থাকলো।’ ওর উচ্ছ্বাস দেখে বিরক্তিটা উধাও হয়ে যায়। মানুষটা মনে হয় খারাপ না। আর আছেই তো মাত্র একদিন।

সেই রাতে সোহেল বিশেষ পুরস্কারটি বুঝিয়ে দেয় নিতুকে। ওর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখেই বুক কাঁপতে থাকে নিতুর, সেই দৃষ্টিটা একদম অন্যরকম। নিতুর লাল হয়ে চোখ নামানো দেখে সোহেল ধরেই নিয়েছিল ওর সায় আছে এতে। বাতিটা নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়েছে নিজেই, নিতু কিছুটা হলেও স্বস্তি পায় তাতে। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিশিয়ে দিতে দিতে সোহেল ওকে বলেছিল, ‘আজ থেকে আর আপনি নয়। কেমন?’ ওকে বোধহয় জিজ্ঞেসও করেছিল, ওর কেমন লাগছে? নিতু উত্তর দিতে পারেনি। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করেছে। সোহেল ভেবেছিল, লজ্জা পেয়েছে ও।

পরের দিন সকালে আর অতোটা কষ্ট হয়নি, বরং একটু অন্য রকম ভালোই লেগেছিল হয়তো। সোহেলের দিকে তাকাতে পারছিল না ঠিকমতো নিতু। নাস্তার টেবিলেও পালিয়ে বেড়িয়েছে।
বিমানবন্দরে ওকে বিদায় দিতে এসে খুব একটা কথা হয়নি ওদের। কথা বলার সুযোগ ছিল, কিন্তু কথা খুঁজে পাচ্ছিল না তেমন।

‘নিতু আমার রাতে কাজ থাকে, তুমি দরকার হলে দিনে ফোন করবে, কেমন?’
নিতু আস্তে করে বলে ‘আচ্ছা।’

‘জরুরি দরকার না হলে ফোন করার দরকার নেই। আমিই করবো মাঝে মাঝে, তবে অনেক খরচ।’
এ কথায় চমকে উঠেছিল নিতু, সামান্য ফোনের খরচ নিয়ে সাবধান করছে পাঁচ দিনের বিবাহিত স্ত্রীকে?

‘আর একটা চাকরি বাকরি দেখো।’
একথায়ও অবাক হয় নিতু। তবে কী ওকে নিয়ে যাবে না সোহেল? কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় না।

‘তুমি কবে আসবে আবার?’
‘ছয় মাসের আগে তো ছুটি পাবো না মনে হয়।’
নিতু ভেবেছিল, ওকে বিদায় দিয়ে ও একদম আগের নিতু হয়ে যাবে। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে এক অচেনা নিতুর সাথে দেখা হয় ওর, তার বুকের কোথায় যেন শূন্যতা। সে অপেক্ষা করছে, আগামী ছয় মাসের জন্য।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 169
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    171
    Shares

লেখাটি ১,৬৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.